kalerkantho


ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মৃত্যুও ঘটে

তৌফিক মারুফ   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মৃত্যুও ঘটে

ওষুধ খাতে ব্যাপক অগ্রগতির মধ্যেও দেশে ওষুধের মান নিয়ে সংশয় কাটছে না। সেই সঙ্গে ওষুধের ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়টিও উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ঘটছে প্রাণহানিও। এ ছাড়া কেউ হারাচ্ছে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, কেউ বা ফিরে এসেছে মৃত্যুর দুয়ার থেকে। সরকারের নজরদারিতেও ধরা পড়ছে এসব চিত্র।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অ্যাডভার্স ড্রাগ রিঅ্যাকশন (এডিআর) মনিটরিং ব্যবস্থার প্রতিবেদন অনুসারে, জানুয়ারি ২০১৭ থেকে জানুয়ারি ২০১৮ পর্যন্ত ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, ১৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে, ছয়জন স্থায়ীভাবে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ক্ষতির শিকার হয়েছে, সাতজন অল্পের জন্য মৃত্যু থেকে রক্ষা পেয়েছে, পাঁচজন শিকার হয়েছে জন্মগত ত্রুটির, ১৪ জন রক্ষা পেয়েছে মারাত্মক ক্ষতি থেকে।

একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা কামরুল আহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চোখে সামান্য চুলকানি আর পানি পড়ার জন্য পরিচিত এক ফার্মেসিতে বসা এক ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি একটি ড্রপ দিয়েছিলেন। তাতেই আমার সর্বনাশ ঘটে যায়। আমার একটি চোখ এখন প্রায় দৃষ্টিহীন। পরে যখন আরেকজন বড় চিকিৎসকের কাছে যাই তখন তিনি বলেছেন, ওই ওষুধটি ছিল স্টেরয়েড, যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আমার চোখে গ্লুকোমা হয়ে গেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ডাক্তার ভুল করেছে, কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই স্পর্শকাতর একটি ওষুধ দিয়েছে। আবার আমার নিজেরও সচেতনতার অভাব ছিল। আমি যদি ওষুধের প্যাকেটের ভেতরে থাকা লিটারেচারটি একটু পড়তাম তাহলে হয়তো নিজেও কিছুটা সতর্ক হতে পারতাম। প্রয়োজনে অন্য কোনো ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করার পর ওষুধ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম।’

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. শওকত আরা শাকুর মিলি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লক্ষণ বা উপসর্গ একই রকম হলেও রোগের ভিন্নতা থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে ওষুধেরও অবশ্যই ভিন্নতা থাকবে। কেউ যদি অ্যালার্জির জন্য গ্লুকোমার ওষুধ দিয়ে দেয় তবে তো সর্বনাশ হবেই। আবার সবার চোখে বা শরীরে এক ওষুধ গ্রহণযোগ্য নয়। অপ্রয়োজনে স্টেরয়েড ব্যবহারের কারণে গ্লুকোমায় আক্রান্ত হওয়া রোগী আমরা মাঝেমধ্যেই পেয়ে থাকি।’ তিনি আরো বলেন, ‘ডাক্তারদেরও উচিত ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে রোগীদের ভালোভাবে বুঝিয়ে দেওয়া। রোগী আর কোনো ওষুধ ব্যবহার করে কি না, আর কোনো রোগ আছে কি না সেটাও জেনে নিয়ে তারপর নতুন ওষুধ দেওয়া ভালো। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো হচ্ছে সঠিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা। এ ছাড়া একাধিক ওষুধ দিলে তার মধ্যে কোনোটি একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে কি না সেটাও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ এমন বিক্রিয়া থেকেও রোগীর মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।’

দেশে চিকুনগুনিয়ার প্রকোপের সময় ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। দেখা দেয় বিতর্কও। এক পক্ষ দাবি করে, চিকুনগুনিয়ায় আত্রান্ত রোগীদের কোনোমতেই প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ব্যথানাশক দেওয়া যাবে না; আবার আরেক পক্ষ দাবি করে, রোগীর ব্যথা সারানো জরুরি হওয়ায় স্বল্পমাত্রার কিছু ব্যথানাশক দেওয়া যায়।

বাংলাদেশ মেডিসিন সোসাইটির সভাপতি ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, সাধারণত প্যারাসিটামলেই চিকুনগুনিয়া সেরে যায়। কিন্তু যাদের ব্যথা দীর্ঘমেয়াদি হয়, তাদের জন্য আর্থ্র্রাইটিস রোগীদের যে ব্যবস্থাপনা দেওয়া হয় সেটি প্রযোজ্য। তবে এ ক্ষেত্রে আগে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে যে ওই রোগী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত নয় কিংবা লিভার বা কিডনির রোগ নেই। ওই বিশেষজ্ঞ বলেন, এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের মেধা ও দক্ষতার ব্যাপার থাকতে পারে। যদি তিনি রোগীর সঠিক সমস্যাগুলো শনাক্ত না করেই ব্যথা কমানোর জন্য ব্যথানাশক দিয়ে দেন তবে তা রোগীর জন্য বিপদ হতে পারে।

ওষুধ বিশেষজ্ঞরা জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশিত এডিআর নিরূপণ পদ্ধতি অনুসরণে বাংলাদেশেও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের আওতায় একটি কার্যক্রম রয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের এই এডিআর নিয়ে তেমন জানাশোনা নেই। বেশির ভাগ চিকিৎসকও এ বিষয়ে খুব একটা সচেতন নন। বরং অনেক চিকিৎসকই ওষুধ কম্পানি দ্বারা নানাভাবে প্রভাবিত থাকায় ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার দিকে নজরও দেন না। আবার কখনো কখনো রোগী নিজেই ওষুধ নির্ধারণ করে সেবন করে থাকে, যাকে বলে সেলফ মেডিকেশন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ওষুধের ক্ষতির বিষয়ে সচেতন নয়। ফলে নিজেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও তা অন্যকে জানাতে বা অন্যকে ওই ক্ষতি থেকে রক্ষায় কোনো ভূমিকা রাখতে সচরাচর এগিয়ে আসে না। আর সরকারের তরফ থেকে তো এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো উদ্যোগই দেখা যায় না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক ডা. সারফুদ্দিন আহম্মেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশে এখনো ওষুধের কোয়ালিটি কন্ট্রোলের বিষয়টি সঠিকভাবে কার্যকর হচ্ছে না। অন্যদিকে চিকিৎসকরাও ভালোভাবে সতর্ক নন। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ ব্যবহার। এসব ব্যাপারে মানুষও এখনো সচেতন নয়। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে অনেকেই নানা রকম ক্ষতির শিকার হচ্ছে।’

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি ও জাতীয় স্বাস্থ্য আন্দোলনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ ই মাহাবুব কালের কণ্ঠকে বলেন, ডাক্তারদের মধ্যে এডিআর মনিটরিংয়ের ব্যাপারে এখনো তেমন কোনো সচেতনতা তৈরি করা যায়নি। তিনি বলেন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এডিআর মনিটরিং ব্যবস্থা আরো কার্যকর করলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়বে।

ওষুধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, ‘ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে শুধু ডাক্তারদের দোষ দিলেই হবে না বরং এর মূল দায় ফার্মাসিস্টদের। নিয়ম হচ্ছে, ডাক্তার ওষুধ লিখে দেওয়ার পর ফার্মেসিতে থাকা ফার্মাসিস্ট ওই প্রেসক্রিপশনের ওষুধগুলো মিলিয়ে দেখবেন এক ওষুধের সঙ্গে আরেক ওষুধের কোনো কনফ্লিক্ট আছে কি না কিংবা ডোজের সমস্যা আছে কি না। যদি থাকে তবে তিনি প্রয়োজনে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলবেন। আর ওষুধ সেবন ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়ে ফার্মাসিস্টই রোগীকে বা ওষুধের ক্রেতাকে সব কিছু বুঝিয়ে বলবেন। কিন্তু এই চর্চা তো বাংলাদেশে এখনো হয়ে ওঠেনি। বেশির ভাগ ফার্মেসিতেই তো ডিগ্রিধারী ফার্মাসিস্ট নেই, এমনকি অনেক ফার্মেসি আদৌ ফার্মেসির ক্যাটাগরিতেই পড়ে না। আবার প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রিও বন্ধ হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বলি মানুষ তো হবেই।’

ওই ওষুধ বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, ‘যারা মদ্যপায়ী তারা কী জানে মদ্যপানের পর ঘুমের ওষুধ সেবন করা যায় না! এতে হার্ট অ্যাটাকে তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটতে পারে। কিংবা কোনো কোনো ওষুধ সেবনের আগে বা পরে সাধারণত কী কী খাবার খাওয়া যাবে না সেটাই বা কতজন জানে! কোনো কোনো ওষুধ খাওয়ার পর কমপক্ষে এক ঘণ্টার মধ্যে রোগীর শুয়ে পড়া যাবে না। আবার টেট্রাসাইক্লিন সেবনের পর দুধ খাওয়া নিষেধ।’

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. রুহুল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন আমাদের এডিআর মনিটরিং ব্যবস্থা অনেক বেশি কার্যকর। অনেক অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সচেতনতা বাড়াতে কাজ চলছে। অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজন অনুসারে ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত যেকোনো রোগী বা স্বজন চাইলেই আমাদের ওয়েবসাইট থেকে নির্দিষ্ট ফরমে অভিযোগ জানাতে পারে।’

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে দেশে প্রথমবারের মতো একটি ফার্মাকোভিজিল্যান্স কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ওই কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নেওয়া হয়। এর ভিত্তিতে প্রাপ্ত ফলে দেখা যায়, ওষুধের ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার জন্য ৫০ শতাংশ উত্তরদাতা দায়ী করে চিকিৎসাসেবা প্রদানকারীদের অনৈতিক চর্চাকে, ৪৬.৬ শতাংশ দায়ী করে অবৈধ উৎস থেকে ওষুধ বিতরণ বা ক্রয়কে, প্রেসক্রিপশনে একসঙ্গে অনেক ওষুধ লেখাকে দায়ী করে ৪৪.২ শতাংশ এবং ৪০.৭ শতাংশ দায়ী করে সেলফ মেডিকেশনকে।

অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত এক বছরে বিভিন্ন কম্পানির ৪৫টি ব্র্যান্ডের ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার অভিযোগ পায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। এসবের মধ্যে আছে এক্সেফিনাক, অ্যামোক্সিসিলিন, অ্যাসপিরিন, এজিথ্রোমাইসিন, ইথামবুটাল, ফ্লুরেজিপাম, মেট্রোনিডাজল, প্যারাসিটামল, ওমেপ্রাজল জেনেরিকের ওষুধ।



মন্তব্য