kalerkantho


৬টায় ফোন পেয়ে বেরিয়ে ৮টায় খুন ঠিকাদার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



৬টায় ফোন পেয়ে বেরিয়ে ৮টায় খুন ঠিকাদার

রাজধানীর মহাখালীর দক্ষিণপাড়া জামে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল স্থানীয় সৈয়দ আজগর আলীর মৃত্যু সংবাদ। গতকাল রবিবার সকাল ৮টার দিকে এ ঘোষণার পর আশপাশের লোকজন আজগরের বাড়িতে যাওয়ার জন্য বের হয়। আর তখনই তারা শুনতে পায় একাধিক গুলির শব্দ।

লোকজন ছুটে গিয়ে ওই মসজিদের পাশে দেখতে পায়, রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন মসজিদের টাইলসের কাজ করা ঠিকাদার নাসির কাজী (৪৫)।

তিনতলা মসজিদটির নিচতলায় টাইলসের কাজ চলছে। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি যারা ছিল তারা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডে তিন যুবক অংশ নেয়। একাধিক গুলি করেই তারা পেছনের গলি দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা খবর দিলে বনানী থানার পুলিশ গিয়ে নাসিরের লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠায়।

নাসির পরিবার নিয়ে উত্তরার উত্তর আজমপুরের মুক্তিযোদ্ধা রোডের ১৪২ নম্বর বাড়ির নিচতলায় ভাড়া থাকতেন। পাঁচ বছর ধরে তাঁরা সেখানে আছেন। নাসিরের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলায়।

নাসিরকে কাছ থেকে আটটি গুলি করা হয়েছে বলে দাবি তাঁর ভাই মোহাম্মদ আল মামুনের। তবে এলাকাবাসী জানিয়েছে, তারা চারটি গুলির শব্দ শুনেছে।

পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পেশাদার খুনিরা খুব কাছে থেকে নাসিরকে গুলি করে হত্যা করেছে বলে তাঁদের ধারণা।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, মসজিদের পাশেই চারতলা একটি ভবন। মসজিদ ও ওই ভবনের মাঝামাঝি জায়গা দিয়ে চার-পাঁচ ফুট চওড়া একটি রাস্তা চলে গেছে মসজিদের পেছন দিকে। সেখানে বস্তিঘরের মতো কয়েকটি স্থাপনা আছে। মসজিদের বেইসমেন্টে সবজিসহ নানা পণ্যের দোকান।

সবজির দোকানি মহিউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি দোকানে তরকারি সাজাচ্ছিলাম। এ সময় শুনলাম গুলির শব্দ। বাইরে গিয়ে দেখি গলির মধ্যে রক্তাক্ত অবস্থায় ওই লোক মরে পড়ে আছে।’

নাসিরের মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাঁর স্ত্রী সন্তানসহ স্বজনরা।  ছবি : কালের কণ্ঠ

গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে গিয়ে দেখা গেছে, নাসিরের মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তাঁর স্ত্রী সেলিনা আক্তার, ছেলে রিজভী আহমেদ দীপু, মেয়ে নিপুসহ অন্য স্বজনরা। তাদের কান্নায় সেখানকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।

পরিবারের সদস্যরা জানায়, প্রতিদিন সকাল ৮টার দিকে নাসির বাসা থেকে বের হতেন। কিন্তু গতকাল কেউ একজন তাঁকে ফোন করে সকাল ৬টার দিকে বাসা থেকে ডেকে নেয়। এরপর ৮টার সময় ওই ঘটনা ঘটে।

নিহতের স্ত্রী কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, গতকাল বাসা থেকে বের হওয়ার সময় নাসির কার ফোনে বেরিয়েছিলেন তা নিয়ে কিছু বলেননি। সাধারণত এত সকালে কোনো দিন নাসির বের হন না জানিয়ে তাঁর স্ত্রী বলেন, ‘কেউ কোনো চাঁদা চেয়েও ফোন করেনি।’ তিনি এই হত্যাকাণ্ডের যথাযথ বিচার দাবি করেন।

নাসিরের ভাই মোহাম্মদ আল মামুন কালের কণ্ঠকে জানান, শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার ইদুরপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়াম্যান বি এম আবদুল খালেক ২০০৪ সালে ঢাকার খিলক্ষেতের নিকুঞ্জ এলাকায় খুন হন। ওই হত্যা মামলায় নাসিরকে আসামি করা হয়েছিল। ওই মামলায় ১৪ মাস জেল খেটেছিলেন নাসির।

মোহাম্মদ আল মামুন বলেন, ওই হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্রে এই খুন হতে পারে বলে তাঁরা সন্দেহ করছেন। কেননা অনেক সময় ওই পক্ষের লোকজনের কাছ থেকে কথাবার্তার মধ্যে হুমকিধমকি পাওয়া যেত। তবে এই হত্যার পেছনে অন্য কোনো বিষয় থাকলে তাও পুলিশকে খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি। 

তবে হুমকি বিষয়ে পুলিশকে জানানো হয়েছিল কি না জানতে চাইলে মামুন বলেন, ‘হুমকিধমকি পেলেও জিডি করা হয়নি।’

নিহতের ছেলে রিজভী আহমেদ দীপু জানান, তাঁর বাবা দীর্ঘদিন ধরে টাইলসের ঠিকাদারির সঙ্গে জড়িত। তবে হত্যাকাণ্ডের নিশ্চিত কোনো কারণ তাঁদের জানা নেই।

একটি সূত্রের দাবি, নাসির কাজীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার জন্য মসজিদের পাশের ভবনে থাকা ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার তার সকাল ৬টার পরপরই কেটে দেওয়া হয়। যারা তার কেটেছে, তাদের ছবি পাওয়া গেছে বলেও সূত্রটি দাবি করেছে।

এই হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে বনানী থানার এসআই আহসান হাবিব জানান, রবিবার সকালে নাসির শ্রমিকদের দিয়ে দক্ষিণপাড়া বড় মসজিদে টাইলসের কাজ করাচ্ছিলেন। এ সময় হঠাৎ দুর্বৃত্তরা নাসিরকে গুলি করে পালিয়ে যায়। ঠিক কী কারণে কে বা কারা নাসিরকে গুলি করে হত্যা করেছে, তা তদন্তের পর বলা যাবে।

পুলিশ সূত্র জানায়, যেখানে হত্যার ঘটনাটি ঘটেছে তার পাশেই জিপি ক-৭২ নম্বর বাড়ি ‘কাজী ভিলা’র দ্বিতীয় তলায় ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা ছিল। তবে সেটির লাইন কাটা পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় নিহতের মেয়ে নার্গিস নিপু বাদী হয়ে গতকাল রাত ৯টার দিকে বনানী থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় তিন-চারজনকে আসামি করা হয়েছে।



মন্তব্য