kalerkantho


খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে আদেশ হয়নি

নিম্ন আদালতের নথি পাওয়ার পর আদেশ দেবেন হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে আদেশ হয়নি

ফাইল ছবি

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় হাইকোর্টে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের শুনানি শেষ হয়েছে। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহীম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে গতকাল রবিবার ওই শুনানি হয়েছে। শুনানি শেষে আদেশে বলা হয়, জামিন আবেদনের শুনানি সম্পন্ন। নিম্ন আদালত থেকে নথি আসার পর আদেশ দেওয়া হবে। আদালতের ওই আদেশের ফলে খালেদা জিয়ার দ্রুত কারামুক্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়ল।

এদিকে এ মামলার নথি তলব করে গত ২২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট যে আদেশ দিয়েছিলেন, তার কপি গতকাল ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ আদালতে পৌঁছেছে। নথি পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী খুরশীদ আলম খান এবং খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া। এ নথি দ্রুত পাঠানোর কাজ চলছে বলে জানান সানাউল্লাহ মিয়া।    

গতকাল জামিন আবেদনের শুনানি কালে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জামিনের বিরোধিতা করে বলেছেন, ‘এই মামলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জামিনের আগে এ মামলায় এক মাসের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তি হওয়া দরকার। মামলায় এসপার-ওসপার হওয়া দরকার। জামিন দিলে আপিল নিষ্পত্তি হবে না। ফেলে রাখবে।’ তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই প্রথম মামলা, যেখানে এতিমের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। সে সময়কার রাষ্ট্রনায়ক বা রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে খালেদা জিয়া এর দায় এড়াতে পারেন না।

দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান বলেন, শুধু লঘু সাজা, বয়স্ক ও অসুস্থতা জামিন আবেদনের যুক্তি হতে পারে না। অসুস্থতার স্পক্ষে কোনো সনদ নেই।

তবে খালেদা জিয়ার আইনজীবী সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘খালেদা জিয়ার সাজা কম। তিনি বয়স্ক নারী। অসুস্থ। তাঁর সামাজিক অবস্থান বিবেচনা করে জামিন আবেদন করছি। আদালতের জামিন দেওয়া এখতিয়ার রয়েছে।’ তবে অসুস্থতার বিষয়ে তিনি কোনো মেডিক্যাল সনদ দাখিল করেননি।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার করা জামিন আবেদনের ওপর গতকাল দুপুর ২টায় শুনানির জন্য সময় নির্ধারিত ছিল। এ কারণে আগেই উপস্থিত হন আইনজীবী, গণমাধ্যমকর্মী, গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি ও বিএনপির শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা। খালেদা জিয়ার পক্ষে বিএনপি সমর্থক আইনজীবী ও রাষ্ট্রপক্ষে সরকার সমর্থক আইনজীবীদের উপস্থিতিতে পুরিপূর্ণ ছিল আদালতকক্ষ। আইনজীবীরা বেঞ্চ অফিসারের বেঞ্চের কাছে গিয়ে অবস্থান নেন। এ অবস্থায় দুপুর ২টা ১৩ মিনিটে এজলাসে ওঠেন দুই বিচারপতি। অবস্থা থেকে আদালত বলেন, ‘এ রকম অবস্থা যদি থাকে তাহলে আমরা উঠে যাব।’ আদালত আরো বলেন, ‘উভয় পক্ষে এত আইনজীবী উপস্থিত হয়েছেন যে আমরা মনে করছি এটা আদালতের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। আমাদের ধারণা হচ্ছে, এই উপস্থিতি দিয়ে আদালতকে বোঝানো হচ্ছে যে আমরা দলে ভারী।’ তখন খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন ওই পরিস্থিতিতেই শুনানি শুরুর পক্ষে মত দিয়ে বলেন, ‘এটা গুরুত্বপূর্ণ মামলা। তা ছাড়া আইনজীবীরা সবাই এ আদালতে থাকার যোগ্য। তাই কাউকে বের করতে গেলে সেটা ভালো দেখাবে না। সবাই আদালতের মর্যাদা রক্ষায় সচেষ্ট থাকবেন।’

ওই সময় অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আমি আগের দিনই বলেছিলাম, আইনজীবীর সংখ্যা নির্ধারণ করে দেন। আজও বলছি, আইনজীবীর সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দিন।’

এর বিরোধিতা করে জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘অ্যাটর্নি জেনারেল একাই যথেষ্ট; কিন্তু তিনিও এসেছেন দলবল নিয়ে। তাঁদের তো রাষ্ট্রের কাজ ফেলে আসার কথা নয়।’

তখন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আইনজীবীদের বেরিয়ে যেতে বলেন বিএনপির সিনিয়র আইনজীবীরা; কিন্তু কোনো পক্ষের আইনজীবী বের না হলে ২টা ১৮ মিনিটে বিচারপতিরা এজলাস থেকে নেমে যান। এর আগে আদালত বলেন, ‘১০ মিনিট পর বসব। এর মধ্যে পরিবেশ ঠিক করুন।’ এরপর বিএনপিপন্থী সিনিয়র আইনজীবীরা চাপ সৃষ্টি করে অনেক জুনিয়র আইনজীবীকে আদালত কক্ষ থেকে বের করে দেন। তবে সরকার সমর্থক আইনজীবীরা বের হননি। ওই অবস্থায় সামনের দিকে একটু ফাঁকা হয়। এরপর ২টা ৩১ মিনিটে আবার এজলাসে ওঠেন দুই বিচারপতি। এর চার মিনিট পর শুনানি শুরু করেন এ জে মোহাম্মদ আলী। ওই সময় খালেদা জিয়ার পক্ষে আরো উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার আমিনুল হক, জিয়াউর রহমান খান, শাহজাহান ওমর, ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, নিতাই রায় চৌধুরী, সানাউল্লাহ মিয়া, নওশাদ জমির, অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম, ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, কায়সার কামাল, রাগিব রউফ চৌধুরীসহ কয়েক শ আইনজীবী।

রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল ছাড়াও ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা ও মোমতাজউদ্দিন ফকির, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফরহাদ রেজা, একরামুল হক টুটুল, মোতাহার হোসেন সাজু, বিশ্বজিৎ দেবনাথ, এফ আর খান, মাসুদ হাসান চৌধুরী পরাগ, অমিত তালুকদারসহ অর্ধশতাধিক আইন কর্মকর্তা। দুদকের পক্ষে খুরশীদ আলম খান ছাড়াও ছিলেন মোশাররফ হোসেন কাজল, আবদুস সালাম। সরকার সমর্থকদের মধ্যে ছিলেন অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিমসহ বেশ কয়েকজন আইনজীবী।

শুনানির শুরুতে এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আবেদনকারীর বয়স ৭৩ বছর। তিনি শারীরিকভাবে বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছেন। তিনি অসুস্থ। তিনি একজন নারী। এ ছাড়া এই আদালতের অনেক নজির রয়েছে, লঘু সাজা হলে আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করার আবেদনের সময় জামিন আবেদন করা হয়। আদালত জামিন দিয়ে থাকেন। এ কারণে আমরা জামিন প্রার্থনা করছি। আমাদের সব যুক্তি আবেদনে উল্লেখ করা আছে। সেগুলো বলে আদালতের সময় নষ্ট করতে চাচ্ছি না।’ তিনি আরো বলেন, ‘গত ২২ ফেব্রুয়ারি আদালত দুদককে যুক্তিসংগত সময় দিয়েছেন। তাই আজ আদালতের কাছে জামিন দেওয়ার আর্জি জানাচ্ছি।’

এরপর দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘লঘু সাজা হওয়ায় জামিন চাওয়া হয়েছে; কিন্তু আইনগতভাবে এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। সাবেক প্রধান বিচারপতি মো. সাহাবুদ্দিন আহমদের একটি রায় রয়েছে যে লঘু সাজা হলেই সে যুক্তিতে জামিন দেওয়া যাবে না। দুই বছর সাজা হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জামিন আবেদনের বিষয়ে এ আদেশ দিয়েছিলেন আদালত।’ দুদকের আইনজীবী আরো কয়েটি উদাহরণ দেন। তিনি মেডিক্যাল গ্রাউন্ড হিসেবে খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের যুক্তি খণ্ডন করে বলেন, ‘আইনজীবীরা হলফনামা দিয়ে অসুস্থতার কথা বলেছেন। কিন্তু স্বপক্ষে কোনো সনদ দেননি।’ তিনি বলেন, ‘এ পরিস্থিতিতে জামিন না দিয়ে রেকর্ড আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা হোক। আর আদালত মেডিক্যাল সনদ চাইতে পারেন। ওই রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত জামিন না দেওয়ার আরজি জানাচ্ছি।’

এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল প্রধানমন্ত্রীর এতিমখানা তহবিল, ব্যাংক হিসাব খোলা, টাকা জমা হওয়া, টাকা তোলা, এফডিআর করাসহ রাষ্ট্রপক্ষের পুরো যুক্তি সংক্ষেপে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই মামলার নথি আসার পর শুনানি করা প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, ‘বিডিআর মামলায় সুপ্রিম কোর্ট নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় দ্রুত পেপারবুক তৈরি করেছেন। আধুনিক মেশিন রয়েছে। তাই আপিল শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হোক। এক মাসের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তি করা হোক।’ তিনি বলেন, খালেদা জিয়া মামলায় বিচারে কালক্ষেপণ করেছেন। নিম্ন আদালতে ৯ বছরের বেশি সময় নিয়েছেন। অথচ আদালতের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন যে রকেটগতিতে বিচার চলছে। খালেদা জিয়ার এ বক্তব্য অসত্য। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের পাঁচ বছর জেল হয়েছিল। তিনি সাড়ে তিন বছর জেল খাটার পর বের হয়েছেন। একজন রাষ্ট্রপ্রধান যদি এত দিন কারাগারে থাকতে পারেন, তাহলে আরেকজন কেন জেল খাটবেন না।’

ওই সময় আদালত বলেন, ‘এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। একজন জেল খেটেছে বলে আরেকজনকে জেল খাটতে হবে, এটা কোনো যুক্তি নয়।’

জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, নিম্ন আদালতে বিচার শেষ করতে ৯ বছরের বেশি লাগছে। এখানে জামিন দিলে আর আপিল শুনানি করবে না।

আদালত বলেন, তারা না করলেও উভয় পক্ষই দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নিতে পারে।

অ্যাটর্নি জেনারেল ভারতের লালু প্রসাদ জাদবের কারাগারে যাওয়ার বিষয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন দেখিয়ে বলেন, ‘দুর্নীতি মামলায় লালু প্রসাদ জাদবকে কারাগারে যেতে হয়েছে। এরশাদের জনতা টাওয়ার মামলার নজির আমাদের সামনে রয়েছে।’ আদালত বলেন, ‘ওই মামলার নথি তো আমাদের সামনে নেই।’ জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘ওই মামলার নথি তলব করুন।’

তখন আদালত বলেন, ‘এ নথি আমরা আনব কেন?’ আদালত আরো বলেন, ‘এক সরকারপ্রধান জেল খেটেছে বলে আরেকজনকে কারাগারে থাকতে হবে এটা শুনানির কোনো যুক্তি হতে পারে না। এটা টক শোর বক্তব্য হতে পারে। কে কোন কুলগাছ লাগাল, কে কুল খেল তা আদালতের দেখার বিষয় নয়। এখানে দেখার বিষয় হলো জনতা টাওয়ার মামলায় এরশাদ জামিন চেয়েছিলেন কি না।’

এরপর এ জে মোহাম্মদ আলীকে উদ্দেশ করে আদালত বলেন, ‘দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষ বিভিন্ন উদাহরণ দিয়েছে। জামিন না দেওয়ার স্বপক্ষে আদালতের আদেশ দেখিয়েছে। আপনার কাছে এ রকম কোনো নজির আছে কি না?’ জবাবে এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আদালতে অনেক নজির রয়েছে। আপিল অ্যাডমিশনের সময় কম সাজার ক্ষেত্রে জামিন দেওয়া হয়। আমরাও তাই চাচ্ছি। আদালতের এখতিয়ার রয়েছে।’ ওই সময় তিনি একটি হত্যা মামলায় জামিন দেওয়ার নজির তুলে ধরেন। বিকেল ৩টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত শুনানি হয়। এরপর দুই বিচারপতি বেশ কয়েক মিনিট নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে আদেশ দিয়ে এজলাস থেকে নেমে যান।

আদালতকক্ষে বিএনপি মহাসচিব : গতকাল আদালতকক্ষে উপস্থিত হন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. মঈন খান এবং মির্জা আব্বাসসহ বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা। আদালতের বাইরেও কয়েক শ নেতাকর্মী উপস্থিত ছিল।

আদালত আদেশ দেওয়ার পর বিএনপিপন্থী জুনিয়র আইনজীবীরা আদালত ভবনের বাইরে মিছিল করেন।

পরে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, জামিন শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেলের রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়া দুঃখজনক।

দুদক ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা মডেল থানায় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা করেছিল। ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট এ মামলার অভিযোগপত্র দেয় দুদক। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ বিচার শেষে গত ৮ ফেব্রুয়ারি রায় দেন। রায়ে খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং অন্য পাঁচ আসামির প্রত্যেককে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।


মন্তব্য