kalerkantho


শিক্ষার বিতর্কিত ৩০ কর্মকর্তা একযোগে বদলি

শরীফুল আলম সুমন   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শিক্ষার বিতর্কিত ৩০ কর্মকর্তা একযোগে বদলি

ঘুরেফিরে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় কর্মরত শিক্ষা প্রশাসনের ২৩ কর্মকর্তাকে রাজধানীর বাইরে বদলি করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড ও আঞ্চলিক কার্যালয়ে থাকা সাত কর্মকর্তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পৃথক দুই আদেশে এসব কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়। এর মাধ্যমে মূলত শিক্ষা প্রশাসনের বড় একটি সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া হলো।

বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের এসব কর্মকর্তাকে বিভিন্ন সরকারি কলেজে পদায়ন করা হয়েছে। এদের অনেকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মের অভিযোগ ছিল। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৮ বছর ধরে ঘুরেফিরে শিক্ষা প্রশাসনে থাকা কর্মকর্তাও রয়েছেন। অথচ এদের প্রধান কাজ সরকারি কলেজে পাঠদান। তবে কজন কর্মকর্তা, যাঁদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই এবং চাকরির মেয়াদ তিন বছর পূর্ণ হয়নি, এই তালিকায় তাঁরাও রয়েছেন।

দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে থাকা এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বহু অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় এত দিন নীরব ভূমিকা পালন করেছে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মচারী ঘুষসহ গ্রেপ্তার এবং প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়ায় মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে থাকা এসব কর্মকর্তার বিষয়ে সরকারের একাধিক সংস্থা প্রতিবেদন দেয়। সর্বশেষ গতকাল শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাঁদের বদলি করেছে। তবে অনিয়মের ঘাঁটি গেড়ে বসা কিছু কর্মকর্তা এখনো রয়ে গেছেন। দ্বিতীয় তালিকায় তাঁদেরও বদলি করা হবে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সাবেক এপিএস, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক ও বিদ্যালয় পরিদর্শক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের পরিচালক, উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালক, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

মাউশির পরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন উইং) অধ্যাপক মো. সেলিম, উপপরিচালক (হিসাব ও নিরীক্ষা) মো. ফজলে এলাহী, উপপরিচালক (কলেজ-২) মো. মেসবাহ উদ্দিন সরকার, উপপরিচালক এস এম কামাল উদ্দিন, উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. শফিকুল ইসলাম সিদ্দিকী, সহকারী পরিচালক (কলেজ-৪) জাকির হোসেন, উপপরিচালক (প্রশিক্ষণ) খ ম রাশেদুল হাসান এবং সহকারী পরিচালক (কলেজ-২) মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেনকে বদলি করা হয়েছে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক আশফাকুস সালেহীন, বিদ্যালয় পরিদর্শক এ টি এম মঈনুল হোসেন, উপসচিব মোহাম্মদ নাজমুল হক, উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাসুদা বেগম, কলেজ উপপরিদর্শক মন্মথ রঞ্জন বাড়ৈ (শিক্ষামন্ত্রীর সাবেক এপিএস) এবং উপপরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অদ্বৈত কুমার রায়কে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়েছে।

এনসিটিবির বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন সম্পাদক দিলরুবা আহমেদ, বিশেষজ্ঞ ফাতেমা নাসিমা আক্তার, বিশেষজ্ঞ মনিরা বেগম ও শাহীনারা বেগম, গবেষণা কর্মকর্তা মারুফা বেগম, মো. হাবিবুল্লাহ, মোহাম্মদ শাহ আলম এবং উৎপাদন নিয়ন্ত্রক মো. আব্দুল মজিদ। এ ছাড়া পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মো. কাওসার হোসেনকে বদলি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

অন্যদিকে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক রাকিবুল ইসলাম, যশোর বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক অমল কুমার বিশ্বাস, কুমিল্লা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক ইলিয়াস উদ্দিন আহম্মদ, কুমিল্লা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক কায়সার আহমেদ, বরিশাল বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক আবুল বশার তালুকদার, মাউশি অধিদপ্তরের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বরিশাল বিএম কলেজে ইনসিটুতে থাকা মো. হেমায়েত উদ্দিন এবং খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিচালক টি এম জাকির হোসেনকে বদলি করা হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রীর এপিএস থাকার সময় মন্মথ রঞ্জন বাড়ৈর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ছিল। মূলত শিক্ষা প্রশাসনের পুরো বদলি-পদায়ন তিনি নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাঁর অনুগ্রহ না পেলে কেউ ঢাকায় আসতে পারতেন না। তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধা নেওয়ারও অভিযোগ ছিল। এসব কারণে শিক্ষামন্ত্রী তাঁকে এপিএস হিসেবে সরিয়ে দিলেও প্রাইজ পোস্টিং হিসেবে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে পদায়ন করেন। এপিএস না থাকলেও তাঁর প্রভাব অব্যাহত থাকে। এর পরও তিনি বদলি বাণিজ্যের একাংশ নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। তবে গতকালের আদেশে তাঁকেও ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়। আর যেসব কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে তাঁদের সিংহভাগ তাঁরই সিন্ডিকেটের সদস্য। সম্প্রতি সরকারের একটি বিশেষ সংস্থার প্রতিবেদনে মাউশি অধিদপ্তরের এক ডজনের বেশি দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার নাম উঠে আসে। যাদের অনেকে আবার জামায়াত-বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার মাউশির মনিটরিং ও ইভ্যালুয়েশন উইংয়ের উপপরিচালক ছিলেন। তিনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির দলীয় সাংসদ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শামসুল আলম প্রামাণিকের একান্ত সচিব ছিলেন। ছাত্রজীবনে ঢাবির জহুরুল হক হলের ছাত্রদল নেতা ছিলেন। চাকরিজীবনের ১৮ বছর তিনি ঢাকা শিক্ষা বোর্ড, ডিআইএ ও মাউশির গুরুত্বপূর্ণ সব পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

মাউশির উপপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম সিদ্দিকী। দীর্ঘদিন তিনি প্রশাসন শাখায় কর্মরত ছিলেন। উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিসার ও কর্মচারী বদলির কলকাঠি নাড়তেন তিনি। উপজেলা ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের বদলিতে তিন থেকে সাত লাখ টাকা লেনদেন হতো। কর্মচারী বদলিতেও এক থেকে দেড় লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। গতকাল তাঁকেও বদলি করা হয়।

মাধ্যমিক শাখার উপপরিচালক এ কে মোস্তফা কামাল। সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হয়েও তিনি দীর্ঘদিন প্রশাসনে চাকরি করছেন। ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ঢাকার গভর্মেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ওই সময় তিনি আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও বাচ্চু রাজাকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিতেন বলে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ওসমান ফারুকেরও খুব কাছের মানুষ ছিলেন তিনি। এখন মাধ্যমিকের সব কাজই তাঁর ইশারায় হয়। সম্প্রতি নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদক মোস্তফা কামালকে একাধিকবার তলব করেছে। বদলির দ্বিতীয় তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

বেসরকারি কলেজ শাখার উপপরিচালক মেজবাহ উদ্দিন সরকার। তিনি অধ্যাপক হয়েও নিম্নপদে সহযোগী অধ্যাপকদের পদে চাকরি করছেন। তিনিও বিএনপি-জামায়াতের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি মাউশির দুই হাজার কর্মচারী নিয়োগ কমিটির হর্তাকর্তা ছিলেন। ১০ বছর ধরে তিনি মাউশিতে কর্মরত আছেন।

মাধ্যমিক শাখার শিক্ষা অফিসার-২ মো. আফসার উদ্দিন। সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পেয়েও প্রভাষকের নিম্নপদে চাকরি করছেন। দুদকে নিয়মিত তাঁকে হাজিরা দিতে হয়। আর্থিকভাবে প্রতাপশালী এই কর্মকর্তা একসময় ঢাবির মুহসীন হলের শিবিরের নেতা ছিলেন। বদলির দ্বিতীয় তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে।

প্রশিক্ষণ শাখার সহকারী পরিচালক নিগার সুলতানা। নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার সহকারী পরিচালক সাবিনা বেগম মাউশিতে রয়েছেন ২০০৫ সাল থেকে। প্রতিবেদনে তাঁদের দুজনকে কারিশমাটিক কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আঞ্চলিক শিক্ষা অফিসে এমপিও বিকেন্দ্রীকরণ হলেও এ খাতে দুর্নীতির পরিমাণ বেড়েছে। ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা ছাড়া কোনো এমপিও পান না শিক্ষকরা। আর এ টাকার ভাগ মাঠপর্যায় থেকে মাউশির মাধ্যমিক শাখার একজন উপপরিচালককে দিতে হয়। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ১২৪ জন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে রয়েছেন খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপপরিচালক টি এম জাকির হোসেনের নাম। তাঁকেও গতকাল বদলি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে কুষ্টিয়া জেলার ৪৪ জন শিক্ষকের নাম দেওয়া হয়েছে। যাঁরা ঘুষ দিয়ে এমপিও পেয়েছেন। আর এ টাকার ভাগ পেয়েছেন টি এম জাকির হোসেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আরো বদলি হবে। আরেকটি তালিকা প্রস্তুত আছে। দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এ ছাড়া নিয়মানুযায়ী তিন বছরের বেশি সময় কারো একই দপ্তরে থাকারও সুযোগ নেই।’



মন্তব্য