kalerkantho


ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল

দুর্নীতিমুক্তিতে দেশ দুই ধাপ এগিয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



দুর্নীতিমুক্তিতে দেশ দুই ধাপ এগিয়েছে

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) প্রকাশিত ‘দুর্নীতির ধারণাসূচকে’ (সিপিআই) এ বছর বাংলাদেশের অবস্থানের কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বিশ্বের ১৮০টি দেশ ও অঞ্চলের ২০১৭ সালের দুর্নীতির পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে জার্মানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান টিআই এই সূচক প্রকাশ করেছে। সূচকের ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান এবার ১৪৩ নম্বরে। গত বছর ১৭৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৫ নম্বরে। আবার অধঃক্রম অনুযায়ী বিবেচনা করলে বাংলাদেশ আগের ১৫তম অবস্থান থেকে এবার ১৭তম অবস্থানে উঠে এসেছে। অর্থাৎ এই ক্রমে বাংলাদেশ দুই ধাপ এগিয়েছে।  

গতকাল বৃহস্পতিবার সারা বিশ্বে একযোগে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। রাজধানীর ধানমণ্ডিতে মাইডাস সেন্টারে দুর্নীতির ধারণাসূচকে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন টিআই বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

দুর্নীতি কমছে, এই ভালো খবরের মধ্যে কিছুটা হতাশার চিত্রও রয়েছে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সাত নম্বরে। বাংলাদেশের পরে রয়েছে শুধু আফগানিস্তান। আর এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে চতুর্থ সর্বনিম্ন অবস্থানে।

যেসব দেশে সবচেয়ে কম দুর্নীতি হয় সেই তালিকায় এক নম্বরে আছে নিউজিল্যান্ড। দুই ও তিন নম্বরে আছে যথাক্রমে ডেনমার্ক ও নরওয়ে।

টিআই বলছে, সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ আফ্রিকার সোমালিয়া। দুর্নীতির ধারণাসূচকে বাংলাদেশের কিছুটা অগ্রগতির খবর এমন সময় এলো, যখন ব্যাংকিং খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক কেলেঙ্কারি, উন্নয়ন বাজেটের টাকায় ব্যাপক অনিয়ম ও এতিমের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পাঁচ বছরের সাজা নিয়ে দেশে ও দেশের বাইরে আলোচনা-সমালোচনা তুঙ্গে।

এ বিষয়ে টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণাসূচকে খালেদা জিয়ার দুর্নীতির বিষয়টি আসেনি। তা ছাড়া একজনের বিচার হলেই আইন সবার জন্য সমান, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়; এটা বলার সময় এখনো আসেনি। যখন দেখা যাবে, যাদের বিরুদ্ধে বড় বড় দুর্নীতির অভিযোগ, তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছে, তখনই শুধু বলা যাবে আইন সবার জন্য সমান। ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, “বাংলাদেশের আরো ভালো করার সুযোগ ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে সেটা হচ্ছে না। জবাবদিহিরও অভাব রয়েছে। ব্যাংকিং খাতে যারা দুর্নীতি করেছে, তাদের এখনো বিচারের আওতায় আনা হয়নি। উল্টো অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘যারা ব্যাংক কেলেঙ্কারি করেছে, তারা আমাদের লোক। এ কারণে দোষীদের বিচারের আওতায় আনা যাচ্ছে না।’”

দুর্নীতিতে বাংলাদেশের কেন এমন অগ্রগতি, এর ব্যাখ্যায় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশে গত এক বছরে আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতি কাঠামো তুলনামূলক সুদৃঢ় হয়েছে। এই ধারণা থেকে সূচকে বাংলাদেশ দুই ধাপ এগিয়েছে। এ ছাড়া ক্রয়নীতি একটি নিয়মের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রয়োগের ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতে নানা কেলেঙ্কারি, অর্থনৈতিক খাতসহ বিভিন্ন খাতে ক্রমবর্ধমান অনৈতিক প্রভাব বিস্তার, অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িত সহায়তাকারী ও দায়ীদের উল্লেখযোগ্য বিচারের আওতায় আনতে না পারায় আমরা আরো ভালো করতে পারিনি।’

তাঁর মতে, যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা বিরল। দেশ থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। পৃথিবীর কোথাও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া দুর্নীতি কমানো সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের এই সামান্য অগ্রগতি কোনো অবস্থাতেই সন্তোষজনক নয়। কিছুটা স্বস্তি বলা যেতে পারে। সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ড. এম হাফিজউদ্দিন খান, টিআইবির নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের ও আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক রিজওয়ান উল আলম।

টিআই তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ১০০ স্কোরের মধ্যে ৪৩ স্কোরকে গড় স্কোর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেই হিসাবে বাংলাদেশের স্কোর ২৮। এতে বোঝা যায়, এখানে দুর্নীতির ব্যাপকতা এখনো উদ্বেগজনক। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরো কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ বিশেষ করে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর দুদক এবং গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। দুর্নীতির ধারণাসূচক (সিপিআই) সারা বিশ্বে ১৯৯৫ সাল থেকে শুরু হলেও বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় ২০০১ সাল থেকে। অন্তর্ভুক্তির প্রথম বছর থেকে টানা পাঁচ বছর দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। তার পরের বছর তিন থেকে সাত, এরপর ১০, ১৩ এবং সবশেষ ১৫ নম্বরে অবস্থান নেয় বাংলাদেশ। এবারের অবস্থান ১৭তম। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ ভুটান। দেশটির স্কোর ৬৭। ভারতের অবস্থান ৮১তম। পাকিস্তান ১১৭তম।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিশ্বব্যাপী দুর্নীতি প্রকট আকার ধারণ করেছে। ২০১৭ সালের সিপিআই অনুযায়ী, বৈশ্বিক দুর্নীতি পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক। নিউজিল্যান্ড, ডেনমার্ক ও নরওয়ের মতো দেশেও দুর্নীতি বাড়ছে। সেটি স্কোরে প্রমাণিত। বিশ্বব্যাপী দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লক্ষণীয় উদ্যোগ গ্রহণের পরও বেশির ভাগ দেশের প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে ধীরগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। টিআই বলেছে, যেসব দেশে গণমাধ্যম ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো (এনজিও) কম সুরক্ষা পেয়ে থাকে, সেসব দেশে দুর্নীতি অধিকতর মাত্রায় বিদ্যমান।



মন্তব্য