kalerkantho


জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট নিবন্ধনহীন

রায়ে আরো আছে, কুয়েত দূতাবাসের সনদ জাল

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট নিবন্ধনহীন

জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট ছিল নিবন্ধনহীন। সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তরে এটি রেজিস্ট্রিকৃত ছিল না। সুতরাং এই ট্রাস্টে সরকারি কোনো তহবিল থেকে টাকা প্রদান করা ছিল আইনবহির্ভূত কাজ। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ে এ কথা বলা হয়েছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ-৫-এর বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছর এবং তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমানসহ পাঁচজনের প্রত্যেককে দশ বছর করে কারাদণ্ডসহ জরিমানা করা হয়।

রায়ে বলা হয়, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট সম্পর্কিত পরিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, এটি একটি নামসর্বস্ব ট্রাস্ট। এখানে কোনো এতিম নেই। অরেজিস্ট্রিকৃত ও এতিমবিহীন ট্রাস্টে প্রচলিত নিয়মকানুন উপেক্ষা করে দুই কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা প্রদান করার বিষয়টি আইনসম্মত বিষয় বলে মেনে নেওয়া যায় না।

রায়ে বলা হয়, খালেদা জিয়া আত্মপক্ষ সমর্থনে বলেছেন, মামলার বিবরণ থেকে তিনি যতটুকু জেনেছেন, তাতে কুয়েতের দেওয়া অনুদানের অর্থ দুই ভাগ করে দুটি ট্রাস্টকে দেওয়া হয়। একটি বাগেরহাটের ট্রাস্ট। অন্যটি বগুড়ায়। বাগেরহাটে অনুদানের টাকায় ট্রাস্টের মাধ্যমে স্থাপিত এতিমখানা সুন্দর ও সুচারুরূপে পরিচালিত হচ্ছে। সেই ট্রাস্ট সম্পর্কে কোনো অভিযোগও নেই। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট বগুড়ায় স্থাপনের লক্ষ্যে সেখানে জমি কেনা হয়েছে। জমি কেনা সম্পর্কে কোনো অভিযোগ নেই। বগুড়ার এই ট্রাস্টের বাকি টাকা ব্যাংকে গচ্ছিত আছে। তা সুদ-আসলে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ট্রাস্ট রেজিস্ট্রিভুক্ত। কোনো অনিয়ম হয়নি। খালেদা জিয়া আরো বলেন, ট্রাস্টের বিষয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে বা আইন লঙ্ঘন করলে ট্রাস্ট আইনে অভিযোগ ও মামলা হতে পারে। দুদক আইনে কেন? এটা তাদের আওতা ও এখতিয়ারের ভেতরে পড়ে?

তবে ট্রাস্টটি যে রেজিস্ট্রিভুক্ত এমন কোনো কাগজপত্র আদালতের সামনে হাজির করেনি আসামিপক্ষ। আদালত মনে করেন, দুর্নীতি করলে দুর্নীতিসংক্রান্ত যেকোনো আইন সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কারণ বাগেরহাটের ট্রাস্টের সেটলার ছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এস এম মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি মৃত্যুবরণ করায় তাঁর বিষয়ে দুদক আর তদন্ত করেনি। কাজেই খালেদা জিয়া বাগেরহাটের ট্রাস্টের ব্যাপারে যে ইতিবাচক কথা বলেছেন তা ধোপে টেকে না।

আদালত রায়ে বলেছেন, এতিমবিহীন এতিমখানায় টাকা দেওয়ায় দেশের লাখ লাখ এতিমের অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। এতিমদের কল্যাণে ব্যয় না করে এতিমখানার টাকা ব্যাংকে রাখলে এতিমদের কল্যাণ সাধিত হয় না বলে আদালত মনে করেন। ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যও বাস্তবায়িত হয় না।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট সম্পর্কে অভিযোগ উত্থাপনের পর যখন বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তা অনুসন্ধান শুরু করেন তখন তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নথিপত্র সরবরাহ করায় গড়িমসি করা হয়েছিল বলেও রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঘটনার অনুসন্ধান কর্মকর্তা তাঁর প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, ‘অনুসন্ধানের নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের সংশ্লিষ্ট নথি এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য সম্পৃক্ত কাগজপত্র সরবরাহ করা হয়নি। এ কারণে প্রথম অনুসন্ধানী কর্মকর্তা খালেদা জিয়ার সম্পৃক্ততা সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে পারেননি।

প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল নামে কোনো দিনই কোনো এতিম তহবিল ছিল না মর্মে খালেদা জিয়ার পক্ষে দাবি করা হয়। ওই দাবির সঙ্গে তাঁরা বলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠনের জন্যই কুয়েতের আমির টাকাটা অনুদান দিয়েছে। এ জন্য তারা কুয়েত এমবাসির একটি সনদ আদালতে দাখিল করেন ২০১৬ সালের ৩ নভেম্বর। ওই সনদে উল্লেখ আছে, কুয়েত সরকারের পক্ষ থেকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে টাকা দান করা হয়েছে। কোনো পৃথক ব্যক্তি বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহারের জন্য এটা দেওয়া হয়নি। এমবাসি সবাইকে অনুরোধ করেছে, এই টাকা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যাখ্যা না করার জন্য।

আদালতে দাখিল করা কুয়েত এমবাসির ওই সনদ থেকে দেখা যায়, এটি একটি ফটোকপি। ওই সনদে প্রেরকের বা সনদ প্রদানকারী কোনো ব্যক্তির স্বাক্ষর নেই। আদালত রায়ে উল্লেখ করেছেন, যে পত্রটি আদালতে দাখিল করা হয়েছে ওই পত্রে স্মারক নম্বর নেই। কে সনদটি দিয়েছেন তাঁর নাম নেই, পদবি নেই। কত টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে তাও নেই। আবার সনদটি বা চিঠিটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে দেওয়া হয়নি। বা পররাষ্ট্রসচিবকেও দেওয়া হয়নি। খালেদার আইনজীবী মোহাম্মদ আলীর ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। এটা বাস্তবসম্মত নয়। টাকা আসে ১৯৯১ সালে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠন করা হয় ১৯৯৩ সালে। তাই জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে টাকা কিভাবে দিয়েছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। ট্রাস্ট গঠনের আগেই কুয়েতের আমির ট্রাস্টের নামে টাকা দিয়েছে? তাই চিঠির কোনো মূল্য নেই। মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে গ্রহণ করারও কোনো কারণ নেই। কুয়েত এমবাসির নামে দেওয়া ওই সনদ আসামিদের রক্ষা করতে জাল করা হয়েছে বা সৃজন করা হয়েছে বলে আদালত মনে করেন।


মন্তব্য