kalerkantho


শ্রদ্ধায় ভাষাশহীদদের স্মরণ

সর্বস্তরে চাই বাংলার প্রতি সম্মান

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সর্বস্তরে চাই বাংলার প্রতি সম্মান

মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে গতকাল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ফুলে ছেয়ে যায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। ছবি : কালের কণ্ঠ

ফিরে ফিরে আসে একই স্লোগান, একই প্রত্যয়—বাংলা ভাষার অসম্মানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও; সর্বস্তরে নিশ্চিত হোক বাংলা ভাষার ব্যবহার। ৬৬ বছর আগে মায়ের ভাষার জন্য আত্মত্যাগের মহিমায় বারে বারে জেগে ওঠে বাঙালির প্রাণ; বাংলার প্রাণ—বাংলার জয়গান। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনায় এবারেও জেগে উঠেছিল দেশের ভেতরে-বাইরে কোটি কোটি মানুষ। শোক আর শক্তিতে উজ্জীবিত প্রভাতফেরি এবং ফুলেল শ্রদ্ধা আবারও জানিয়ে দিল—বাংলা বাঙালির প্রাণের ভাষা। চাই এ ভাষার প্রতি যথাযথ সম্মান; দেশে কিংবা বিদেশে। পাশাপাশি  মর্যাদার উচ্চতায় টিকে থাকুক সব জাতির মাতৃভাষা।

একুশের প্রথম প্রহর পার করে রাত থেকেই ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে ছুটতে থাকে মানুষের স্রোত। রাত গড়িয়ে ভোর, সকাল, তারপর দুপুরের পর পর্যন্ত চলতে থাকে শ্রদ্ধা জানানোর পালা। এর সঙ্গে একুশের গ্রন্থমেলায় নামা মানুষের ঢল মিলেমিশে একাকার হয়। অগণিত মানুষ ফুল, ফুলের বাহারি ডালা, ব্যানার, ফেস্টুন নিয়ে ছোটে শহীদ মিনারের দিকে। কেউ শিশুসন্তানকে কোলে-কাঁধে নিয়ে, কেউ বা বৃদ্ধ মা-বাবার হাত ধরে রেখে ধীর পায়ে এগিয়েছে। পোশাকে-সাজে ছিল একুশের আবহ। সাদা-কালো রং কিংবা নানা লেখা ও কারুকাজের ছোঁয়া। শহীদ মিনারের দিকে যাওয়া সব পিচঢালা পথে আঁকা ছিল বাহারি রঙের আল্পনা।

একুশের প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের ও সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের শ্রদ্ধাঞ্জলির পর সাধারণ মানুষের ঢল বাড়তে থাকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। সকালে মানুষের ঢল নীলক্ষেত, আজিমপুর, পলাশী হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পর্যন্ত  ঠেকে যায়। বিদেশিরাও আসে শ্রদ্ধা জানাতে।

রাজধানীর হাতিরঝিল, ধানমণ্ডি রবীন্দ্রসরোবর, শাহবাগ, জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার চারদিকেও সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিল একুশের আবহে সাজা মানুষের ভিড়। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ছাড়াও রাজধানীর প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নিজস্ব আয়োজনে চলে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ, নানা আয়োজনে একুশে ফেব্রুয়ারি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা উদ্যাপন।

সকাল সাড়ে ৮টায় ধানমণ্ডি থেকে শহীদ মিনারে যাওয়ার পথে বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানজিনা তাবাচ্ছুম বলেন, ‘এর আগে কখনো কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিতে পারিনি, ঢাকার বাইরে থাকতাম। এবার কি আর সুযোগ হাতছাড়া করতে পারি? তাই আগেভাগেই শাড়ি বানিয়েছি, গত রাতে ফুল কিনে নিয়েছি, শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে হাতে ও গলায় গহনা পরেছি, তারপর বন্ধুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।’

শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে বেদি থেকে নেমে আসার পর জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্যি, একদিকে বাংলা ভাষা শক্তিশালী হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী প্রসারিত হচ্ছে, অন্যদিকে দেশে বাংলা ব্যবহারে দুর্বলতা আসছে, ঢাকাসহ সারা দেশে ইংরেজি ব্যবহারের মাত্রা বাড়ছে, এমনকি আমাদের সরকারি অফিসগুলোতে আমরা অপ্রয়োজনেও ইংরেজি লিখছি, বলছি, ব্যবহার করছি। মনে হয়, ইংরেজি না লিখলে বা বললে বুঝি আমাদের জাত নষ্ট হয়ে যাবে।’ তিনি উদাহরণ দেন, প্রতিদিন ঢাকায় যত রকম সরকারি-বেসরকারি সম্মেলন হয় সেগুলোতে শত শত বাঙালির মাঝে দু-একজন ভিনদেশি থাকলেও বক্তব্য, উপস্থাপনা কিংবা সাজসজ্জায় ইংরেজি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সবাই বাংলাদেশি থাকলেও ইংরেজিতে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, উপস্থাপনা করা হচ্ছে। এটা এক ধরনের ফ্যাশনে পরিণত হয়ে গেছে। এখন আওয়াজ তুলতে হবে, রুখে দাঁড়াও বাংলা ভাষার অসম্মানের বিরুদ্ধে।

সকাল ৯টায় অন্যান্য বিচারপতি ও আইনজীবীদের নিয়ে শহীদ মিনারে আসেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘বর্তমানে অনেক বিচারপতি শুনানি দিচ্ছেন বাংলায়, রায়ও দিচ্ছেন বাংলায়। ধীরে ধীরে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়বে। সর্বক্ষেত্রে যেন বাংলার আরো বেশি ব্যবহার হয়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।’ সাবেক প্রধান বিচারপতি ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এ বি এম খায়রুল হক বলেন, ‘উচ্চ আদালতের সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার চালু করা প্রয়োজন। আর এ জন্য প্রধান বিচারপতি ও অন্য বিচারপতিদের মানসিকতাই যথেষ্ট।’

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সাম্প্রদায়িক অশুভ শক্তিকে পরাজিত করে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে চাই, এটাই আজকের দিনে আমাদের অঙ্গীকার। জাতিসংঘের কাছে আজকে আমাদের একটাই দাবি, বাংলা ভাষাকে দাপ্তরিক মর্যাদা দেওয়া হোক।’

সকাল ১১টায় বিএনপি শ্রদ্ধা জানাতে আসে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুর্ভাগ্য! আমাদের এমন এক সময়ে এবারের মাতৃভাষা দিবস পালন করতে হচ্ছে, যখন গণতন্ত্রের কবর রচনা করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক সমস্ত রীতি-নীতি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। আমাদের নেত্রীকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে দিনযাপন করতে হচ্ছে। তাই দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে আমরা এই দিনটি পালন করছি।’

শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসা প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদা বলেন, ‘সরকারিভাবে বাংলা ভাষার প্রয়োগে আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশনের সব দাপ্তরিক কাজে বাংলা ভাষা প্রয়োগ শুরু হয়েছে। আমরা শুধু বিদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া কমিশনের সব কাজ বাংলায় করি।’ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, ‘বাংলাকে মাতৃভাষা স্বীকৃতির এত বছর পরেও দেশে সব ক্ষেত্রে বাংলার বাধ্যতামূলক ব্যবহার করতে পারিনি। এটা আমাদের জন্য ব্যর্থতা।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের একুশের চেতনা থেকে সব ক্ষেত্রে পরিমিত ও পরিমার্জিত বাংলা ভাষার ব্যবহার করার অঙ্গীকার করতে হবে।’ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘বিশ্বায়নের যুগে নিজস্ব ভাষার চর্চা ও সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিতে যেতে হবে।’ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘যারা একুশের চেতনা ধারণ করে, বিশ্বাস করে, তারা কখনো দুর্নীতিতে জড়াতে পারে না।’

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু বলেন, ‘সবাই যার যার জায়গা থেকে কাজ করলে বাংলা ভাষা আরো এগিয়ে যাবে।’ গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার বলেন, ‘একুশ মানে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা। প্রতিটি অন্যায়ের বিপক্ষে তরুণরা রুখে দাঁড়াবে।’

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মেসিডোনিয়ার নাগরিক কোজেনা কালের কণ্ঠ’র কাছে বলেন, ‘ভাষার জন্য বাঙালি তরুণদের আত্মত্যাগ ছিল অসাধারণ। যার জন্য আজ হাজার হাজার মানুষ এখানে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছে। এই পরিবেশ আমাকে অভিভূত করেছে।’ সকাল থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট, বার কাউন্সিল, বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (বাপা), বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-বিএমএ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মহিলা পরিষদ, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, বাংলাদেশ ইউনেসকো জাতীয় কমিশন, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, বিবেকানন্দ বিদ্যার্থী ভবন, রামকৃষ্ণ মিশন, কলেজ স্ট্রিট কলকাতার খোলা চিঠি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ সাংগঠনিক সংসদ, গণবিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদ, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ছাত্রলীগ-হোম ইকোনমিকস কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, সাংস্কৃতিক সংগঠন শাপলা শালুক, ছায়ানট, উদীচী শিল্পগোষ্ঠী, বাতিঘর, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম লীগ, বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ, সিভিল সার্ভিস ট্যাক্সেস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা ও বঙ্গবন্ধু পেশাজীবী লীগসহ বহু সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমানের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এর আগে একুশের প্রথম প্রহরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থিত শহীদ মিনারে উপাচার্যের পক্ষে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা থেকে একুশের প্রথম প্রহর পর্যন্ত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আবৃত্তি সংসদের উদ্যোগে ‘চেতনায় একুশ’ নামের কবিতা, গান, গল্প ও প্রবন্ধ পাঠের আসর চলে।

পাহাড়ি ছাত্রপরিষদের বিক্ষোভ : আদিবাসীদের জন্য মায়ের ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চলু করার দাবিতে শহীদ মিনার এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্রপরিষদ। মঙ্গলবার রাত সোয়া ১টার দিকে শহীদ মিনারের সামনে এ বিক্ষোভ হয়। তাদের বহন করা ব্যানারে লেখা ছিল, ‘মায়ের ভাষায় লিখতে চাই, মায়ের ভাষায় পড়তে চাই’, ‘সকল আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু করো’।

ছায়ানটের আয়োজন : সন্ধ্যায় ছায়ানট মিলনায়তনে মান্নান হীরা নির্মিত মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে এক নারীর সংগ্রামী জীবনের নাট্যপ্রকাশ ‘লালজমিন’ মঞ্চস্থ হয়। সুদীপ চক্রবর্তী নির্দেশিত এ নাটকে অভিনয় করেন মোমেনা চৌধুরী। ‘ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি’ ও ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে’ গেয়ে শোনান ছায়ানটের শিল্পীরা। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ছায়ানট সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমদ লিসা।

 



মন্তব্য