kalerkantho


সরকার বদলালে নিরাপত্তা সহযোগিতা ঝুঁকিতে পড়বে

বিশেষ প্রতিনিধি   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সরকার বদলালে নিরাপত্তা সহযোগিতা ঝুঁকিতে পড়বে

আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় না এলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলমান চমৎকার নিরাপত্তা সহযোগিতা হুমকির মধ্যে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দুই দেশের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা। গতকাল বুধবার ঢাকার একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশ-ভারত নিরাপত্তা উদ্বেগ ও পারস্পরিক সহযোগিতা’ শীর্ষক আলোচনায় তাঁরা এ উদ্বেগের কথা জানান। তিন দিনের ‘বাংলাদেশ-ভারত গণমাধ্যম সংলাপ-২০১৮’-এর শেষ দিনের প্রথম পর্বে ওই আলোচনায় নিরাপত্তা বিশ্লেষক, শিক্ষাবিদ, গবেষক, রাজনীতিকরাও উপস্থিত ছিলেন। এরপর বিকেলে সমাপনী অনুষ্ঠানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এ দেশে যারা আওয়ামী লীগের বিকল্প তারা পাকিস্তানের বন্ধু। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার বাংলাদেশে ভারতবিরোধী জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ভারতের ‘সেভেন সিস্টারসে’ আজ শান্তির সুবাতাস বইছে। সেখানে সমস্যা সৃষ্টি করেছিল বিগত বিএনপি-জামায়াত সরকার। 

ওবায়দুল কাদের আগামী নির্বাচনের আগেই তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সইয়ের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, তাঁর সরকার ও শেখ হাসিনার সরকারই তিস্তা চুক্তি করবে। এটি বাংলাদেশে নির্বাচনের বছর। নির্বাচনের আর সাত-আট মাস বাকি। তিস্তা চুক্তির জন্য আওয়ামী লীগকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। তিনি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত হওয়া ঠেকাতে ভারতের সহযোগিতা প্রত্যাশা

করেন। এ ছাড়া তিনি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য ভারতকে ওই দেশটির সঙ্গে তাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘এ সংকট থেকে আমাদের বাঁচান।’

ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল’ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (আইসিএলডিএস) আয়োজিত সংলাপ অনুষ্ঠানে গতকাল প্রথম পর্বে ডিবিসি নিউজের সম্পাদক জায়েদুল আহসান পিন্টু তাঁর প্রবন্ধে বলেন, সামরিক স্বৈরশাসক থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বিভিন্ন সরকারের সময় কখনো আমরা ভারতকে বন্ধু ও সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করেছি। আবার কখনো ভারতকে আমাদের প্রধান শত্রু হিসেবে দেখেছি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর উলফা নেতারা দ্রুত বুঝতে পারেন, শেখ হাসিনার সরকারের আমলে তাঁদের বাংলাদেশের মাটিতে তৎপরতা চালানো অসম্ভব।

তিনি বলেন, উলফা নেতারা অতীতে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন পর্যায় ও পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইর সহযোগিতা পাওয়ার কথা অস্বীকার করেননি। সুইডিশ সাংবাদিক বার্টিল লিন্টনার উলফাকে বাংলাদেশের বিগত সরকারের সহযোগিতার কথা সরাসরি বলেছেন। ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী সোশ্যালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ডের (এসএসসিএন) চেয়ারম্যান ইসাক সু ও অ্যান্থনি শিমরাইর বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশ ভ্রমণ করেছিলেন বলে অভিযোগ আছে। ২০০৪ সালে দশ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় স্পষ্ট যে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিবিড় যোগাযোগ ছিল।

জায়েদুল আহসান পিন্টু বলেন, ‘শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতা হারালে আমরা আবার পুরনো সমস্যায় ফিরে যেতে পারি। আমরা এ দেশে আইএসআইয়ের ও চীনের আরো প্রভাব দেখতে পারি। তখন ঢাকা-দিল্লি সহযোগিতা গুরুতর হুমকিতে পড়বে।’

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক একাত্তর টিভির প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু জানান, ভারতীয় সাংবাদিকরা গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতে প্রশ্ন করেছিলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে কী ঘটবে? শেখ হাসিনা যে উত্তর দিয়েছেন তা জায়েদুল হাসান পিন্টুর প্রবন্ধে স্থান পেয়েছে।

ভারতের ক্যাচ নিউজের সাবেক সম্পাদক ভারত ভূষণ তাঁর প্রবন্ধে বলেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নিরাপত্তা খাতে সহযোগিতার বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। ভারতবিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী বিএনপিকে তার কবজার বাইরে যেতে দেয়নি। জামায়াত বিএনপির পেশিশক্তি হিসেবে কাজ করে। বিএনপি-জামায়াতের আমলে উলফা নেতারা বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করেছেন। বিএনপি-জামায়াত সখ্য ভাঙবে না।

ভারত ভূষণ বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, চীনের ‘এক বলয়, এক পথ’ স্ট্র্যাটেজিক পরিকল্পনা, বাংলাদেশ থেকে ভারতে অনুপ্রবেশ, বাংলাদেশ-নেপাল রুট ব্যবহার করে আইএসআইয়ের জাল ভারতীয় মুদ্রার প্রবাহ, বাংলাদেশে পাকিস্তানি হাইকমিশনের কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদে সম্পৃক্ততাকে ভারতের জন্য উদ্বেগের বলে উল্লেখ করেন।

ভারতের আরো কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আগামী নির্বাচনে সরকার বদলালে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করেন।

দৈনিক আমাদের অর্থনীতির সিনিয়র নির্বাহী সম্পাদক মাসুদা ভাট্টি বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার পরপরই আইএসআই চট্টগ্রামে ক্যাম্প খুলেছিল। কদিন আগে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের বাংলাদেশ সফরের সময় একটি ছবি দিয়ে প্রচারণা চালানো হয়েছে, বাংলাদেশ হিন্দু রাষ্ট্রের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের বুঝতে হবে, কারা আমাদের বন্ধু, আর কারা শত্রু। আমাদের মৈত্রীকে নিরাপদ করতে হবে।’         

ভারতের আউটলুকের ফরেন এডিটর প্রণয় শর্মা জানতে চান, ক্ষমতার পালাবদল হলে নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে কী করা প্রয়োজন? জবাবে সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম হারুন অর রশিদ বলেন, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক থাকলে দুই দেশেই স্থিতিশীলতা থাকবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, আসাম ইস্যু ও পানি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। চীনা বিনিয়োগ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে।

গবেষক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কাজী সাজ্জাদ আলী জহির ভারতকে ২০০১ সালের মতো বিএনপিকে সমর্থন দিয়ে ভুল না করার আহ্বান জানান। তিনি চান, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রক্তের যে বন্ধন গড়ে উঠেছিল তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম অব্যাহত থাকুক।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের কাছে চীন কখনো ভারতের বিকল্প হতে পারে না। তিনি ভারতকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়ার অনুরোধ জানান। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিকবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান তিস্তা ইস্যুকে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় মন্তব্য করেন।

অনুষ্ঠানের সমাপনী পর্বে ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনার আদর্শ সোয়াইকা এ সংলাপকে অত্যন্ত সময়োপযোগী হিসেবে উল্লেখ করেন। তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম বলেন, বিএনপি-জামায়াতের আমলে বাংলাদেশ সন্ত্রাসের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছিল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত ৯ বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সবচেয়ে ভালো পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে।

এর আগে গত মঙ্গলবার একাত্তর টিভির পরিচালক (বার্তা) সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, দ্য এশিয়ান এজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ বদরুল আহসান, দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার চিফ অব ব্যুরো (পলিটিক্স অ্যান্ড পলিসি) দেবদ্বীপ পুরোহিত ও দ্য টেলিগ্রাফের বিজনেস এডিটর জয়ন্ত রায় চৌধুরী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। ভারতীয় ২৩ জন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক/সম্পাদকের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক/সম্পাদক সংলাপে অংশ নেন। অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী, ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা অংশ নেন।



মন্তব্য