kalerkantho


৪৪ যুক্তি দেখিয়ে খালেদা জিয়ার আপিল দাখিল

হাইকোর্টে জামিন আবেদন কাল

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



৪৪ যুক্তি দেখিয়ে খালেদা জিয়ার আপিল দাখিল

ফাইল ছবি

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া সাজা বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে আপিল করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। এই আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নিম্ন আদালতের দেওয়া সাজা ও জরিমানা স্থগিত চাওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে জামিনও চাওয়া হয়েছে। তবে জামিনের মূল বা সম্পূরক আবেদন আগামীকাল বৃহস্পতিবার দাখিল করা হবে বলে জানা গেছে। আপিলের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে শুনানির সময়ই ওই আবেদন উপস্থাপন করা হবে। আপিল আবেদনে নিম্ন আদালত থেকে মামলার নথি তলব করার আদেশ চাওয়া হয়েছে। 

বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহীম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে ওই দিন আপিলের গ্রহণযোগ্যতা ও জামিন আবেদনের শুনানি হতে পারে। ওই আদালত খালেদা জিয়ার আবেদন বৃহস্পতিবারের কার্যতালিকায় রাখার অনুমতি দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার আদেশ দিয়েছেন। কার্যতালিকার ৬ নম্বরে এটি রয়েছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার আপিলের কপি গতকালই রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদককে সরবরাহ করতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের প্রতি ওই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা জানান, ৪৪টি যুক্তি তুলে ধরে এক হাজার ২২২ পৃষ্ঠার আপিল আবেদনে নিম্ন আদালতের দেওয়া সাজা বাতিল চাওয়া হয়েছে। আপিলে খালেদা জিয়ার ক্ষমতার অপব্যবহার বিষয়ে দেওয়া বক্তব্য নিম্ন আদালতের রায়ে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করার অভিযোগ করা হয়েছে। আপিলে বলা হয়েছে, ৩৪২ ধারায় খালেদা জিয়া নিম্ন আদালতে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা বিকৃতভাবে রায়ে উল্লেখ করে সাজা দেওয়া হয়েছে। এতেই প্রমাণিত হয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে সাজা দেওয়া হয়েছে।    

খালেদা জিয়ার আইনজীবী প্যানেলের সিনিয়র সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আশা করি বৃহস্পতিবারই খালেদা জিয়া জামিন পাবেন।’

দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলম খান বলেন, ‘আমরা প্রস্তুত। আদালতে আমরা এ আপিলে বিরোধিতা করব।’ 

প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের করা মামলায় ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালত গত ৮ ফেব্রুয়ারি রায় দেন। রায়ে খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ওই রায়ের জাবেদা নকল খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা হাতে পেয়েছেন গত সোমবার বিকেলে। এরপর রাতভর খসড়া তৈরি করেন ব্যারিস্টার নওশাদ জমির, অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম ও ব্যারিস্টার রাগিব রউফ চৌধুরীসহ কয়েকজন আইনজীবী। খসড়াটি সিনিয়র আইনজীবীদের হাতে তুলে দেওয়া হলে তাঁরা দফায় দফায় বৈঠক করে তা চূড়ান্ত করেন। এরপর গতকাল বিকেলে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় দাখিল করা হয়। আইনগত প্রক্রিয়া শেষে আপিলটি তালিকাভুক্ত (১৬৭৬/২০১৮) হওয়ার পর আইনজীবীরা ছুটে যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহীমের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে।

আপিলের খসড়া পাওয়ার পর খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা গতকাল তিন দফা বৈঠক করেন। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের তিনতলায় সম্মেলনকক্ষে ওই বৈঠকে ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, এ জে মোহাম্মদ আলী, আবদুর রেজাক খান, জয়নুল আবেদীন, মীর নাসিরউদ্দিন, ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, ব্যারিষ্টার বদরুদ্দোজা বাদল। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সিদ্ধান্তের পর ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, ব্যারিস্টার মীর হেলালউদ্দিনসহ কয়েকজন তরুণ আইনজীবী হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল আবেদন নিয়ে যান। আপিল দাখিলকারী আইনজীবী হলেন অ্যাডভোকেট আবদুর রেজাক খান।

তারেকের সবুজ সংকেতের পর আপিল : সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানান, সোমবার রায়ের অনুলিপি পাওয়ার পরপরই তা লন্ডনে তারেক রহমানের কাছে পাঠানো হয়। এরপর রাতে খসড়া প্রস্তুত করার পরও তা তারেক রহমানের কাছে পাঠানো হয়। মূল রায় ও আপিলের খসড়া দেখার পর তিনি আইনজীবীদের কিছু নির্দেশনা দেন। এসব নির্দেশনা পাওয়ার পর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। এরপর তা তারেক রহমানকে জানানো হলে তাঁর সংকেত পেয়ে আপিল দাখিল করা হয়। তারেক রহমানের সঙ্গে আপিলের তথ্য আদান-প্রদানের কথা স্বীকার করেন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ও অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম।

জামিন আবেদনের কপি রাষ্ট্রপক্ষকে দিতে নির্দেশ : গতকাল বিকেল ৩টা ৫৩ মিনিটে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহীমের নেতৃত্বাধীন আদালতে উপস্থিত হন। ওই সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন দুদকের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান। খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের উপস্থিতির কথা জানতে পেরে হাজির হন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এরপর আদালত খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জবাবে জয়নুল আবেদীন আদালতে উপস্থিত সিনিয়র আইনজীবীদের নাম উল্লেখ করে বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া একটি আপিল দাখিল করেছেন। সেটার জন্য আমরা এসেছি।’ ওই সময় তিনি একটি কাগজ আদালতের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘বৃহস্পতিবারের কার্যতালিকায় রাখার জন্য আবেদন করছি।’

আদালত মেনশন স্লিপ গ্রহণ করলে খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘আমরা আপিল ও জামিন আবেদনের কপি পাইনি।’ তখন আদালত বলেন, ‘আমাদের সামনে একটি মেনশন স্লিপ এসেছে। তারা বৃহস্পতিবার কী করবেন জানি না। তবে জামিনের কোনো আবেদন থাকলে তার কপি দুদককে সরবরাহ করতে হবে।’

ওই সময় খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘আমরা এখনো জামিনের আবেদন দাখিল করিনি। বৃহস্পতিবার করা হবে। সেদিন দুদককে কপি দেওয়া হবে।’

ওই পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল আপিলের গ্রহণযোগ্যতার ওপর রবিবার শুনানির দিন ধার্য করার আবেদন জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো কপি পাইনি। কপি পাওয়ার পর প্রস্তুতির জন্য সময় দরকার।’

ওই সময় আদালত খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের আপিলের কপি মঙ্গলবারের মধ্যে দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষকে সরবরাহ করতে বলেন। আদালত আরো বলেন, ‘এ আদালতে বুধ ও বৃহস্পতিবার দুদকের মামলার শুনানি হয়। সে হিসেবে বৃহস্পতিবার শিডিউলে পড়ে গেছে। এরপর আদালত থেকে বেরিয়ে যান আইনজীবীরা।

বক্তব্য বিকৃত করার অভিযোগ : আপিলে বলা হয়েছে, “নিম্ন আদালতে ৩৪২ ধারায় খালেদা জিয়ার জবানবন্দিতে দেওয়া বক্তব্য ভুলভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে। খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে নির্বিচারে গুলি করে প্রতিবাদী মানুষদের হত্যা করা হচ্ছে। ছাত্র ও শিক্ষকদের হত্যা করা হচ্ছে। এগুলো কি ক্ষমতার অপব্যবহার নয়? ক্ষমতার অপব্যবহার আমি করেছি? শেয়ারবাজার লুট করে লক্ষ-কোটি টাকা তছরুপ হয়ে গেল। নিঃস্ব হলো নিম্নআয়ের মানুষ। ব্যাংকগুলো লুটপাট করে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে।’ অথচ আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, ‘ক্ষমতার অপব্যবহার আমি করেছি।’ এখানে বাক্যের শেষে প্রশ্নবোধক চিহ্ন তুলে দিয়ে দাঁড়ি বসিয়ে দিয়েছেন আদালত। এরপর তা উল্লেখ করে সাজা দিয়েছেন। এটা করে আদালত খালেদা জিয়ার বক্তব্যকে বিকৃত করে উপস্থাপন করেছেন।”



মন্তব্য