kalerkantho


শ্রীলঙ্কার দিনে আশাবাদী বাংলাদেশও

সাইদুজ্জামান, চট্টগ্রাম থেকে   

২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শ্রীলঙ্কার দিনে আশাবাদী বাংলাদেশও

স্কোরবোর্ডেই উইকেটের প্রতিফলন। তাই ব্যাটিং নিয়েও দ্বিতীয় দিনেই অনুতাপে পুড়ছে না কোনো দল। তবে হাত বাড়ানো দূরত্বে গিয়ে মমিনুল হকের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি হাতছাড়া হওয়ার আক্ষেপ আছে। তেমনি ১১ উইকেটের বিনিময়ে ব্যাটসম্যানদের ৭০০ রান উঠতে দেখে দুই পক্ষের বোলারদের মনে হতাশার মেঘ জমা হওয়ারই কথা। অবশ্য গতকাল চা-বিরতির পর থেকে উইকেটের চরিত্র বদলের ইঙ্গিত নিশ্চিতভাবেই আশাবাদী করছে তাঁদের। তাতে চট্টগ্রাম টেস্টের মোড় বদলের সম্ভাবনা রয়েছে ভালোভাবেই।

ধনাঞ্জয়া ডি সিলভার সেঞ্চুরিতে ভারতের বিপক্ষে দিল্লি টেস্টে হার বাঁচিয়েছিল শ্রীলঙ্কা। কাল তাঁর ব্যাটেই টানা দ্বিতীয় ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ানোর আশার আলো দেখছেন রঙ্গনা হেরাথ। নইলে ৫১৩ রানের নিচে চাপা পড়া দলের জন্য আশাবাদী হওয়া কঠিনই। বরং ইনিংসের তৃতীয় ওভারে দিমুথ করুণারত্নের বিদায়কেই মনে হচ্ছিল সফরকারীদের ভবিতব্য। ব্যাটসম্যান যাবেন আর আসবেন, মাঝে বড়জোর এক-দুটি জুটি হতে পারে। কিন্তু হলো উল্টোটা, ওই একটি ছাড়া বাকিটা সময় বোলারদের সব চেষ্টাই বিফলে গেছে। ধনাঞ্জয়ার সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়েন কুশল মেন্ডিসও, ছয় ইনিংস বিরতির পর যিনি পঞ্চাশ পেরিয়েছেন কাল। চতুর্থ সেঞ্চুরি থেকে অবশ্য খুব দূরে নেই মেন্ডিস, ৮৩ রানের আত্মবিশ্বাস নিয়ে আজ নামছেন আবার। এই দুজনের দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে এরই মধ্যে ১৮৬ রান পেয়ে গেছে শ্রীলঙ্কা। তাতে দিন শেষে হেরাথ অঙ্ক কষে বলে দিতে পেরেছেন, ‘তিন শ রানের ব্যবধানটা আগে মিটিয়ে দেখব উইকেটের কী অবস্থা। এরপর পরের গন্তব্য ঠিক করব।’

অবশ্য মুস্তাফিজুর রহমানের বলে দ্বিতীয় স্লিপে মেন্ডিসের ক্যাচটি যদি না পড়ত মেহেদী হাসান মিরাজের হাত থেকে, তাহলে শেষ বিকেলের ছবিটা মনোরম হতে পারত বাংলাদেশের জন্য। সেঞ্চুরির অপেক্ষায় থাকা লঙ্কান ব্যাটসম্যান যে তখন মাত্র ৪ রানে। ৫৩ রানে মেহেদী মিরাজের বলে আরেকবার সুযোগ দিয়েছিলেন মেন্ডিস, তবে স্লিপে অত কঠিন ক্যাচ ধরার ‘অভ্যাস’ বাংলাদেশ দলের নেই। তাই ফায়ারিং স্কোয়াডে তুলে দেওয়া যাচ্ছে না ফিল্ডার ইমরুল কায়েসকে। উপরন্তু শেষ সেশনে দুটি ‘রিভিউ’ও নষ্ট হয়েছে বাংলাদেশের। তাতে প্রযুক্তির সাহায্য পেতে শ্রীলঙ্কার ইনিংস ৮০ ওভার ছোঁয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে মাহমুদ উল্লাহকে।

এই টেস্টের বাংলাদেশ অধিনায়ক অপেক্ষায় থেকেছেন উইকেটের জন্যও, আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে। স্কোরবোর্ডে রান বেশি থাকলে উইকেটের জন্য ঝাঁপানোর ঝুঁকি নেওয়াটাই রীতি। ধনাঞ্জয়া আর মেন্ডিসের লম্বা জুটি গড়া দেখেও আক্রমণে ঢিল দেননি মাহমুদ। তাতে রান বের হয়েছে বটে, তবে চট্টগ্রামের দ্বিতীয় দিনের উইকেটে আক্রমণাত্মক ফিল্ডিং সাজিয়ে উইকেটের জন্য ওত পেতে থাকা ছাড়া আর কী-ই বা করার ছিল। আর রান তোলার জন্য প্রশংসা প্রাপ্য সফরকারী দলের দুই অপরাজিত ব্যাটসম্যানের। প্রথম দিনের মতো অতটা সহজ ছিল না উইকেট। রানের জন্য তাই বিস্তর কষ্টও করতে হয়েছে তাঁদের। তামিম ইকবাল ঠিকই ধরেছিলেন যে, ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্যে ভরপুর শ্রীলঙ্কা।

দ্বিতীয় দিনে সর্বমহলের অপেক্ষা ছিল একজনকে ঘিরে, ১৭৫ রান নিয়ে নামা মমিনুল হকের সামনে যে ডাবল সেঞ্চুরির হাতছানি। কিন্তু সে আর হলো কই? রঙ্গনা হেরাথের নির্বিষ একটা বলেই স্বপ্নডানা ভেঙেছে মমিনুলের। লেগস্টাম্পের ওপর পিচ করা বল অন সাইডে খেলতে গিয়ে ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে মেন্ডিসের হাতে ধরা পড়েছেন তিনি। বাজে বলে অহেতুক শটের ওই ফ্রেমে ক্যাচটি কিন্তু প্রশংসনীয়। বুক উচ্চতায় জোরের সঙ্গে উড়ে আসা বলের ওপর অত কাছ থেকে নজর রাখা এবং ক্যাচ নেওয়া বেশ কঠিনই।

কুড়িয়ে মমিনুলকে পাওয়া শ্রীলঙ্কাও সম্ভবত ভাবেনি উইকেটে এসেই অমন তেড়েফুঁড়ে খেলার চেষ্টা করবেন মোসাদ্দেক হোসেন। তবে বুঝতে পেরেই তরুণ এই ব্যাটসম্যানকে টোপ দিয়েছেন হেরাথ। লঙ্কান বাঁহাতি স্পিনারের এই বলটা লেগস্টাম্পের বাইরে পিচ করছে দেখে মিড অফের ওপর দিয়ে পাঠানোর ইচ্ছা হয়েছিল মোসাদ্দেকের। কিন্তু সে ইচ্ছার সলিল সমাধি ঘটেছে মিড অফ ফিল্ডারের হাতে জমা পড়ে।

স্বভাবতই প্রথম দিনের চোট সামলে বেশ উজ্জীবিত দেখাচ্ছে তখন সফরকারীদের। তবে অধিনায়কত্বের প্রথম ইনিংসে মাহমুদের দৃঢ়তার সঙ্গে মেহেদী মিরাজের ইতিবাচক ব্যাটিংয়ে আবার চলতে শুরু বাংলাদেশের রানের গাড়ি। কিন্তু ‘আত্মঘাতী’ তৃতীয় রানের জন্য দৌড়ে আর যথাসময়ে ক্রিজে পৌঁছাতে পারেননি মেহেদী মিরাজ। আগের দিন বাংলাদেশের জন্য থিলান সামারাবীরার পাঁচ শ রান বরাদ্দ শুনে আড়ালে হেসেছিলেন অনেকে। সেই তারা ৪১৭ রানে মেহেদী মিরাজের বিদায়ের পর শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং কোচের চেয়েও ‘নৈরাশ্যবাদী’, সাড়ে চার শ হবে তো? হয়ে পাঁচ শও পেরিয়েছে বাংলাদেশ। সৌজন্যে এই টেস্টের দুই অভিষিক্ত—অধিনায়ক মাহমুদ ও সাঞ্জামুল ইসলামের কল্যাণে। বিশেষজ্ঞ স্পিনার পরিচয়ে খেলা সাঞ্জামুল মহামূল্য ২৪ রানের পাশাপাশি খেলেছেন ৫৬ বল। তাতে ক্যারিয়ারের পঞ্চদশ ফিফটি করা মাহমুদের দ্বিতীয় টেস্ট সেঞ্চুরির খুব কাছেও চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র ১৭ রানের জন্য সে আর হয়নি। এতে অবশ্য মাহমুদের দায় নেই, একটা সময় সঙ্গীহীন হয়ে পড়তে হয়েছে যে তাঁকে।

তবে মাহমুদের অপরাজিত ৮৩-তেও বীরত্বগাথা আছে। রঙ্গনা হেরাথের সঙ্গে ডুয়েলে একতরফা হারের অভিজ্ঞতা নিয়ে নেমেছেন চট্টগ্রাম টেস্টে। এই প্রথম জয়ী মাহমুদ। সেঞ্চুরির রঙেই শুধু রাঙানো হয়নি ব্যক্তিগত লড়াইয়ের এই বিজয়কে।

অবশ্য দ্বিতীয় দিনের শেষবেলায় জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের উইকেট রূপান্তরে চূড়ান্ত বিজয়ের পূর্বাভাসও কি নেই? আজ তৃতীয় দিনের শুরুতে বাংলাদেশ দলের বোলিংয়ের ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে তা।



মন্তব্য