kalerkantho


রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

প্রক্রিয়া ঠিক হচ্ছে আজ তবে এখনো অনেক বাধা

মেহেদী হাসান   

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



প্রক্রিয়া ঠিক হচ্ছে আজ তবে এখনো অনেক বাধা

ফাইল ছবি

প্রাণ বাঁচাতে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গার ফেরত যাওয়ার প্রক্রিয়া ঠিক করে ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ সই হতে পারে আজ। তাতে কিভাবে, কোন সীমান্ত দিয়ে কতজন রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে যাবে, তা উল্লেখ থাকবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

নেপিডোতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পররাষ্ট্রসচিবদের নেতৃত্বে প্রত্যাবাসনবিষয়ক যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম বৈঠকে এই ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ সই হওয়ার কথা রয়েছে।

নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা ছাড়া রোহিঙ্গারা আদৌ সেখানে ফিরতে চায় কি না—এ নিয়ে শঙ্কার মধ্যেই আজ এ বৈঠকে বসছে দুই দেশ।

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জোর দিয়ে বলছে, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার মতো অনুকূল পরিবেশ এখনো মিয়ানমারে সৃষ্টি হয়নি। কোনোভাবেই কাউকে জোর করে ফেরত পাঠানো যাবে না।

তবে বাংলাদেশি কর্মকর্তারা বলছেন, গত ২৩ নভেম্বর নেপিডোতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে যে প্রত্যাবাসন চুক্তি সই হয়েছে তাতেও স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের কথা বলা হয়েছে। দুই দেশের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ২২ জানুয়ারির মধ্যে প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা। এ দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ঢাকা কাজ করছে।

তবে একটি সূত্রে জানা গেছে, প্রত্যাবাসনের বিষয়টি এখনো খুবই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। বাংলাদেশ মিয়ানমারকে প্রথম দফায় এক লাখ রোহিঙ্গার তালিকা দেওয়ার কথা ভাবছে। সেই তালিকা ধরে মিয়ানমার পর্যায়ক্রমে তাদের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশের কাছে তথ্য চাইবে। ওই ফরম পূরণ করে পাঠানোর পর মিয়ানমার তা যাচাই সাপেক্ষে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাংলাদেশি কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, শেষ পর্যন্ত কতজন রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো যাবে তা এখনই বলা কঠিন। রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার আগ্রহ থাকতে হবে। আবার একইভাবে মিয়ানমারকেও স্বীকার করতে হবে যে তারা রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা ছিল। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের অনেকের পক্ষেই প্রমাণ করা কঠিন হবে যে তারা রাখাইনের বাসিন্দা ছিল। কারণ তাদের ওপর নিপীড়নের মাত্রা এত বেশি ছিল যে মিয়ানমার ছাড়ার সময় তারা প্রমাণ নিয়ে আসতে পারেনি। এ ছাড়া তাদের বাড়িঘরও নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ সরকারের মতো রোহিঙ্গাদের মধ্যেও মিয়ানমারের আন্তরিকতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো মিয়ানমার রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর বড় অংশকেই দেশ ছাড়া করেছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীই এখন স্বীকার করছে যে তারা গণহত্যায় জড়িত। এখনো সেখানে বিদেশি ত্রাণকর্মী, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মীদের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। মিয়ানমার সেখানকার পরিস্থিতি আড়াল করছে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বেরও নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। এগুলো রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অনেক বড় বাধা।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, বৈশ্বিক নিন্দা ও চাপ সত্ত্বেও মিয়ানমার সরকার গত কয়েক মাসে এমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি, যা থেকে রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে আশ্বস্ত হতে পারে। রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব, জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা নিয়েই ফিরতে চায়। মিয়ানমার এখনো তেমন কোনো অঙ্গীকার করেনি। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন, জাতিগত নিধনযজ্ঞ ও গণহত্যার প্রায় সব অভিযোগই মিয়ানমার নাকচ করেছে। আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী মোতায়েনের প্রস্তাবেও মিয়ানমারসহ পরাশক্তি কয়েকটি দেশ সায় দেয়নি। প্রত্যাবাসন উদ্যোগে জাতিসংঘ বা তৃতীয় কোনো পক্ষ এখনো সম্পৃক্ত না হওয়ায় এটি টেকসই না হওয়ারও ঝুঁকি রয়েছে।

ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ আগস্ট থেকে ছয় লাখ ৫৫ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

সরকারি সূত্রগুলো জানায়, ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবরের পর থেকে গত বছরের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ৮৩ হাজার রোহিঙ্গা। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের প্রত্যাবাসন চুক্তিতে ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর পর থেকে আসা রোহিঙ্গাদেরই প্রত্যাবাসনের জন্য বিবেচনা করা হবে। তাদের প্রত্যাবাসন শেষে ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবরের আগে আসা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের কথা বিবেচনা করবে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবরের আগে থেকে বাংলাদেশে তিন লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছিল। মিয়ানমার বরাবরই তাদের অস্বীকার করে আসছে। আগামী দিনে তাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার আদৌ আগ্রহী হবে কি না তা নিয়েও সন্দেহ আছে।



মন্তব্য