kalerkantho


আঁধার সরিয়ে আলো আসবেই

পার্থ সারথি দাস   

২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



আঁধার সরিয়ে আলো আসবেই

পিচ্ছিল পথ মাড়িয়েও বাংলাদেশের জন্য এ বছরে এসেছে অনেক নতুন আলো। অসীম সম্ভাবনায় ভর করে এই আলো ছড়িয়েছে হাসি, যুগিয়েছে সামনে চলার শক্তি। এই আলোর উৎস ধৈর্য নিয়ে লড়ে বাংলাদেশের একাধিক ক্ষেত্রে ‘জয়’।

যার নেতৃত্বে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে এনেছিল বাংলাদেশিরা সেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণের বিশ্ব স্বীকৃতি এসেছে গত ৩০ অক্টোবর। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা-ইউনেসকো বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সেই ভাষণকে বিশ্ব ‘প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কোনো ধরনের নোট ছাড়াই বঙ্গবন্ধু ঢাকার সেই সময়ের রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ১৮ মিনিটের ওই ভাষণ দিয়েছিলেন।

ইউনেসকো এ বছরই সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটির বিশ্ব স্বীকৃতি দিয়েছে। শীতলপাটির শ্রমনিষ্ঠ কারিগররাই এই শিল্পের নেপথ্য নায়ক।

তা ছাড়া মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও সহায়তা দিয়ে মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রশংসিত হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেওয়া হয়েছে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ উপাধি।

এই তো গত ২৪ ডিসেম্বর রাজধানীর কমলাপুর স্টেডিয়ামে কোটি কোটি বাঙালির চোখের আলোয় জ্বলে উঠল বাংলাদেশের মেয়েরা। শক্তিশালী ভারতকে হারিয়ে, নিজেরা গোল না খেয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় তারা। সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ মহিলা ফুটবল টুর্নামেন্টের এ অনন্য ঘটনা দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার অন্য এক প্রেরণা। কেননা জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারীকে উন্নয়নের বাইরে রেখে এগিয়ে যাওয়া যাবে না।

বেগম রোকেয়ার সেই অবরোধবাসিনীদের উত্তরসূরিরা অন্ধকারের উেস যেন আলোর উৎসরণ ঘটিয়েই চলেছে। তার আরেক দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর দুই নারী বৈমানিক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নাঈমা হক ও তাহমিনা-ই-লুতফি জাতিসংঘে শান্তিমিশনে যোগ দিয়েছেন। নারী-পুরুষ সমতার ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশ এক দশকে ১৯ ধাপ এগিয়েছে।

আর বাংলাদেশ ক্রিকেট দল এ বছর শততম টেস্ট জেতার স্বাদটা নিয়েছে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে। তা ছাড়া ইংল্যান্ডে আইসিসি ক্রিকেট চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে উঠেছিল বাংলাদেশ।

খেলার মাঠেই সাফল্যের আলো বন্দি থাকেনি। উন্নয়নের মহাসড়কে ছুটে চলা বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু দৃশ্যমান হয়েছে গত ৩০ সেপ্টেম্বর জাজিরা প্রান্তে। ৩৭ ও ৩৮ নম্বর পিলারের ওপর ক্রেন দিয়ে বসানো হয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় এ সেতুর প্রথম স্প্যান। বিদেশিরা ছুটে এসে সেতুর নির্মাণ দেখে বিস্মিত হচ্ছেন।

অর্থনীতিতেও আলো ছড়িয়েছে বাংলাদেশ। গত অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭.২৮ শতাংশ। একই অর্থবছরে বাংলাদেশকে একসময়ে শোষণকারী পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫.২৮ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার (রিজার্ভ) গত জুনে অতীত রেকর্ড ভেঙে তিন হাজার ৩০০ কোটি (৩৩ বিলিয়ন) ডলার ছাড়িয়েছে। জুলাই-নভেম্বরের মধ্যে ৫ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে দেশে। গত বছরের একই সময়ের চেয়ে তা ১০.৭৬ শতাংশ বেশি।

বিশ্বে সবচেয়ে মূল্যবান দেশের ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৪তম। এক বছরের ব্যবধানে জাতীয় ব্র্যান্ড ভ্যালু বেড়েছে ২২ শতাংশ। লন্ডনের দি ইকোনমিস্ট পত্রিকা বাংলাদেশকে ‘কান্ট্রি অব দি ইয়ার’ উপাধি দিয়েছে এ বছর।

স্বাস্থ্য খাতে আলো ছড়ানো ঘটনা মায়ের গর্ভে জোড়া লাগানো ১০ মাসের তোফা ও তাহুরাকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আলাদা করা। গত আগস্টের প্রথম সপ্তাহের ওই ঘটনায় গাইবান্ধার শুধু একটি পরিবারের মুখেই হাসি ফোটেনি—এ যেন বাংলাদেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানের মুখই উজ্বল হলো। তা ছাড়া বাংলাদেশের গবেষকরা বের করেছেন ক্যান্সার শনাক্তের সহজ উপায়ও।

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির কালো ও বেদনাভরা পরিস্থিতি উের তৈরি পোশাক খাতে আবার শক্তভাবে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ।

আর বিদ্যুতের আলো তো দৃশ্যমানই। গত মে মাসে বিদ্যুৎস উৎপাদনে সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়ে বাংলাদেশ; যার পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৪৭১ মেগাওয়াট।

এমনকি পার্বত্য জেলার পাহাড়ি ঘরগুলোয় অন্ধকার থাকবে না কিংবা জ্বলবে না হারিকেনের মিটমিটে আলো। পাহাড়ের ঘরগুলোও আলোয় আলোয় ভরিয়ে দেবে সৌরবিদ্যুৎস।

যে বাংলাদেশের শিশুর উপস্থিত বুদ্ধিতে দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পায় ট্রেন সেই দেশ আলো ছড়াবেই। রাজশাহীর তাড়ানিতে গত ১৮ ডিসেম্বর লাল মাফলার দেখিয়ে তেলবাহী ট্রেনকে দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করে ছয় বছরের সিহাবুর রহমান আর সাত বছরের টিটন আলী।

ময়মনসিংহের নান্দাইলে বাল্যবিয়ে রোধ করেছে ঘাসফড়িং নামের সংগঠনের সদস্যরা। এ রকম ছোট ছোট বহু সুসংবাদ নতুন নতুন আলো নিয়ে এসেছে, এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দেশকে।


মন্তব্য