kalerkantho


ঢাকা সিটির নির্বাচন

তফসিল ঘোষণার আগেই দলগুলোতে নানা হিসাব

কাজী হাফিজ   

২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



তফসিল ঘোষণার আগেই দলগুলোতে নানা হিসাব

ঢাকা উত্তর সিটির সব ও দক্ষিণ সিটির নতুন ১৮টি ওয়ার্ডের ভোটার ও সম্ভাব্য প্রার্থীরা এখন নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা ও সংশ্লিষ্ট দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। সবাই তাকিয়ে মেয়র পদে প্রার্থী মনোনয়নে দলের সিদ্ধান্তের দিকে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে এই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার ইসি সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, আগামী ৪ জানুয়ারি তফসিল চূড়ান্ত করার পর ৭ জানুয়ারিই তা ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে। আর ভোটগ্রহণ হতে পারে ফেব্রুয়ারির ২৪ থেকে ২৭ তারিখের মধ্যে।

তফসিল ঘোষণার পরই দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে পারে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ এ নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী অন্য রাজনৈতিক দলগুলো। তবে তার আগে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের জোর লবিং শুরু হয়ে গেছে। প্রার্থী হতে আগ্রহীদের ব্যানার-পোস্টারও চোখে পড়ছে নির্বাচনী এলাকাগুলোতে। বিশেষ করে দুই সিটির নতুন ৩৬টি ওয়ার্ডে নারীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টিসহ মোট ৪৮টি কাউন্সিলর পদে সরকারি দলের মনোনয়ন পেতে আগ্রহীরা এ বিষয়ে এগিয়ে আছেন।

রংপুর সিটি নির্বাচনের পর ঢাকা উত্তরের নির্বাচন রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ তৈরি করবে। ২০১৯ সংসদ নির্বাচনের বছর। আর এ বছরের শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ এ নির্বাচন নিয়ে বিশেষ করে বড় দুই দলে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) মেয়র পদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী সম্পর্কে এরই মধ্যে কিছুটা ধারণা পাওয়া গেছে। তবে দুই সিটির নতুন ওয়ার্ডগুলোর কাউন্সিলর পদে কারা প্রধান দলগুলোর মনোনয়ন পাচ্ছেন তা জানতে জানুয়ারির মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হতে পারে।

সম্ভাব্য মেয়র পদপ্রার্থী বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলাম কয়েক দিন আগে কালের কণ্ঠকে জানান, আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায় থেকে তাঁকে সবুজ সংকেত দিয়ে প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। তার আলোকে তিনি এরই মধ্যে গণসংযোগ শুরু করেছেন। রাজধানীর কিছু এলাকায় আতিকুল হকের পক্ষে ব্যানারও টানানো হয়েছে। তাতে ঢাকাবাসীর সর্বস্তরের জনগণের পক্ষে বলা হয়েছে, ‘আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মো. আতিকুল ইসলাম আতিক ভাইকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র দেখতে চাই।’ তাঁর পাশে বিশিষ্ট শিল্পপতি, সমাজসেবক ও তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা পরিচয়ে আদম তমিজি হকের ব্যানারও দেখা যাচ্ছে। সম্ভাব্য ওয়ার্ড কমিশনার পদপ্রার্থী হিসেবে উত্তরের ৪০ নম্বর ওয়ার্ডে ভাটারা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজি নজরুল ইসলামের পোস্টার এলাকাবাসীর নজর কাড়ছে।

এদিকে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীর পক্ষে এ ধরনের কোনো প্রচারণা চোখে না পড়লেও দলটির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং ২০১৫ সালে ডিএনসিসি নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী তাবিথ আউয়াল রয়েছেন আলোচনায়। কালের কণ্ঠকে তিনি জানিয়েছেন, ডিএনসিসি নির্বাচনের জন্য বিএনপির প্রার্থিতার বিষয়ে কোনো সবুজ সংকেত এখনো তিনি পাননি। তবে তিনি অপেক্ষায় আছেন। নির্বাচনের জন্য তাঁর প্রস্তুতিও রয়েছে।

এখনো মাঠে নামেননি উত্তরের কাউন্সিলররা : নির্বাচন কর্মকর্তাদের ধারণা, ঢাকা উত্তর সিটিতে মেয়র পদে উপনির্বাচনে বর্তমান ৩৬ জন ওয়ার্ড কাউন্সিলর বড় ধরনের ফ্যাক্টর হতে পারেন। তবে তাঁরা এখনো দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিলের নির্বাচনে ডিএনসিসি নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে ৩৬টি সাধারণ ওয়ার্ডের মধ্যে ২১টিতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত, ১৩টিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী, একটিতে বিএনপি সমর্থিত এবং একটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হন। নারীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি ওয়ার্ডের মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আটটিতে, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী একটিতে, জামায়াত সমর্থিত দুটিতে ও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী একটিতে জয়ী হন।

২ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর সাজ্জাদ হোসেন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মেয়র পদে উপনির্বাচন নিয়ে আমার ওয়ার্ডে এখনো সম্ভাব্য প্রার্থীদের তেমনভাবে জনসংযোগ শুরু হয়নি। আমরা নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা ও দলের মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষায় আছি। একই সঙ্গে নতুন ১৮টি ওয়ার্ডের নির্বাচন নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা হবে কি না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।’

৩ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর কাজী জহিরুল ইসলাম মানিক বলেন, ‘দলের সম্ভাব্য মেয়র পদপ্রার্থীদের মধ্যে কয়েকজনই যোগাযোগ করছেন। তাঁদের নাম এখনই বলতে চাচ্ছি না। দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর জানাব।’

১৬ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত কাউন্সিলর মতিউর রহমান বলেন, ‘আমার ওয়ার্ড (ইব্রাহিমপুর ও কাফরুল) হচ্ছে গরিব মানুষের ওয়ার্ড। সম্ভাব্য প্রার্থীদের গুলশান-বনানী নিয়ে যতটা আগ্রহ, আমাদের ওয়ার্ডের বিষয়ে ততটা নেই। সে কারণে হয়তো এখনো কেউ যোগাযোগ করেননি। দল থেকে কে মনোনয়ন পাবেন তা প্রধানমন্ত্রীই চূড়ান্ত করবেন এবং যাঁকে চূড়ান্ত করা হবে তাঁর পক্ষেই আমাদের কাজ করতে হবে। তবে রাজনীতি করার নানা তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে আমি মনে করি, সক্রিয় নেতাকেই ডিএনসিসির মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়া দরকার। দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে ব্যবসায়ী-শিল্পপতি প্রাধান্য পেলে আমাদের রাজনীতি ছেড়ে ব্যবসাতেই মনোযোগী হতে হবে।’ নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে ঢাকার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা রকিব উদ্দীন মণ্ডল গত বুধবার বলেন, ‘আমাদের হাতে সময় খুব কম। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার জন্য প্রয়োজনীয় কাজগুলো সম্পন্ন করা হচ্ছে। ভোটকেন্দ্রগুলোর তালিকা তৈরির কাজ চলছে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সহযোগিতায় ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরির প্রস্তুতি চলছে।’

প্রায় ৩৫ লাখ ভোটারের নির্বাচন : ইসি সচিবালয় সূত্র জানায়, এবার দুই সিটির নির্বাচন হতে যাচ্ছে প্রায় ৩৫ লাখ ভোটার নিয়ে। এর মধ্যে উত্তরের মেয়র পদে নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভোটার থাকছে সাড়ে ৩০ লাখের কাছাকাছি।

ইসির প্রাথমিক হিসাব অনুসারে দুই সিটির নতুন ৩৬টি ওয়ার্ডের ভোটারসংখ্যা ১০ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৪ জন। এর মধ্যে ডিএনসিসির ১৮টিতে পাঁচ লাখ ৭৮ হাজার ১৬২ এবং দক্ষিণ সিটির ১৮টিতে চার লাখ ৭৫ হাজার ৮৩২ জন। দুই সিটির নতুন ওয়ার্ডগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম ১১ হাজার ৯৯৮ জন ভোটার দক্ষিণের ৬৯ নম্বর ওয়ার্ডে। ওয়ার্ডটি তেজগাঁও সার্কেলের কামারগোপ খালপাড়া, কামারগোপ দক্ষিণ, ডেমরা, আহম্মদ বাওয়ানি টেক্সটাইল মিল, লতিফ বাওয়ানি জুট মিল, নড়াইবাগ, মিরপাড়া ও রাজাখালী এলাকা নিয়ে গঠিত। আর সবচেয়ে বেশি ৫৩ হাজার ১১৭ জন ভোটার রয়েছে উত্তরের ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডে। এ ওয়ার্ড তেজগাঁও সার্কেলের দক্ষিণখান মৌজার কাওলা, আশকোনা ও গাওয়াইর এলাকা নিয়ে।

ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুতে ডিএনসিসির মেয়র পদ শূন্য হয়েছে গত ৩০ নভেম্বর থেকে। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে গত ৪ ডিসেম্বর এ বিষয়ে গেজেট জারি করা হয়। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনের ১৫(ঙ) ধারা অনুসারে সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিন আগে মেয়র বা কাউন্সিলরের পদ শূন্য হলে শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন করতে হবে। সেই হিসাবে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় রয়েছে মেয়রের শূন্য পদে উপনির্বাচনের।

এ ছাড়া গত জুলাই মাসে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনে নতুন করে যুক্ত হওয়া ১৬টি ইউনিয়নের সমন্বয়ে ৩৬টি ওয়ার্ড গঠন করে সরকার। এ নিয়ে দুই সিটি করপোরেশনে মোট ওয়ার্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৯টি। উত্তরে পুরনো ৩৬টির সঙ্গে নতুন করে ১৮টি ওয়ার্ড যোগ হওয়ায় ওয়ার্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪টি। আর দক্ষিণ সিটির ওয়ার্ডের সংখ্যা ৫৭টি থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৫টি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এসব নতুন ওয়ার্ডে সাধারণ ও নারীদের জন্য সংরক্ষিত মিলিয়ে মোট ৪৮টি কাউন্সিলর পদে ভোট করতে নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ জানিয়েছে। কমিশন মেয়র পদে উপনির্বাচনের সঙ্গে এসব নির্বাচন করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের ধারণা, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনের ৫-এর ৩ উপধারা অনুসারে ওয়ার্ডগুলোর দ্রুত নির্বাচন বাধ্যতামূলক। আইনের এই ধারায় বলা আছে, মেয়রের পদসহ করপোরেশনের ৭৫ শতাংশ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে এবং নির্বাচিত কাউন্সিলরদের নাম সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হলে করপোরেশন এই আইনের অন্যান্য বিধান সাপেক্ষে যথাযথভাবে গঠিত হয়েছে বলে গণ্য হবে। কিন্তু সম্প্রতি দুই সিটি করপোরেশনের সঙ্গে ১৮টি করে নতুন ওয়ার্ড এবং একই সঙ্গে ছয়টি করে সংরক্ষিত ওয়ার্ড যুক্ত হওয়ায় বর্তমান করপোরেশনের বৈধতাও প্রশ্নের সম্মুখীন। বিশেষ করে ডিএনসিসির ৫৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে নির্বাচিত কাউন্সিলর রয়েছেন ৩৬টিতে, যা মোট ওয়ার্ডের ৭৫ শতাংশের কম।

এদিকে এই ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর সাধারণ ওয়ার্ড ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের মেয়াদ কত দিন হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ সংশ্লিষ্ট আইনে এ সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। তবে ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘সাধারণ ওয়ার্ডে যাঁরা নির্বাচিত হবেন তাঁদের মেয়াদ চলমান সিটি করপোরেশনের মেয়াদের সঙ্গেই শেষ হয়ে যাবে। উপনির্বাচনে মেয়রের যে মেয়াদ হবে সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত কাউন্সিলরের মেয়াদও একই হবে। এই নির্বাচন নিয়ে আইনগত জটিলতা থাকলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য কমিশনকে অনুরোধ করত না।’



মন্তব্য