kalerkantho


অনাগ্রহী আ. লীগ এমপি বিএনপিতে সব নয়া মুখ

সোহেল হাফিজ, বরগুনা   

২৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



অনাগ্রহী আ. লীগ এমপি বিএনপিতে সব নয়া মুখ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বরগুনা-০১ (বরগুনা-আমতলী ও তালতলী) আসনের রাজনীতি এখন সম্পূর্ণ নির্বাচনমুখী। রাজনীতির মাঠে বড় দলগুলোর নেতাদের মধ্যে মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে ঠাণ্ডা লড়াই শুরু হয়ে গেছে। এ কারণে সাধারণ নেতাকর্মীরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলীয় মনোনয়ন পেতে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে লবিং শুরু করেছেন। পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও ভোটারদের মধ্যে গণসংযোগও করছেন। সব মিলিয়ে ২৪ ইউনিয়ন, তিন উপজেলা ও দুই পৌরসভা এখন সরগরম।

আওয়ামী লীগ : ক্ষমতাসীন দলে আলোচনায় আছেন বর্তমান সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু (৭০), সাবেক সংসদ সদস্য মো. দেলোয়ার হোসেন, অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান মহারাজ ও গোলাম সরোয়ার টুকু। জেলা আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু টানা ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। প্রতিবার সংসদ নির্বাচনের আগে অপেক্ষাকৃত ত্যাগী ও নবীন নেতারা চেষ্টা করলেও মনোনয়ন তিনিই বাগিয়ে নিচ্ছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে চার-চারবার (১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ‘কারিশমাটিক’ এই নেতা। ১৯৯৬ সালে নির্বাচিত হয়ে প্রথমে খাদ্য উপমন্ত্রী ও পরে নৌপরিবহন উপমন্ত্রীও হয়েছিলেন। এবারের নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে খুব একটা আগ্রহী নন উল্লেখ করে ‘কারিশমাটিক’ এই নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমি মনোনয়ন পেয়ে আসছি। এ সময় অনেক যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে আমাকে না দিয়ে যদি দল থেকে অন্য কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হয় আমি মেনে নেব। আমি জেলা আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট। বরগুনায় আমি শেখ হাসিনার প্রতিনিধি। আমার দায়িত্ব তো নৌকাকে পাস করানো।’

জেলা আওয়ামী লীগের একসময়ের বিদ্রোহী নেতা মো. দেলোয়ার হোসেন। শম্ভুর বিপরীতে বিদ্রোহী নেতা হিসেবে ২০০১ সালে নির্বাচিত হন। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সমর্থন পেয়ে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন তিনি। দলীয় মনোনয়ন পেলে অনেকটা সহজেই পুনরায় তিনি এমপি হবেন বলে আশাবাদী দেলোয়ার সমর্থক নেতাকর্মীরা।

এ ছাড়া মনোনয়ন পেলে এবারের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক জেলা পরিষদ প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর কবীর, বরগুনা পৌরসভার সাবেক মেয়র, বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সংগঠক ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট মো. শাহজাহান এবং জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি গোলাম সরোয়ার ফোরকান।

মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় আরো আছেন জেলা যুবলীগের সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বরগুনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল আহসান মহারাজ। তিনি কালের কণ্ঠকে জানান, বর্তমান সময়ে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু এমপির যতটা সমন্বয় থাকার কথা ছিল বাস্তবে তা নেই। এ ছাড়া কাবিখা, টাবিখা, আর নগ্ন নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির দায় নিয়ে জেলা আওয়ামী লীগ এখন বিগত যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেকটাই অস্থির সময় পার করছে। তিনি আরো বলেন, ‘সারা দেশ এগিয়ে গেলেও বরগুনায় দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন নেই। এসব কারণে মানুষ নতুন নেতৃত্ব দেখতে চায়।’ সর্বশেষ পৌর নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েও ধনাঢ্য এক ব্যবসায়ীর কাছে হেরে যান মহারাজ। নির্বাচনের দিন সংঘর্ষে পড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন তিনিসহ একাধিক নেতাকর্মী। অনিয়ম ও দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থেকে বিগত নির্বাচনগুলোতে জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন সাবেক এই ছাত্রনেতা।

এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, বরগুনা সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম সরোয়ার টুকুর সমর্থকরাও তাদের নেতাকে প্রার্থী হিসেবে দেখতে চায়। গোলাম সরোয়ার টুকু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নেতাকর্মীরা এখন পরিবর্তন চায়। আমিও দলের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাচ্ছি।’

সম্প্রতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে দান-অনুদানসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ায় মনোনয়ন যুদ্ধের তালিকায় নাম উঠে এসেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহসম্পাদক, জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মশিউর রহমান সিহাবের। তিনি বর্তমানে গণসংযোগে নেমেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি মাঠে ছিলাম, আছি এবং থাকব। শুধু মনোনয়ন নয়, বরগুনার মানুষের ভোট ও ভাতের অধিকার নিশ্চিত করতে আমি আমৃত্যু লড়ে যাব।’



বিএনপি : এ আসনে বরগুনা সদর থেকে জেলা বিএনপির হেভিওয়েট কোনো প্রার্থী নেই। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-শ্রমবিষয়ক সম্পাদক ও জাতীয়তাবাদী বিমান শ্রমিক দলের সভাপতি তরুণ নেতা ফিরোজ উজ জামান মামুনকে নিয়ে আশাবাদী জেলা বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের একটি বড় অংশ। এ ছাড়া মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মতিয়ার রহমান তালুকদার, বর্তমান সভাপতি মাহবুবুল আলম ফারুক মোল্লা, সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা কৃষক দলের সভাপতি লে. কর্নেল (অব.) আবদুল খালেক এবং জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম মোল্লার নাম আলোচনায় রয়েছে। মনোনয়ন পেলে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন আমতলী উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও জেলা বিএনপি নেতা জালাল উদ্দিন ফকীর, আমতলী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট গাজী মো. তৌহিদ এবং তালতলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদ তালুকদারও। 

ফিরোজ উজ জামান মামুন মনোনয়ন লাভের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে কালের কণ্ঠকে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে বরগুনায় আওয়ামী লীগের একক নেতৃত্ব থাকায় নজিরবিহীন দুর্নীতি আর জোরজুলুমের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। বরগুনাবাসী এখন পরিবর্তন চায়।

বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাওয়া প্রসঙ্গে বরগুনার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা কৃষক দলের সভাপতি লে. কর্নেল (অব.) আব্দুল খালেক বলেন, ‘দেশের টানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছি। সে সময়ও দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য, বিশেষ করে বরগুনাবাসীর কল্যাণে আমি নিবেদিত ছিলাম। এরপর চাকরি থেকে অবসর নিয়ে বিপুল ভোটের ব্যবধানে আমি বরগুনা সদর উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হই। এসব বিবেচনায় দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় এবং বিজয়ী হই উন্নয়নে সম্ভব সব প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখব।’

জেলা বিএনপির সভাপতি মাহবুবুল আলম ফারুক মোল্লা কালের কণ্ঠকে বলেন, যারা কখনো কোনো দিন রাজনীতির মাঠে ছিলেন না, জেল-জুলুমের শিকার হননি এ রকম অনেক নেতাকর্মী এখন বিএনপিতে খবরদারি করছেন। দল থেকে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হলে তিনি জয়লাভ করবেন বলে শতভাগ আশা ব্যক্ত করেন।

এ ছাড়া বরগুনা-১ আসনে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক শাহজাহান মনসুর আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বরগুনায় তাঁর নির্বাচনী গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।


মন্তব্য