kalerkantho


এক হাজার অপারেশন থিয়েটার পরিত্যক্ত!

তৌফিক মারুফ   

২৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



এক হাজার অপারেশন থিয়েটার পরিত্যক্ত!

‘বাড়ির কাছে হাসপাতাল আছে, তাতে অপারেশন থিয়েটারও আছে। কিন্তু আমার আত্মীয়র অপারেশন যখন প্রয়োজন হলো দৌড়াতে হলে জেলা শহরে। কারণ বাড়ির কাছের হাসপাতালটিতে অপারেশন করার মতো কেউ ছিল না। জেলা শহরে গিয়ে অপারেশন করাতে বেশি খরচ পড়েছে, সময় ও ভোগান্তিও বেশি হয়েছে।’ কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার কমলাপুর গ্রামের ইয়াকুব আলী আক্ষেপ নিয়ে বলছিলেন কালের কণ্ঠকে। থেকেও না থাকার এই চিত্র সারা দেশেরই।

সারা দেশে ৩৫০টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘিরে রয়েছে এক হাজারের বেশি অপারেশন থিয়েটার। অবিশ্বাস্যভাবে এগুলোর প্রায় সবই তৈরির পর থেকেই রয়েছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। অপারেশন থিয়েটারগুলোর বেশির ভাগই হচ্ছে তিন থেকে সাত বছর বয়সের, আছে ১০-১২ বছরের পুরনোও। অথচ বর্তমানে বিকল এসব অবকাঠামোর একেকটি বসাতে প্রায় দেড় কোটি টাকা করে ব্যয় হয়েছে, পরে সংযুক্ত হয়েছে আরো লাখ লাখ টাকা মূল্যের নানা যন্ত্রপাতি। পড়ে থেকে সবই এখন নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে! খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, পর্যাপ্ত অজ্ঞানবিদ ও শৈল্য চিকিৎসক না থাকার ফলেই কোটি কোটি টাকার আয়োজন জলে যেতে বসেছে। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি তো আছেই! বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত না করেই অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগটিকে অপরিকল্পনার চরম উদাহরণ বলে আখ্যা দিচ্ছেন।

সারা দেশের ভয়াবহ চিত্রটিই যেন প্রতিফলিত হয় নেত্রকোনার সিভিল সার্জনের কথায়। ‘আমার জেলায় ১০ উপজেলার মধ্যে সাতটিতে ৫০ বেডের হাসপাতাল আছে। এগুলোর প্রতিটিতেই অপারেশন থিয়েটার কমপ্লেক্স (২১টি সিঙ্গেল ওটি) আছে অন্য এলাকার মতো। কোনোটিই চালু করা যায়নি জনবলের অভাবে। কারণ অপারেশনের জন্য কমপক্ষে একজোড়া ডাক্তার একসঙ্গে অপরিহার্য—একজন সার্জন আরেকজন অজ্ঞানের ডাক্তার,’ ডা. তাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলছিলেন। সরেজমিন খোকসা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরে দেখা যায়, আধুনিক নকশার স্থাপনা। ভেতরে তিনটি অপারেশন থিয়েটার, দুটি করে ডক্টরস রুম, লেবার রুম, চেঞ্চ রুম,একটি করে পোস্ট অপারেটিভ, অটোক্লেভ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওয়েটিং রুম। আরো একাধিক রুমে সাজানো পুরোটা। সঙ্গে আধুনিক সব নির্মাণসামগ্রীর উপকরণ সংযুক্ত প্রতিটি রুমে। দরজা-জানালাও উন্নত কাঠ, গ্রিল আর গ্লাসে তৈরি। ভেতরে প্রয়োজনীয় সব বৈদ্যুতিক ফিটিংসেও ছাপ আধুনিকতার। সব মিলিয়ে প্রায় সাত হাজার বর্গফুটের এক আধুনিক, সুপরিসর অপারেশন থিয়েটার কমপ্লেক্স। কিন্তু চলে না অজ্ঞানবিদ ও শৈল্য চিকিৎসকের অভাবে এবং ইয়াকুব আলীর মতো ব্যক্তিদের দৌড়াতে হয় রোগী নিয়ে অন্যত্র। খাকসা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. কামরুজ্জামান সোহেল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটি স্থাপনের পর থেকে এখন পর্যন্ত চালুই করা যায়নি। সার্জন আছে তো অ্যানেসথেসিয়ালজিস্ট নেই, অ্যানেসথেসিয়ালজিস্ট আছে তো সার্জন নেই।’

জাতীয় স্বাস্থ্য আন্দোলনের সভাপতি ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-বিএমএর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ ই মাহবুব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে বরাবরই এমন অনেক অপরিকল্পিত উন্নয়নকাজ করা হয়ে থাকে—যেখানে মানুষের সেবার চেয়ে ঠিকাদার আর সরকারের নির্দিষ্ট প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অসাধুচক্রের তাত্ক্ষণিক বাণিজ্যিক লাভের বিষয়টিই মুখ্য থাকে। ওই উন্নয়ন কতটা যৌক্তিক কিংবা কী সুবিধা-অসুবিধা আছে সেদিকগুলো বিবেচনায় আনা হয় না।’

স্বাস্থ্যসচিব (স্বাস্থ্যসেবা) সিরাজুল হক খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এসব সমস্যার সবটাই আমাদের নজরে আছে। নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সমাধান করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তবে ইতিমধ্যেই নতুন দশ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছে, তা কার্যকর হলে পর্যায়ক্রমে জনবল সংকট কমে যাবে। এ ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের অ্যানেসথেসিয়ালজিস্ট ও সার্জনের জুটিবদ্ধ রাখার ব্যবস্থা করা হবে। তখন অচল অপারেশন থিয়েটারগুলোও পর্যায়ক্রমে সচল হয়ে উঠবে।’ এ বিষয়ে ডা. রশিদ ই মাহবুবের বক্তব্য হচ্ছে, ‘নিয়োগ দিলেই হবে না, প্রয়োজনে সুবিধা বাড়িয়ে মাঠপর্যায়ের ওইসব কর্মস্থল ছেড়ে যাওয়াও বন্ধ করতে হবে; নয়তো একই পরিনতি হবে।’

ডা. আব্দুল কুদ্দুস মাত্র কয়েক দিন আগে নেত্রকোনার মদন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তার পদ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় দপ্তরে এসে যোগদান করেছেন। তিনি বলেন, মদন উপজেলা হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার জনবলের অভাবে সক্রিয় করা যায়নি। ডা. কুদ্দুসের কথার সূত্র ধরে সরকারের স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে যোগাযোগ করে জানা গেছে, মদন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ছিল ৩১ শয্যার। ২০০৪ সালে এটি ৫০ শয্যার করা হয়। সম্প্রসারিত নতুন ভবন হস্তান্তর করা হয় ২০০৭ সালে। দোতলায় রয়েছে অপারেশন থিয়েটার কমপ্লেক্স।

২০০৫ সালে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া ও হাটহাজারী উপজেলা হাসপাতাল কমপ্লেক্স দুটি ৩১ থেকে ৫০ বেডে উন্নীত করার কাজ শেষ হয়। ডা. শেখ ফজলে রাব্বী আগে ছিলেন রাঙ্গুনিয়ার উপজেলা ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, এখন আছেন হাটহাজারীতে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, নির্মাণের পর থেকে রাঙ্গুনিয়ার একটি অপারেশন থিয়েটার চালুই করা যায়নি জনবলের অভাবে। হাটহাজারীতে মাঝে কিছুদিন চালু থাকলেও এখন আবার অচল; কোনো সার্জন বা অ্যানেসথেসিয়ালজিস্ট নেই। বাইরে থেকে ডাক্তার ধার করে এনে মাসে এক-দুটি সিজার করা হয়, অন্য কোনো অপারেশন করা যাচ্ছে না।

গাইবান্ধার সিভিল সার্জন ডা. এম এ সাকুর কালের কণ্ঠকে বলেন, জেলার সাতটি উপজেলার মধ্যে পাঁচটি হাসপাতালকে ৩১ থেকে ৫০ বেডে উন্নীত করা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি অপারেশন থিয়েটার কমপ্লেক্স (মোট ৯টি ওটি) চালুই করা যায়নি। বাকি দুটির ভেতরে শুধু মাঝেমধ্যে সিজারিয়ান ওটি ব্যবহার হয়। চারটি পড়েই থাকে। তিনিও মূল সমস্যা হিসেবে সার্জন ও অ্যানেসথেশিয়া ডাক্তার না থাকাকে চিহ্নিত করেন।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম এ মোহী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কেবল অবকাঠামো নির্মাণ করে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের। নির্মাণ শেষে স্বাস্থ্য বিভাগকে বুঝিয়ে দিই। ব্যবহার হচ্ছে কী হচ্ছে না তা দেখার এখতিয়ার আমাদের নেই। তাই পরিত্যক্ত থাকতে দেখে বা জেনেও আমাদের কিছু করার নেই।’ তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর পাই এত সুন্দর ও ব্যয়বহুল অপারেশন থিয়েটারগুলো নির্মাণের পর জনগণের কোনো কাজেই আসেনি। আর যেকোনো অবকাঠামে সঠিকভাবে ব্যবহার না হলে সেটির রক্ষণাবেক্ষণও সঠিকভাবে হয় না। ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারের ভালো উদ্যোগ আর অর্থ দুটোই বিফলে যায়।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল কাইউম খান জানান, ২০০৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩১ বেড থেকে ৫০ বেডে উন্নীত করা মোট ৩৪২টি হাসপাতাল কমপ্লেক্স নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আরো চারটি হস্তান্তরের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৬০-৬২টি হাসপাতাল এখনো চালু হয়নি এবং বাকিগুলো চালু বলে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যে হাসপাতালগুলো চালু হয়েছে সেগুলোর মধ্যে কতটির অপারেশন থিয়েটার চালু হয়েছে আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি না।’ তিনি জানান, ৫০ বেডের প্রতি হাসপাতালের অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে একই নকশায়। অপারেশন থিয়েটারগুলোও একই রকম। সব মিলিয়ে প্রায় সাত হাজার স্কয়ার ফুটের সুবিশাল আয়োতন। একেকটির খরচ দেড় কোটি টাকার ওপরে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, মূলত বিএনপি সরকারের সময় জনবলের বিষয়টি ঠিক না করেই অজ্ঞাত কারণে দেশজুড়ে হঠাৎ করেই বিশাল অঙ্কের টাকা খরচ করে উপজেলা হাসপাতালগুলো একযোগে ৩১ থেকে ৫০ বেডে উন্নীত করা শুরু হয়। কোথায় দরকার আছে কোথায় নেই—তাও বিবেচনা করা হয়নি। যা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়। অবশ্য বর্তমান সরকার এখন অবকাঠামো নির্মাণ ও কেনাকাটায় অনেক কিছু যাচাই-বাছাই করে পরিকল্পনা তৈরি করে। কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘এখন ১০০ বেডের নিচের হাসপাতালগুলোর দায়িত্ব আমার কাছে না থাকলেও এর আগে আমি দেশের বিভিন্ন এলাকায় যতগুলো উপজেলা হাসপাতাল ভিজিট করেছি সব জায়গাতেই দেখেছি—কোনো ওটিই চালু হয়নি; পরিত্যক্ত পড়ে আছে।’

সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুসারে গত সাড়ে আট বছরেই আগের তুলনায় অনেক বেশিসংখ্যক হাসপাতাল সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এখনো অনেকগুলোরই কাজ চলছে। আর পুরনোগুলোর পাশাপাশি চলতি ও আগের মেয়াদের আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নির্মিত ৫০ বেডের হাসপাতালগুলোর অপারেশন থিয়েটারের পরিণতি একই রকম অচল।

দুর্বল পরিকল্পনার পাশাপাশি স্থানীয় দায়িত্বশীলদেরও গাফিলতি ও উদাসীনতা রয়েছে—এমনটাই মনে করেন ১০০ বেডের নিচের হাসপাতালগুলোর দেখভাল করার দায়িত্বে থাকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (কমিউনিটি বেইজ হেলথ কেয়ার-সিবিএইচসি) ডা. আবুল হাসেম। তিনি বলেন, ‘উদ্যোমী ও আগ্রহী স্থানীয় কর্মকর্তারা চাইলে এ সমস্যার অনেকাটা সমাধান করে ফেলতে পারেন। এ জন্য আমি ইতিমধ্যেই ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে যেকোনো মূল্যে সব অপারেশন থিয়েটার চালু করার নির্দেশ দিয়েছি।’ ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘অজ্ঞানবিদ বাড়ানোর জন্য সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে, নতুন কোর্স চালু করা হয়েছে, নতুন করে ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, ফলে পর্যায়ক্রমে সব ঠিক হয়ে যাবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, মাঠপর্যায়ের মানুষ যদি নিজ নিজ এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে থাকা সেবার সুবিধাগুলো ঠিকমতো ভোগ করতে পারে তবে এ চিকিৎসার পেছনে তাদের খরচ অনেকাংশেই কমে যাবে।

স্বাস্থ্যসচিব বলেন, ‘কেবল অবাকাঠামো তৈরি করলেই হবে না, এর সঙ্গে আনুষঙ্গিক জনবল ও অন্য ব্যবস্থাপনার দিকেও নজর রাখতে হবে। তা না হলে সামগ্রিক উদ্যোগটির সফলতা আশা করা যায় না। বরং নানা রকমের ঘাটতি তৈরি হয়। আমরা এখন পরিকল্পনার সময়ই এসব দিকে খেয়াল রাখছি।’



মন্তব্য