kalerkantho


চার মাস পর আমিনুরের সন্ধান, ৩ বছর আগের মামলায় গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



চার মাস পর আমিনুরের সন্ধান, ৩ বছর আগের মামলায় গ্রেপ্তার

এবার নিখোঁজ থাকার ১১৭ দিন (প্রায় চার মাস) পর সন্ধান পাওয়া গেল ২০ দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমানের। তবে তিন বছরের পুরনো একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল শনিবার আদালতের মাধ্যমে তাঁকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)।

এ নিয়ে গত চার দিনে সন্ধান পাওয়া গেল এ রকম নিখোঁজ থাকা তিনজনের। গত মঙ্গলবার ফেরত পাওয়া গেছে সাংবাদিক উৎপল দাসকে এবং গত বৃহস্পতিবার পাওয়া গেছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মোবাশ্বার হাসান সিজারকে।

কালের কণ্ঠ’র কাছে থাকা তথ্যমতে, গত চার মাসে রাজধানী থেকে নিখোঁজ হয়েছেন ১৬ জন। তাঁদের মধ্যে সর্বশেষ আমিনুরসহ ১১ জনের সন্ধান পাওয়া গেছে। ছয়জন বাসায় ফিরেছেন এবং পাঁচজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এখনো নিখোঁজ আছেন পাঁচজন।

আমিনুরের সন্ধান পাওয়ার ব্যাপারে ডিবি পুলিশের দাবি, মোবাইল ফোন বন্ধ করে আমিনুর আত্মগোপনে ছিলেন। মোবাইল ট্র্যাকিং করে গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর শাহজাদপুর এলাকা থেকে আটকের পর তাঁকে নাশকতার একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

তবে আমিনুরের সহকর্মী ও পরিবার দাবি করছে, তাঁকে দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়েছিল।

ডিবি পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের মিছিলে হামলার ঘটনায় ২০১৫ সালে গুলশান থানায় করা একটি নাশকতার মামলায় আমিনুরকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

আমিনুরকে গ্রেপ্তারের ব্যাপারে ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি-উত্তর) শাহজাহান সাজু বলেন, ‘তাঁকে গতরাতে (শুক্রবার) শাহজাদপুর সুবাস্তু টাওয়ারের সামনের রাস্তা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২০১৫ সালে গুলশান থানায় করা এক নাশকতার মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকা ব্যক্তিকে কিভাবে পেলেন—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা তাঁর মোবাইল ট্র্যাকিং করে অবস্থান নিশ্চিত হই।’

এত দিন তিনি কোথায় ছিলেন—এ প্রশ্নে এডিসি শাহজাহান সাজু বলেন, ‘আমরা বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারিনি। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বিস্তারিত জানা যাবে।’

পুলিশ জানায়, আমিনুরকে গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে নৌপরিবহনমন্ত্রীর মিছিলে হামলার ঘটনার মামলায় ১০ দিনের রিমান্ড চান তদন্ত কর্মকর্তা। পরে ঢাকা মহানগর হাকিম দেবব্রত বিশ্বাসের আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালনের জন্য গুলশানে সমবেত হয়। সেখানে সমাবেশ শেষে ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষ নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয় ঘেরাও করার জন্য রওনা হলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এ অভিযোগে দায়ের করা মামলায় বলা হয়, আসামিরা হত্যার উদ্দেশে তাদের ওপর বোমা নিক্ষেপ করে।

গত ২৭ আগস্ট রাত ১০টার দিকে নয়াপল্টন থেকে সাভারের আমিনবাজারে পল্লীবিদ্যুৎ অফিসের পাশে বাসার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন আমিনুর। এরপর আর তাঁর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। এ ঘটনায় তাঁর স্বজনরা পল্টন থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে।

এদিকে দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর আমিনুরকে গ্রেপ্তার দেখানোর খবরে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম। তিনি গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান সরকারের ৯ বছরের অভ্যাস পর্যালোচনা করে বলতে পারি—এটি একটি রাজনৈতিক নাটক। উদ্দেশ্য বিরোধী শিবিরকে চাপে রাখা। অপহৃত হওয়ার ১১৭ দিন পর প্রায় তিন বছরের পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হাস্যকর। কারণ এর আগে তিন বছর তিনি প্রকাশ্যে বৈধভাবে আমাদের দলের মহাসচিব হিসেবে হাজারো কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছেন।’ 

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম আরো বলেন, ‘গতরাতে তাঁর মোবাইল ফোন থেকে কয়েকজনের ফোনে কল আসে। তবে রিসিভ করলে কথা বলেনি। ট্র্যাকিং করে দেখা গেছে রূপগঞ্জের দিকে। এ পুরো বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়। যেহেতু সরকার আইনিপ্রক্রিয়ার মধ্যে গেছে আমরাও আইনগতভাবে এর জবাব দেব।’

এর আগে ৪৪ দিন নিখোঁজ থাকার পর গত বৃহস্পতিবার রাতে দক্ষিণ বনশ্রীর বাসায় ফেরেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সমাজতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোবাশ্বার হাসান সিজার। তাঁর আগে গত মঙ্গলবার রাতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের ভুলতা এলাকায় পাওয়া যায় অনলাইন নিউজপোর্টাল পূর্বপশ্চিমবিডিডটনিউজের সিনিয়র রিপোর্টার উৎপল দাসকে। তাঁরা দুজনই টাকার জন্য অপহরণ করে আটকে রাখার কথা বলেন। তাঁকে সেই অপহরণকারীরা কেন ছেড়ে দিয়েছে এবং কারা সেই অপহরণকারী—এমন অনেক প্রশ্নের জবাব মেলেনি। একইভাবে বাসায় ফেরা অন্য চারজনও কিছু জানাতে পারেননি।

এখন পর্যন্ত আরো যাঁদের সন্ধান পাওয়া গেছে, তাঁরা হলেন দক্ষিণ বনশ্রীর প্রকৌশলী দুই ভাই আসাদুজ্জামান ও ফয়সাল রহমান;  বাংলাদেশ জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি মিঠুন চৌধুরী ও কেন্দ্রীয় নেতা আশিক ঘোষ; বেলারুশের অনারারি কনস্যুলার ও ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ কুমার রায়; করিম ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধার তানভীর ইয়াসমিন করিম; উত্তর শাজাহানপুর থেকে নিখোঁজ ফল ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন এবং আইএফআইসি ব্যাংকের কর্মকর্তা শামীম আহমেদ।

এখনো নিখোঁজ আছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান, কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইশরাক আহমেদ, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও এবিএন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সাদাত আহমেদ, ধানমণ্ডির লন্ড্রি ব্যবসায়ী সিরাজুল হক মিন্টু এবং কাকরাইল থেকে নিখোঁজ আবদুল্লাহ আল মামুন।


মন্তব্য