kalerkantho


বড় দুই দলেই একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

২০ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বড় দুই দলেই একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী

ভৈরব-রূপসা-আঠারোবেঁকি-আতাই নদীর পাড় ঘেঁষা রূপসা, তেরখাদা ও দীঘলিয়া উপজেলা নিয়ে খুলনা-৪ সংসদীয় আসন। এটি জাতীয় সংসদের ১০২ নম্বর নির্বাচনী এলাকা। মুসলিম লীগ নেতা ও যুদ্ধাপরাধী খান এ সবুরের প্রভাবাধীন এই এলাকায় ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এস এম মোস্তফা রশিদী সুজা প্রথমবারের মতো জয়লাভ করেন। সেই থেকে ওই এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রভাব বেড়েছে। পরবর্তী সংসদ নির্বাচনগুলোয় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাই জয়লাভ করেছেন। তবে ভোটের ব্যবধান হয় কম, যে কারণে বিএনপিও এই আসনটিকে নিজেদের মনে করে।

তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনটিতে নব্বইয়ের পর অনুষ্ঠিত ছয়টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চারটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এবং বাকি দুটিতে বিএনপি প্রার্থী জয়লাভ করেন। অবশ্য এর মধ্যে একটি আছে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন, যাতে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়নি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোল্লা জালালউদ্দিন ভোট পেয়েছিলেন এক লাখ ৯ হাজার ২১৬টি। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী শরীফ শাহ কামাল তাজ পেয়েছিলেন ৯৭ হাজার ৫৪৩টি ভোট। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপির বয়কটের মধ্যে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের এস এম মোস্তফা রশিদী সুজা।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দল এ আসনটিকে নিজেদের মনে করায় এখানে সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা বেশি। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে কমপক্ষে চারজন সম্ভাব্য প্রার্থীর বিষয়টি আলোচনায় আছে। অন্যদিকে বিএনপির মনোনয়ন চান—এমন তিন নেতাকে নিয়ে আলোচনা চলছে।

দলীয় সূত্রগুলোর মতে, আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য এস এম মোস্তফা রশিদী সুজা, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, এ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মোল্লা জালালউদ্দিন ও আওয়ামী লীগ খুলনা জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান জামাল।

অন্যদিকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতা শরীফ শাহ কামাল তাজ, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আজিজুল বারী হেলাল ও বিএনপির খুলনা জেলা শাখার সভাপতি শফিকুল আলম মনা।

আওয়ামী লীগ : সংসদ সদস্য মোস্তফা রশিদী সুজা ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০১৪ সালে নির্বাচিত হন। আগামী নির্বাচনেও তিনি দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী। তিনি বর্তমানে অসুস্থ, চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ কারণে দলের অনেকেই ওই আসনে প্রার্থী হতে চাইছেন। মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান। এ ছাড়া ২০০৮ সালে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মোল্লা জালালউদ্দিন এবং দলের খুলনা জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান জামাল।

মোস্তফা রশিদী সুজা দলের খুলনা জেলা শাখার দীর্ঘদিনের সাধারণ সম্পাদক। বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক সুজা পঁচাত্তর-পরবর্তী আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত ও সক্রিয় হন। বলা হয়, আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের কাণ্ডারি তিনি।

এরশাদের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে বিজয়ের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রভাবিত এই আসনে প্রথমবার আওয়ামী লীগের হয়ে জয়লাভ করেন সুজা। ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদে হুইপ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে বিএনপি প্রার্থী এম নুরুল ইসলাম দাদু ভাইয়ের কাছে পরাজিত হন। ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তিনি পলাতক থাকায় ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পান মোল্লা জালাল। তিনি অতি সহজেই জয়লাভ করেন।

খুলনায় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে মোল্লা জালাল সুজাবিরোধী পক্ষের হওয়ায় দলের তৃণমূলেও বিভাজন তৈরি হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আবারও দলীয় মনোনয়ন পান মোস্তফা রশিদী সুজা। তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

সুজার অসুস্থতার অজুহাত তুলে দলের একটি পক্ষ তাঁর মনোনয়নের বিরোধী। অনেকে আবার তরুণ নেতৃত্বের কথা বলছে। সে ক্ষেত্রে সুজাপুত্র খুলনা জেলা পরিষদ সদস্য এস এম মোস্তফা রশিদী সুকর্ণ দলীয় মনোনয়ন পেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

আওয়ামী লীগ খুলনা জেলা শাখার সভাপতি ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শেখ হারুনার রশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক এস এম মোস্তফা রশিদী সুজা খুলনা-৪ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী। তিনি অসুস্থ, চিকিৎসাধীন আছেন। তিনি নির্বাচন করার মতো শারীরিক অবস্থায় থাকবেন কি না তা নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। অনেকেই সেখানে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করছেন। যদি আমাদের নেত্রী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে সেখানে মনোনয়ন দেন, তাহলে আমিও নির্বাচন করতে রাজি। নেত্রী যাকে ভালো বুঝবেন, তাঁকেই মনোনয়ন দেবেন, আমরা সকলেই দলীয় মনোনয়ন লাভকারীর পক্ষেই নির্বাচন করব।’

অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানকে যোগ্য প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরছে। তাঁর বাড়ি দীঘলিয়ায়। তিনিও মনোনয়নপ্রত্যাশী বলে গুঞ্জন রয়েছে। সুজাবিরোধী পক্ষের উল্লেখযোগ্য অংশ নিজেরা কেউ প্রার্থী না হলে মসিউর রহমানকে মনোনয়ন দেওয়ার পক্ষে কথা বলছেন। আবার তরুণ নেতাদের মধ্যে কেউ কেউ দলের জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান জামালের পক্ষেও কাজ করছেন।

আওয়ামী লীগ নেতা ও চেয়ারম্যান হালিম গাজী দুর্বৃৃত্তদের হাতে নিহত হওয়ার পর এ সংসদীয় আসনে দলীয় বিরোধ প্রকট আকার ধারণ করে। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হিসেবে দলীয় নেতাকর্মীদের নাম আসে। পুলিশের অভিযোগপত্রেও অনেক নেতাকর্মীর নাম আসে। এ হত্যাকাণ্ডে আসামি হয়ে সুজার পক্ষের অনেকেই হাজতবাসও করেছে। ফলে এসব বিষয় নির্বাচনী মাঠে যথেষ্ট উত্তাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বিএনপি : এ আসনটিতে বিএনপির শক্তিশালী, সম্পদশালী ও প্রভাবশালী একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন। বিএনপি খুলনা জেলা শাখার সভাপতি শফিকুল আলম মনা খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে দলীয় মনোনয়ন না পেলে এ আসনে মনোনয়ন চাইতে পারেন। আবার বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা নবম সংসদ নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী শরীফ শাহ কামাল তাজ একাদশ সংসদ নির্বাচনেও মনোনয়ন চাইবেন বলে শোনা যাচ্ছে। এ ছাড়া এ আসনে আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ দাবিদার ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি আজিজুল বারী হেলাল। তাঁর বাড়ি এখানে। নবম সংসদ নির্বাচনে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হয় ঢাকা-১৮ আসনে। তিনি আগামী নির্বাচনে খুলনা-৪ আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন।

কেউ কেউ বলছেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও খুলনা জেলা শাখার সাবেক সভাপতি মাজেদুল ইসলামও এই আসনে মনোনয়ন চাইতে পারেন।

তবে দলটির খুলনা জেলা শাখার সভাপতি শফিকুল আলম মনা কালের কণ্ঠকে বলেন, তিনি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার কথা ভাবছেন না। এ আসনে তাঁদের সম্ভাব্য প্রার্থী ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আজিজুল বারী হেলাল। তিনি এলাকায় গণসংযোগও করছেন।

এ আসনটি ঐতিহ্যগতভাবেই বিএনপির—এমন দাবি করে শফিকুল আলম মনা আরো বলেন, ‘নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে এই আসনে বিএনপির প্রার্থী জয়লাভ করবেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী এই আসনে জেতেন বটে, তবে বিএনপির সমর্থক-শুভানুধ্যায়ী সংখ্যায় বেশি।’

অন্যান্য দল : এ আসনে বর্তমান জাতীয় সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির জেলা নেতা মো. হাদিউজ্জামান সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে গণসংযোগ শুরু করেছেন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তাদের প্রার্থী হিসেবে ইউনুচ আহমাদের নাম ঘোষণা করেছে।

 



মন্তব্য