kalerkantho


মায়ের কোল থেকে হ্যাঁচকা টানে মৃত্যুর কোলে

ওমর ফারুক   

১৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মায়ের কোল থেকে হ্যাঁচকা টানে মৃত্যুর কোলে

চার বছরের বড় ছেলে আলামিন দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। চিকিৎসার জন্য কিছু টাকা জোগাড় করে তাকে নিয়ে শরীয়তপুর থেকে ঢাকায় এসেছিলেন শাহ আলম-আকলিমা দম্পতি। সঙ্গে ছিল কোলের শিশু, ছয় মাস বয়সী ছোট ছেলে আরাফাতও।

ঢাকার সদরঘাটে লঞ্চ থেকে নেমে রিকশায় শনির  আখড়া যাওয়ার পথে দুই হাতে কোলের শিশুকে আগলে রেখেছিলেন মা আকলিমা। কিন্তু তাঁর কাঁধের ভ্যানিটি ব্যাগে আচমকাই ছিনতাইকারীর টানে হাত থেকে ফসকে রাস্তায় পড়ে যায় ছোট্ট শিশু আরাফাত। নিজেও ছিটকে পড়েন রাস্তায়।

যে হাতে আরাফাতকে আগলে রেখেছিলেন মা, দ্রুতই সেই হাতে তুলে নেন ছেলেকে। কিন্তু এতটুকু শিশু কি আর এত বড় ধকল সইতে পারে? প্রথমবার রাজধানীতে এসেই প্রাণ গেল শিশু আরাফাতের। আহত হন তার মা আকলিমাও।

গতকাল সোমবার ভোর ৬টার দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানাধীন দয়াগঞ্জ এলাকার পাড় গেণ্ডারিয়ার ১৯/১ নম্বর ভবনের সামনে ঘটে এ মর্মান্তিক ঘটনা।

এর আগে গত অক্টোবরে ছিনতাইকারীর কবল থেকে এক নারীকে বাঁচাতে গিয়ে দয়াগঞ্জের কাছেই টিকাটুলীতে ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান আবু তালহা নামে এক বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্র।

দুর্ঘটনার পর গতকাল যখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গের সামনে শিশু আরাফাতের লাশের জন্য অপেক্ষা করছিলেন মা আকলিমা তখন দেখা গেছে, বারবার মর্গের দরজার দিকে গিয়ে প্রিয় সন্তানের মুখটি দেখার চেষ্টা করছেন তিনি। এর মধ্যেই সাদা কাপড়ে ঢাকা একটি লাশ বের করা হয় মর্গ থেকে। আকলিমা ছুটে যেতে থাকেন সেই লাশের দিকে। তখন লোকজন বাধা দিয়ে জানায়, এটা তাঁর সন্তানের লাশ নয়, বড় মানুষের লাশ।

তখন কাতর কণ্ঠে অসহায় আকলিমার প্রশ্ন, ‘আমার পোলাডারে দিব না?’ যেন অসুস্থ বড় ছেলের চিকিৎসা দূরে থাক, আকলিমার জন্য ‘সুস্থ’ ছোট ছেলের লাশ পাওয়াও দুরূহ এই শহরে!   

আরাফাতের বাবা শাহ আলম পুলিশকে জানিয়েছেন, রিকশা দিয়ে যাওয়ার সময় এক ছিনতাইকারী দৌড়ে এসে টান দিয়ে তাঁর স্ত্রীর ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে যায়। মুহূর্তেই রিকশা থেকে ছোট ছেলে আরাফাত ও তাঁর স্ত্রী রাস্তায় পড়ে যান। মাথা ও নাক ফেটে রক্তাক্ত হয়ে মারা যায় আরাফাত।

আকলিমা বেগম কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, তাঁদের বাড়ি শরীয়তপুরের নরসিংহপুর গ্রামে। বড় ছেলে আলামিনের দীর্ঘদিন ধরে জ্বর আসে, গিটে গিটে ব্যথা। এ কারণে তাঁরা অনেক কষ্টে কয়েক হাজার টাকা জোগাড় করে ঢাকার শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর সিদ্ধান্ত নেন।

আকলিমা জানান, গত রবিবার সন্ধ্যায় খেয়েদেয়ে তাঁরা লঞ্চে শরীয়তপুর লঞ্চঘাটে ময়ূরী-২ লঞ্চে ওঠেন। রাত ১০টার দিকে লঞ্চটি ঢাকার সদরঘাটের উদ্দেশে যাত্রা করে। গতকাল ভোর ৫টার দিকে লঞ্চটি ঢাকার সদরঘাটে পৌঁছায়।

আকলিমা আরো জানান, সদরঘাটে নেমে রিকশা নিয়ে তাঁরা শনির আখড়ায় থাকা তাঁর বোন মাকসুদার বাসায় যাচ্ছিলেন। রিকশার বাঁ দিকে আলামিনকে কোলে নিয়ে বসেছিলেন শাহ আলম। ডান দিকে আরাফাতকে কোলে নিয়ে বসেন আকলিমা। হুড খোলাই ছিল। দয়াগঞ্জ মোড়ের পর রেললাইনের ব্রিজ পার হতেই আচমকা টান দিয়ে তাঁর ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে যায় ছিনতাইকারী। তখন কোলের শিশুসহ তিনিও পড়ে যান।

আকলিমা জানান, ঘটনার পর সাহায্যের জন্য রাস্তায় তাঁরা স্বামী-স্ত্রী চিত্কার করতে থাকেন। কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। শেষে যে রিকশায় তাঁরা যাচ্ছিলেন তাঁর চালকই তাঁদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছে দেন। হাসপাতালের গেটে গিয়ে আরাফাতকে নিয়ে তার বাবা শাহ আলম দৌড়ে জরুরি বিভাগে যান। কিন্তু কর্তব্যরত চিকিত্সক জানান, আরাফাত অনেক আগেই মারা গেছে।

ভ্যানিটি ব্যাগে ছয়-সাত হাজার টাকা, মোবাইল ফোন, আলামিনের চিকিৎসার কাগজপত্র ছিল বলে জানিয়েছেন আকলিমা।

গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, আকলিমা মর্গের সামনে একটি গাছের নিচে বসে কাঁদছেন, তিনি এতটাই মুষড়ে পড়েছেন যে কথা বলতে পারছিলেন না। পাশে বসে আছেন তাঁর বোন মাকসুদা। মাকসুদার কোলে অসুস্থ আলামিন।

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে মাকসুদা জানান, তাঁরা খবর পেয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘অসুস্থ ছেলেটার চিকিৎসাও হলো না। অথচ সুস্থ ছেলেটাও মারা গেল।’

আকলিমার ভগ্নিপতি (মাকসুদার স্বামী) রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে জানান, হাসপাতাল থেকে আরাফাতের লাশ বুঝে পেলে তাঁরা শরীয়তপুরে যাবেন। আপাতত আলামিনের চিকিৎসা করানো হচ্ছে না। 

হাসপাতাল থেকে দয়াগঞ্জের ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, পুলিশ, র্যাব ও সংবাদকর্মীরা তত্পর। এলাকার লোকজনও ভিড় করেছে। এলাকাবাসী ওই এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেই চলেছে জানিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে।

স্থানীয় লোকজন জানায়, নামাপাড়া বস্তি ছিনতাইকারীর আখড়া। সেখানে এমন কোনো মাদক নেই যা পাওয়া যায় না। প্রতিদিনই দয়াগঞ্জ এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। পুলিশ নেশাখোর ছিনতাইকারীদের ধরে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়। পুলিশের সামনে ছিনতাই হলেও পুলিশ কিছু বলে না।

এলাকাবাসী আরো জানায়, রাতের দিকে দয়াগঞ্জ এলাকায় পুলিশ দায়িত্ব পালন করলেও ভোরের দিকে তাদের দেখা যায় না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে যাত্রাবাড়ী থানার ওসি আনিছুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ছিনতাই হলে ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু জামিনে এসে কোনো কোনো ছিনতাইকারী আবার ছিনতাই করে।’

এলাকাবাসীর অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘একটা ঘটনা ঘটলে সবাই পুলিশকে দোষারোপ শুরু করে। এটা নতুন কিছু নয়।’

ঘটনার পর খবর পেয়ে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ছিনতাইকারীকে ধরতে আশপাশের এলাকায় অভিযান শুরু হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

 


মন্তব্য