kalerkantho


ভিড়ে পদদলিত হয়ে ১০ জনের মৃত্যু

চট্টগ্রামে মহিউদ্দিনের কুলখানিতে আরেক শোকগাথা

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

১৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ভিড়ে পদদলিত হয়ে ১০ জনের মৃত্যু

শোক জানাতে কুলখানিতে এসেছিল তারা, কিন্তু কে জানত তারাই জন্ম দেবে আরেক শোকগাথার। গতকাল চট্টগ্রাম নগরীতে সাবেক মেয়র মহিউদ্দিনের কুলখানিতে পদদলিত হয়ে মৃত্যু হয় ১০ জনের। ছবি : কালের কণ্ঠ

মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি, চট্টগ্রাম সিটির সাবেক মেয়র মুক্তিযোদ্ধা এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে যখন শোকে ভাসছে চট্টগ্রাম, সেই মুহূর্তে নগরীতে সৃষ্টি হলো আরেক শোকগাথা। ‘চট্টল বীর’কে হারানোর শোক না কাটতেই তাঁর কুলখানির আয়োজন ঘিরে নতুন করে শোকে ভাসল বন্দর নগর। চট্টগ্রামের সর্বস্তরের মানুষের প্রিয় কুলখানি ছিল গতকাল সোমবার। এ উপলক্ষে পরিবারের পক্ষ থেকে নগরীর ১৪টি কমিউনিটি সেন্টারে মেজবানের আয়োজন করা হয়েছিল। তারই একটি কমিউনিটি সেন্টারে অতিরিক্ত ভিড়ে পদদলিত হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন ১০ জন। তাঁদের মধ্যে একজন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। মর্মন্তুদ ওই ঘটনায় আহতের সংখ্যা অর্ধশতাধিক।

আহত ১৩ জনকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে চারজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। নিহত সবাই হিন্দু সম্প্রদায়ের। ওই কমিউনিটি সেন্টারে সনাতন সম্প্রদায়ের লোকজনের জন্য খাবারের আয়োজন করা হয়েছিল।

গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে নগরীর জামালখানের আসকারদিঘির উত্তর-পূর্ব পাশে এসএস খালেদ সড়কসংলগ্ন রীমা কনভেনশন সেন্টারে মর্মান্তিক ওই ঘটনা ঘটে। খবর ছড়িয়ে পড়লে চট্টগ্রামের সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে। হঠাত্ থমকে যায় চট্টগ্রাম। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সবাই ছুটে যান ঘটনাস্থলে এবং চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। নিহত ও আহত ব্যক্তিদের স্বজনদের আহাজারিতে সেখানকার পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। স্বজনহারা মানুষের কান্নায় অনেকেই চোখের জল সংবরণ করতে পারেনি। হাজার হাজার মানুষের ভিড় জমে হাসপাতালে। উপস্থিত অনেকে বলে, যারা নিহত হয়েছেন তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তাঁদের হারিয়ে পরিবারগুলো অথৈ সাগরে ভাসল।

নিহতরা হলেন প্রদীপ তালুকদার (৫৪), লিটন দেব (৫০), দীপংকর দাশ রাহুল (২৬), ধনা শীল (৫০), সুদীপ দাশ (৪৭), ঝুন্টু দাশ (৪২), কৃষ্ণপদ দাশ (৪৩), অলক ভৌমিক (৩৮), সত্যব্রত ভট্টাচার্য (৪২) ও লিটন ভট্টাচার্য (৫০)। দীপংকর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র।

আহতদের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আছেন ১২ জন। তাঁদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁরা হলেন ক্যাজুয়ালিটি ওয়ার্ডে চিকিত্সাধীন মনোজ বড়ুয়া অপু, উজ্জ্বল চৌধুরী, মো. হারুন, সুমন দাশ, বাসু সিংহ এবং নিউরোসার্জারি ওয়ার্ডে চিকিত্সাধীন রাম দুলাল দাশ। আহত অন্য ছয়জনের মধ্যে তিনজন ক্যাজুয়ালিটি ওয়ার্ডে ও তিনজন আইসিইউতে আছেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিবারের কোনো সদস্য না আসায় ওই ছয়জনের পরিচয় পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

জানা যায়, মহিউদ্দিন চৌধুরীর কুলখানির জন্য গতকাল পরিবারের পক্ষ থেকে নগরীর ১৪টি কমিউনিটি সেন্টারে মেজবানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যারা গরুর মাংস খায় না তাদের জন্য মেজবানের ব্যবস্থা হয়েছিল রীমা কনভেনশন সেন্টারে। দোতলা ওই কমিউনিটি সেন্টার ভবনের নিচতলায় মূলত গাড়ি রাখা হয়। বসা ও খাওয়ার ব্যবস্থা দোতলায়। কনভেনশন সেন্টারের প্রবেশপথ ছোট ও ঢালু।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, রীমা কনভেনশন সেন্টারে গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে খাওয়া শুরু হয়। তখন বাইরে আরো হাজারো মানুষ অপেক্ষমাণ ছিল। ভিড়ের কারণে এস এস খালেদ রোডে যানজট সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে বাইরে অপেক্ষমাণ লোকজনের মধ্যে হৈ-হল্লা শুরু হয়। দুপুর দেড়টার দিকে প্রবেশপথ খুলতেই শুরু হয় প্রচণ্ড ভিড় ও হুড়োহুড়ি। রাস্তার ওপর থেকে নিচে নামতে গিয়ে সেখানে মুহূর্তের মধ্যে অনেকেই মাটিতে পড়ে যান। ওই অবস্থায় পেছন থেকে আরো ভিড়ের চাপ সামনের লোকজনের ওপর পড়ে। ওই সময় সেখানে জুতার স্তূপ জমে। মাটিতে পড়ে ও ভিড়ের কারণে গুরুতর আহত হয় অনেকে। তাদের মধ্যে অন্তত ২৫ জনকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ১০ জনকে মৃত ঘোষণা করেন।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা. রাজীব পালিত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে যাদের নিয়ে আসা হয়েছে তাদের মধ্যে আমরা ১০ জনের মরদেহ পেয়েছি। আহত অন্যদের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়েছে।’

রীমা কনভেনশন হলটি নগরীর জামালখান ওয়ার্ডে। ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন গতকাল বিকেল ৪টার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান থাকা মরদেহ দেখতে। ওই সময় কান্নায় ভেঙেপড়া শৈবাল দাশ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে খাওয়া শুরু হয়। দেড়টার দিকে এ ঘটনা ঘটেছে। নিহতদের মধ্যে আমার ওয়ার্ডের একজন বাসিন্দা রয়েছে। ৮-১০ হাজারের লোকের জন্য মেজবান খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল সেখানে।’

আহত হয়ে ক্যাজুয়ালিটি ওয়ার্ডে চিকিত্সাধীন সুমন দাশ (৩৪) কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কমিউনিটি সেন্টারের গেটে আমার সামনে ১৫-২০ জন ছিল। ওই সময় সেখানে পেছনে কত মানুষ ছিল তা বলতে পারব না। হঠাত্ গেট খুলতেই পেছন থেকে এমন ধাক্কা শুরু হলো, আমি পড়ে যাই। এর পর আর কিছুই বলতে পারি না। হাসপাতালে আসার পর শুনলাম আমার পেছনে যারা ছিল তাদের মধ্যে বেশির ভাগ মারা গেছে। ওই সময় মনে হয়েছিল আমি যেন মরে যাচ্ছি। শুধু মা মা বলে চিত্কার করছি।’

আহত মোহাম্মদ হারুন (৫০) বলেন, ‘আমি চাক্তাই থেকে সেখানে যাই দুপুর ১টার দিকে। এত ভিড় হঠাত্ লোকজন দৌড় দিলে আমি পড়ে যাই। আমার মুখে, পায়ে ও বুকে ব্যথা লেগেছে।’

একই ওয়ার্ডে ভর্তি বাসু শীল (৪৫) বলেন, ‘আমার বাসা জামালখানে। ভিড়ের কারণে পেছনে লোক কত ছিল তা দেখা যাচ্ছে না। আমি সামনে ছিলাম। আমার আগে ৮-১০ জন ছিল। পেছনের ধাক্কায় মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর আর কিছু বলতে পারছি না। পরে দেখছি আমি হাসপাতালে।’

গতকাল দুপুর ২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টার মধ্যে মরদেহ এবং আহতদের চট্টগ্রাম মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হয়। সোয়া ২টার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ঢুকতেই বাইরে শত শত লোকের ভিড়। স্বজনদের কান্না-আহাজারিতে সেখানে এক হূদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

সুদীপ দাশকে হারিয়ে বিলাপ করছিলেন তাঁর মা সুখীবালা দাশ, ছোট ভাই সুনীল দাশ, বড় বোন রীনা দাশ। বুকফাটা আর্তনাদ করতে করতে মা সুখীবালা দাশ দুই হাত তুলে বলছিলেন, ‘আমার পরিবারের কী হবে? আমার ছেলের দুই শিশুসন্তান আছে। তাদের কী হবে? কে আমাকে মা ডাকবে? ১টার দিকে সে ওখানে গিয়েছিল। আমার ছেলে মাছ ব্যবসা করে ঘর চালাত।’

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মেঝেতে কৃষ্ণপদ দাশের মরদেহ। সেখানেও প্রচুর ভিড়। বাইরে বিলাপ করছিল কৃষ্ণপদ দাশের মা সীতা রানী, বড় বোন সাগরিবালাসহ পরিবারের সদস্যরা।

প্রদীপ তালুকদারের ছোট ভাই দীলিপ তালুকদার বলেন, ‘আমার বড় ভাই বান্দরবানে ব্যবসা করেন। ব্যবসার কাজে গত রবিবার দুপুরে চট্টগ্রামে এসেছিলেন। পরিবার নিয়ে থাকতেন নগরীর আগ্রাবাদ এলাকায়। আমার মেয়ের আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি বিয়ে। প্রদীপ সকালে বাসায় মাংস রান্নার ব্যবস্থা করে আন্দরকিল্লায় এসেছিলেন। কথা ছিল আমার স্ত্রীকে নিয়ে বিকেল ৫টায় বিয়ের কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করবেন। এখন এসে দেখি হাসপাতালে ভাইয়ের লাশ। তাঁর দুটি মেয়ে, তাদের এখন কী হবে?’

ওই কনভেনশন সেন্টারে দায়িত্বরত স্বেচ্ছাসেবক অনুপ দাস জানান, হুড়াহুড়ির ঘটনায় তিনি নিজেও পায়ে ব্যথা পেয়েছেন। তিনি বলেন, ফটকের বাইরে ছিল অনেক ভিড়। ঢোকার সময় পেছনের চাপে সামনের ওই ঢালু জায়গায় থাকা বেশ কয়েকজন পড়ে যায়। তখন তাদের ওপর দিয়েই পেছনের লোকজন হুড়মুড় করে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। ফলে অনেক মানুষ হতাহত হয়।

চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, অনেকে পড়ে গেছে, মানুষের ভিড়ের কারণে অনেকে পদদলিত হয়েছে। কমিউনিটি সেন্টারের ফটকে পুলিশের তত্পরতার অভাব ছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত নয়। এটা মারামারি বা গ্রুপিং বা অন্য কোনো বিষয় না। নিরাপত্তার অভাব হয়নি, অতিরিক্ত মানুষের কারণে এবং ঢোকার সময় হুড়াহুড়ির কারণে অনেকে পড়ে গিয়ে পদদলিত হয়েছে।’

নিহত প্রত্যেকের পরিবার পাবে ১ লাখ টাকা কুলখানির মেজবানে ভিড়ে পদদলিত হয়ে নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে দেওয়া হবে এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর পরিবারের পক্ষ থেকে। একই সঙ্গে আহতদের চিকিত্সার জন্যও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল বিকেলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মাসুদুর রহমান শিকদার বিষয়টি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে দেওয়ার কথা প্রয়াত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আহতদের চিকিত্সা ছাড়াও তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে তারা। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক জানান, তাত্ক্ষণিকভাবে নিহতদের সত্কারের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। আহতদের চিকিত্সার জন্য দেওয়া হবে পাঁচ হাজার টাকা করে। এ ছাড়া তাদের চিকিত্সার বিষয়ে যাতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয় সে জন্য হাসপাতালের পরিচালকসহ চিকিৎসকদের বলা হয়েছে।

ঘটনার পরপরই হতাহতদের দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান মহিউদ্দিন চৌধুরীর বড় ছেলে মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। নিহতদের পরিবারকে সান্ত্বনা দিয়ে তাদের পাশে থাকার কথা জানান আবেগাপ্লুত নওফেল।

 


মন্তব্য