kalerkantho


বখাটের ছুরি কেড়ে নিল মুন্নির প্রাণ

‘বখাটে এহিয়ার সঙ্গে তার পরিবারও সমান দোষী’

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বখাটের ছুরি কেড়ে নিল মুন্নির প্রাণ

সুনামগঞ্জের দিরাই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে আসন্ন এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী ছাত্রী হোমায়রা আক্তার মুন্নির। বখাটে এহিয়া সরদার (২৩) উত্ত্যক্ত করায় বছরখানেক ধরে দিরাই পৌর শহরের আনোয়ারপুর এলাকায় নানাবাড়িতে অনেকটা অবরুদ্ধ ছিল সে। কিন্তু গত শনিবার রাতে সেই বাড়ির ভেতরে ঢুকে ছুরিকাঘাত করে মুন্নিকে হত্যা করে পালিয়ে যায় এহিয়া।  

বখাটে এহিয়া দিরাই উপজেলা সদরের সাকিতপুর গ্রামের জামাল উদ্দিন সরদারের ছেলে। মুন্নিকে উত্ত্যক্ত করার বিষয়ে এহিয়াকে নিয়ে কয়েকবার সালিসও হয়েছে। সর্বশেষ সে আর উত্ত্যক্ত করবে না বলে মুচলেকাও দিয়েছিল।

আনোয়ারপুরে দোতলা যে বাড়িটিতে মুন্নির পরিবার থাকে সেটি তার নানার। মুন্নিদের গ্রামের বাড়ি উপজেলার নগদিপুরে। বাবা হিফজুর রহমান ইতালিপ্রবাসী। মুন্নি ও তার ছোট ভাইয়ের পড়ালেখার জন্য মা রাহেলা বেগম পরিবারসহ এই বাড়িতে চলে আসেন।

গতকাল রবিবার দুপুরে মুন্নিদের ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, অনেক মানুষের ভিড়। স্বজন ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলছিলেন পুলিশ সুপার বরকত উল্লাহ খান। তিনি প্রতিবেশীদের কাছ থেকে নানা তথ্য সংগ্রহ করছিলেন।

স্বজনরা জানায়, এই বাড়িতে মুন্নিদের পরিবারসহ পাঁচটি পরিবার থাকে। দোতলায় থাকে মুন্নিরাসহ তিন পরিবার। এর মধ্যে শনিবার অন্য দুই পরিবার ছিল তাদের নিজ বাড়িতে। ঘটনার সময় নিচতলার দুই পরিবারও ছিল না তাদের বাসায়। তাই বাড়িতে ওই সময় খুব একটা লোকজন ছিল না। এই ফাঁকেই বাড়িতে ঢুকে মুন্নিকে হত্যা করে বখাটে এহিয়া।

মুন্নির পরিবারের লোকজন জানিয়েছে, এহিয়া একা বাড়িতে ঢুকে হত্যাকাণ্ড চালালেও তার সঙ্গে আসা চার যুবক নিচে পাহারায় ছিল।

স্বজনরা জানায়, শনিবার রাত ৮টার দিকে মুন্নির মা বাসার এক কক্ষে নামাজ পড়ছিলেন। আর পড়ার ঘরে পড়ছিল মুন্নি। হঠাত্ মুন্নি বুকে ছুরিবিদ্ধ অবস্থায় ‘মা, মা, বাঁচাও’ বলে মায়ের কক্ষে গিয়ে পড়ে যায়। মেয়ের এই অবস্থা দেখে চিত্কার দিয়ে ওঠেন মা রাহেলা বেগম। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে মারা যায় মুন্নি।

মুন্নির পরিবার, স্কুলের সহপাঠী ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মুন্নি নবম শ্রেণিতে ওঠার পরই বখাটে এহিয়া রাস্তাঘাটে তাকে উত্ত্যক্ত করতে শুরু করে। বছরখানেক আগেই মুন্নির স্কুলে যাওয়া-আসা বন্ধ করে দেন মা রাহেলা বেগম। গত পাঁচ মাস ধরে তাকে বাসায় দুজন শিক্ষক রেখে প্রাইভেট পড়ানো হচ্ছিল। তবে গত নভেম্বরে এসএসসি নির্বাচনী পরীক্ষায় মা তাকে স্কুলে নিয়ে যেতেন, নিয়ে আসতেন।

মুন্নির আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও স্কুলের সংশ্লিষ্টরা জানায়, অবরুদ্ধ জীবন যাপন করেও স্বস্তিতে ছিল না মুন্নি। বাসার পাশে গিয়ে প্রায়ই তুলে নেওয়ার ও হত্যার হুমকি দিত বখাটে এহিয়া। মাস তিনেক আগে র্যাবের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন মুন্নির মা। একাধিকবার এহিয়ার বখাটেপনার বিচার দিয়েছেন তার পরিবারের কাছেও। গত ২৬ অক্টোবর এ নিয়ে রাহেলা বেগম তাঁর বাসায় সালিসও ডাকেন। সালিসে মুন্নির স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. জাফর ইকবাল, বখাটে এহিয়ার দুলাভাই তোফাজ্জল হক চৌধুরী এবং রাহেলা বেগমের আত্মীয়রা ছিলেন। আর বখাটেপনা করবে না বলে ওই সালিসে লিখিত মুচলেকাও দেয় এহিয়া। তবে এর পরও উত্ত্যক্ত করায় মুন্নির পরিবার এহিয়ার পরিবারকে বিষয়টি জানায়, কিন্তু তার পরিবার তাতে গুরুত্ব দেয়নি। ওই সময় এহিয়া ফেসবুকে মুন্নির নামে একটি আইডি খুলে নানা অপপ্রচার চালাত।

এহিয়ার মুচলেকার কপি গতকাল পুলিশকে দিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।

স্বজন ও প্রতিবেশীরা জানায়, ঘটনার দুই দিন আগে বাসার পাশে গিয়ে এহিয়া নিজের হাত কেটে মুন্নিকে হত্যা করে সে আত্মহত্যা করার হুমকি দেয়।

প্রতিবেশী সমতা বানু বলেন, ‘শনিবার রাত ৮টার সময় আমরা হঠাত্ চিত্কার শুনি। গিয়ে দেখি মুন্নির মা কান্নাকাটি করছেন। তাঁর মেয়ের বুক ও পেট থেকে তখন রক্ত ঝরছিল, ছটপট করছিল সে। আমিও চিত্কার করে দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা বলি।’

সমতা বানু জানান, ওই সময় মুন্নিদের বাসার উল্টোদিকের মাঠে ব্যাডমিন্টন খেলছিল মাহফুজ আহমেদসহ কয়েকজন যুবক। হঠাত্ চিত্কার শুনে তারাও এসে ঘটনা দেখে মুন্নিকে নিয়ে হাসাপাতালে যায়।

প্রতিবেশী নবম শ্রেণির ছাত্র আফজল হোসেন বলে, ‘আমরা হঠাত্ চিল্লাচিল্লি শুনে গিয়ে দেখি আপা (মুন্নি) ছুরিকাঘাতে আহত হয়ে ছটফট করছেন। তাঁর মা ও ছোট ভাই পাশে কাঁদছিল।’

মুন্নির সহপাঠী রোবাইয়া আক্তার বলে, মুন্নি মেধাবী ছাত্রী ছিল। প্রাথমিক সমাপনীতে জিপিএ ৫ পেয়েছিল। অষ্টম শ্রেণিতে অল্পের জন্য জিপিএ ৫ পায়নি।

রোবাইয়া জানায়, এক বছর ধরে মুন্নি স্কুলে যেত না এহিয়ার কারণে। বাসায় একা থাকার কারণে গত বৃহস্পতিবার তাকে (রোবাইয়া) ফোন করে বাসায় যেতে বলেছিল।

রোবাইয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, ‘যে আমার বান্ধবীকে এভাবে হত্যা করেছে তার সর্বোচ্চ শাস্তি চাই আমরা।’

এদিকে এহিয়া সরদারের সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সে সাকিতপুর গ্রামের কওমি মাদরাসায় পড়ালেখা করত। কয়েক বছর আগে মাদরাসা থেকে মোবাইল চুরির কারণে সে বহিষ্কৃত হয়। এরপর গ্রামের মসজিদের দানবাক্সের টাকাও চুরি করে। এ ঘটনায় এলাকার সালিসে তার বাবা ক্ষমা চান। পরে তিনি ছেলেকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। দিরাই শহরে সে একটি দোকানে কর্মচারীর কাজ করত। তবে গত অক্টোবরে মুচলেকা দেওয়ার পর সে এলাকা ছেড়ে সিলেট চলে যায়। ঘটনার দুই দিন আগে এসে নিজের হাত কেটে আত্মহত্যার হুমকি দিয়ে মুন্নিকেও হত্যার হুমকি দিয়েছিল সে।

সাকিতপুর গ্রামের নূরুন নাহার বেগম বলেন, ‘আমরা শুনেছি এহিয়া মাদরাসায় পড়ার সময় মোবাইল চুরি করে। মসজিদের দানবাক্সের টাকাও চুরি করেছিল। তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ছিল। এ কারণে তার বাবা তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল বলে আমরা জেনেছি।’

দিরাই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জাফর ইকবাল বলেন, ‘এহিয়া সরদারের বখাটেপনার কারণে আমাদের ছাত্রী মুন্নিসহ তার পরিবার ভয়ে থাকত। তারা র্যাবের কাছে লিখিত অভিযোগও করেছিল। প্রায় দুই মাস আগে মুচলেকা দিয়ে বলেছিল সে আর বখাটেপনা করবে না। এখন সে আমাদের মেধাবী ছাত্রীটিকে মেরেই ফেলল। আমরা এ ঘটনায় এই বখাটের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’

এদিকে এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে দিরাই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা। তারা গতকাল সকালে মুন্নির হত্যাকারীদের শাস্তি দাবি করে স্কুলের প্রবেশপথে ব্যানার টানিয়েছে। আজ সোমবার মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দিয়েছে তারা।

গতকাল দুপুরে মুন্নিদের বাড়ির ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার বরকত উল্লাহ খান। ওই সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাবিবুল্লাহ মজুমদার ও সহকারী পুলিশ সুপার তাপস রঞ্জন ঘোষ। তাঁরা নিহতের স্বজন, সহপাঠী, প্রতিবেশী ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন।

বখাটে এহিয়াকে ধরতে পুলিশ সুপার স্থানীয় পুলিশকে বিশেষ অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন।

দিরাই থানার ওসি মোস্তফা কামাল বলেন, ‘বখাটে এহিয়ার সঙ্গে আর কেউ ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাকে আটক করতে নানা স্থানে অভিযান চালাচ্ছি আমরা। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।’ ওসি জানান, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে মুন্নির মরদেহ গতকাল বিকেলে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

পুলিশ সুপার বরকত উল্লাহ খান বলেন, ‘বখাটের হাতে একজন মেধাবী ছাত্রীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যু কারো কাম্য নয়। বখাটেকে ধরতে আমরা অভিযান শুরু করে দিয়েছি। প্রতিটি এলাকায় তাকে ধরার জন্য বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে।’

পুলিশ সুপার এলাকাবাসীর উদ্দেশে আরো বলেন, এই ঘটনা এত দূর যেত না যদি পরিবারের লোকজন সচেতন থাকত। দীর্ঘদিন ধরে বখাটেপনা করলেও পরিবার পুলিশের কাছে যায়নি। তিনি অভিভাবকদের এ বিষয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।

এ ব্যাপারে বখাটে এহিয়ার বাবা জামাল উদ্দিন সরদারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তা ধরেননি।



মন্তব্য