kalerkantho


জাতীয় ব্র্যান্ড ভ্যালু বেড়েছে ২২%

পাকিস্তানের চেয়ে ৬ ধাপ এগিয়ে

মাসুদ রুমী   

১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



জাতীয় ব্র্যান্ড ভ্যালু বেড়েছে ২২%

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৪৬ বছরে বিশ্বে সর্বোচ্চ মূল্যবান দেশের ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৪তম। এক বছরের ব্যবধানে জাতীয় ব্র্যান্ড ভ্যালু বেড়েছে ২২ শতাংশ। সামাজিক, অর্থনৈতিকসহ নানা খাতে বাংলাদেশের সাফল্য রাষ্ট্র হিসেবে ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়তে সহায়তা করছে, যা পাকিস্তানের চেয়ে ছয় ধাপ এগিয়ে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বৈশ্বিক ব্র্যান্ড মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান ‘ব্র্যান্ড ফিন্যান্স’ প্রকাশিত ‘নেশন ব্র্যান্ডস ২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদনে ব্র্যান্ড ভ্যালুতে বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৪তম।

ওই তালিকায় শীর্ষ দশে থাকা দেশগুলো হচ্ছে যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জার্মানি, জাপান, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডা, ভারত, ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়া।

২০১৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী সে বছর বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ভ্যালু বেড়েছিল ১৮ শতাংশ। ওই বছর ব্র্যান্ড ভ্যালু ছিল ১৭০ বিলিয়ন বা ১৭ হাজার কোটি ডলার।

এবারের প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ভ্যালু পাকিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়ে। প্রতিবেদনে পাকিস্তানের অবস্থান ৫০তম। চলতি বছরে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ভ্যালু পৌঁছেছে ২০৮ বিলিয়ন বা ২০ হাজার ৮০০ কোটি মার্কিন ডলারে। প্রতিবেদনের তথ্য মতে, বাংলাদেশের জাতীয় ব্র্যান্ড ভ্যালু এক বছরের মধ্যেই বেড়েছে ২২ শতাংশ।

প্রাপ্ত মান অনুযায়ী ছয়টি আলাদা শ্রেণিতে ভাগ করা হয় প্রতিটি দেশের ব্র্যান্ডকে। এগুলো হলো অসাধারণ, অত্যন্ত শক্তিশালী, শক্তিশালী, উন্নয়নশীল, দুর্বল ও ক্ষয়িষ্ণু। প্রতিটি শ্রেণিতে তিনটি করে উপশ্রেণি রয়েছে। বাংলাদেশের রেটিং এ ক্ষেত্রে ‘এ মাইনাস’, যা শক্তিশালী ব্র্যান্ড রেটিংয়ের শ্রেণিভুক্ত। এ ছাড়া ব্র্যান্ড ফিন্যান্স তিনটি উল্লেখযোগ্য বিষয়কে ২৬টি মানদণ্ডে বিবেচনা করে একটি দেশের ব্র্যান্ড সক্ষমতা যাচাই করেছে। বিষয়গুলো হচ্ছে বিনিয়োগ, সমাজ এবং পণ্য ও সেবা। এগুলোকে যে ২৬টি মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়েছে সেগুলো হলো বিনিয়োগে সরকারি বিধিবিধান, করব্যবস্থা, অবকাঠামো, বিনিয়োগ সুরক্ষা, প্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণা ও উন্নয়ন, ব্যবসা সহজীকরণ, বাজার উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা, মেধাধারণ, মেধার ব্যবহার, দুর্নীতি, বিচারব্যবস্থা, নিরাপত্তা, ভাবমূর্তি, জীবনযাত্রার মান, করপোরেট নৈতিকতা, বাণিজ্যনীতি, সরকারিনীতি, বাজারের আকার, বাজার প্রতিযোগিতা, বাজার উন্নয়ন, পর্যটন আকর্ষণ, পর্যটন মূল্য, পর্যটন অবকাঠামো এবং স্বচ্ছতা।

দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার নানা ক্ষেত্রে অগ্রগতিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে পরিচিত। পঞ্চাশের দশকে পূর্ব পাকিস্তানের গড় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ১.৯ শতাংশ। একই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানে প্রবৃদ্ধি ছিল ২.৭ শতাংশ। ষাটের দশকে এ ব্যবধান আরো বেড়ে যায়। এ অঞ্চলের ৪.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানে ৬.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছিল।

গত সেপ্টেম্বরে দি ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে অর্থনৈতিক উন্নয়নে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি তুলনা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয় তখন পাকিস্তানের তুলনায় এ দেশ ছিল অনেক দরিদ্র। জিডিপির ৬ থেকে ৭ শতাংশ আসত শিল্প খাত থেকে।

৪৬ বছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এক হাজার ৬১০ ডলার, যা পাকিস্তানে এক হাজার ৪৭০ ডলার। গত অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭.২৮ শতাংশ। একই অর্থবছরে পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫.২৮ শতাংশ।

কিছু সূচকে বাংলাদেশ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের চেয়েও এগিয়ে।

গ্রে অ্যাডভার্টাইজিং বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ গাউসুল আলম শাওন গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্র্যান্ড আসলে একটা আইডেন্টিটি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের উন্নয়ন, আমাদের মানবতা—এসব কিছু আমাদের ব্র্যান্ড আইডেন্টিটিতে অবদান রাখছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে আমাদের মানবতাসম্পন্ন জাতি হিসেবে তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে উন্নত দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের সঠিক প্রতিনিধিত্ব করতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শীর্ষ তিনজন ক্ষমতাধর নারীর কাতারে উঠে এসেছেন। আমরা ক্রিকেটে ভালো করেছি। আমাদের মাথাপিছু আয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। তরুণরা প্রযুক্তিতে দেশে-বিদেশে নানা উদ্ভাবনী কাজ করছে।’

সৈয়দ গাউসুল আলম শাওন আরো বলেন, ‘আমাদের কোনো কান্ট্রি ব্র্যান্ডিং কৌশল নেই। আমরা সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বারবার বলেছি, আমাদের একটা সুনির্দিষ্ট কান্ট্রি ব্র্যান্ডিং স্ট্র্যাটেজি দরকার। আমরা আমাদের দেশকে যত ভালোবাসতে পারব তত আমাদের দেশ এগিয়ে যাবে, আমাদের ব্র্যান্ড ইমেজ তত বাড়বে। শুধু অ্যাডভার্টাইজিং করে ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি করা যায় না। আমরা মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে বলি, প্রডাক্ট যদি ভালো না হয়, অ্যাডভার্টাইজিং করে ভালো ফল পাওয়া যায় না।’

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একটি ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করা শত বছরের ব্যাপার। আমরা পোশাকশিল্পে ভালো করেছি। আমাদের চামড়াশিল্পও এগোচ্ছে। আমরা নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে বিশ্বে নতুন একটি পরিচয় তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছি। এভাবে আস্তে আস্তে আমাদের অগ্রগতি যত বাড়বে, ব্র্যান্ড ইমেজও তত উন্নত হবে। আমাদের কান্ট্রি ব্র্যান্ড আরো এগোতে হলে আরো ভালো করতে হবে, পণ্যের মান আরো নিখুঁত হতে হবে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে ৫০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষমাত্রা অর্জন অসম্ভব নয়। এটা অর্জনে বিনিয়োগ অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, জ্বালানি, নৌবন্দরের সক্ষমতাসহ নানা ক্ষেত্রে আমাদের আরো উন্নতি করতে হবে।’

বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়ার ক্ষেত্রে কিছু কারণের কথা বললেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারি হিসাবে আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে। এখন বলা হচ্ছে ৭.২৮, যা আগের বছর ছিল ৭.১১ শতাংশ। জাতীয় উৎপাদনের হার, মাথাপিছু আয় বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে। দারিদ্র্য বিমোচনের হার ভালোই আছে। প্রযুক্তি খাতে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে আমাদের খুব উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। তবে আমাদের আর্থিক খাতের অবস্থা খারাপ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আমাদের বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের হার আন্তর্জাতিক মানের নিচে। নিরাপত্তা বেষ্টনী আরো জোরদার করতে হবে। দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ আরো উন্নত করতে হবে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের যেসব গভর্নেন্স ইনডেক্স আছে সেগুলোতে আমাদের উন্নতি করতে হবে। জ্বালানি ও অবকাঠামোয় আরো ভালো করতে হবে।’   

দেশে ব্র্যান্ডিং নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরাম (বিবিএফ)। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরিফুল ইসলাম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘‘তারা মূলত বিনিয়োগ, সমাজ এবং পণ্য ও সেবা—এই তিনটি বিষয়ে একটি দেশের অগ্রগতি দেখে। বাংলাদেশের গত তিন বছরে বেশ কিছু অগ্রগতি বৈশ্বিক মিডিয়াতেও এসেছে। আমাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক অগ্রগতি, এমডিজিতে অগ্রগতি রয়েছে। কিন্তু এই কাহিনিগুলো একেকটা গল্পের মতো বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন, যেখানে আমরা পিছিয়ে রয়েছি। আমাদের খুব কার্যকর কোনো কান্ট্রি ব্র্যান্ডিং স্ট্র্যাটেজি নেই। আমরা পর্যটন বর্ষ উপলক্ষে ‘ভিজিট বাংলাদেশ’ কিংবা ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ ক্যাম্পেইন করেছি। কিন্তু এগুলো খুবই অকার্যকর। ‘ইনক্রেডিবল ইন্ডিয়া’ তাদের পর্যটনের স্লোগান কিন্তু সেটা তারা পুরো জাতির স্লোগান হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছে, যা আমরা পারিনি। ‘ট্রুলি এশিয়া’ বললে যেমন মালয়েশিয়ার কথা সবার মনে আসে। মালয়েশিয়া তাদের এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দেশকে নতুনভাবে বিশ্বের কাছে পরিচিত করেছে। আমরা যে বাঙালি এটাই আমাদের স্টোরি। পৃথিবীর সবচেয় এথনিক গ্রুপ আমরা লিড করি। বাঙালি সংস্কৃতিকেও আমরা ভালো করে তুলে ধরতে পারিনি। এ জন্য আমাদের জাতিগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সংগতি রেখে আমাদের কান্ট্রি ব্র্যান্ডিংয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে।”


মন্তব্য