kalerkantho


রংপুর সিটি নির্বাচন

কাউন্সিলর প্রার্থীদের কারণে প্রচারে পিছিয়ে আওয়ামী লীগ!

স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

১৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



কাউন্সিলর প্রার্থীদের কারণে প্রচারে পিছিয়ে আওয়ামী লীগ!

রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩৩টি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের শতাধিক নেতাকর্মী কাউন্সিলর প্রার্থী হয়েছেন। তাঁরা নিজেরা নিজেদের প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন। দলের মেয়র পদপ্রার্থী নিয়ে কোনো ভাবনা নেই তাঁদের। ফলে নিজ দলের কাউন্সিলর প্রার্থীদের নিয়ে অনেকটা বেকায়দায় রয়েছে আওয়ামী লীগ। ভোটার, কাউন্সিলর প্রার্থীসহ অনেকের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

জানতে চাইলে রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সফিউর রহমান সফি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সমস্যা যে হচ্ছে না, তা নয়। সমস্যা কিছু তো হচ্ছেই। তবে দল-সমর্থক কাউন্সিলরও তো দরকার আছে। কারণ একা মেয়র হয়ে লাভ কী?’ তিনি আরো বলেন, প্রতি ওয়ার্ডেই আওয়ামী লীগের ৬৫ সদস্যের কমিটি আছে। দু-চারজন কাউন্সিলর প্রার্থীর সঙ্গে থাকলেও বেশির ভাগ নেতাকর্মী মেয়র প্রার্থীর পক্ষেই কাজ করছে।

এদিকে জাতীয় পার্টির কাউন্সিলর প্রার্থী হাতে গোনা কয়েকজন। দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা লাঙ্গল প্রতীকের মেয়র প্রার্থীকে জয়ী করতে দিন-রাত কাজ করছে। একই অবস্থা বিএনপিরও।

গত বুধবার থেকে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা রংপুরে অবস্থান করে নিজেদের দলীয় মেয়র প্রার্থীদের পক্ষে গণসংযোগ ও নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন।

আওয়ামী লীগ প্রার্থী শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টুর নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন ও তথ্য গবেষণা সম্পাদক আফজালহোসেনের নেতৃত্বে একটি দল রংপুরে এসে দুই দিন নৌকার পক্ষে প্রচার চালায়। এর আগে যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ইমরান হোসেনের নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল রংপুরে এসে ঝন্টুর সঙ্গে সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় পথসভায় অংশ নেয়।

বিষয়টি নিশ্চিত করে রংপুর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান সিদ্দিকী রনি জানান, যুবলীগের কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী ও সেক্রেটারি হারুন অর রশিদ গতকাল রবিবার রংপুরে এসেছেন। তাঁরা নৌকার পক্ষে গণসংযোগসহ প্রচার চালাচ্ছেন।

অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী কাওছার জামান বাবলার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব শহিদুল ইসলাম মিজু জানান, দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালাতে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও নির্বাচন পরিচালনার কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু বুধবার রংপুরে এসেছেন। গত বৃহস্পতিবার বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল নির্বাচনী পথসভায় বক্তব্য দেন। পর্যায়ক্রমে আরো দলীয় নেতারা রংপুরে এসে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেবেন।

জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগে পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রংপুরে এসে গণসংযোগসহ কয়েকটি পথসভায় মোস্তফার পক্ষে প্রচার চালান। গত শনিবার রাতে রংপুরে আসেন জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান সাবেক মন্ত্রী গোলাম মোহাম্মদ কাদের। তিনি দলীয় প্রার্থীর পক্ষে গণসংযোগ করেন।

কাউন্সিলর প্রার্থী বেশি থাকায় প্রচারে পিছিয়ে আওয়ামী লীগ : আগামী ২১ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ৩৩টি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থক মিলে শতাধিক কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে তাঁরা প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। দলের মেয়র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার ফুরসত নেই তাঁদের। এ কারণে বিশেষ করে সিটি করপোরেশনের বর্ধিত এলাকায় নৌকা প্রতীকের পক্ষে প্রচার অনেক কম বলে ভোটাররা জানিয়েছেন। দলীয় কাউন্সিলর প্রার্থীরা নিজেরা ভোটে জয়লাভের জন্য স্থানীয় নেতাদের নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। নিজেরা প্রার্থী হওয়ায় কৌশলগত কারণে তাঁরা দলের মেয়র প্রার্থী সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টুর পক্ষে ভোট চাইছেন না। এ কারণে দলীয় ভোটাররা আওয়ামী লীগের প্রচার নিয়ে হতাশ। তাঁরা জানান, সাধারণ ভোটারদের কাছে যে প্রার্থী একাধিকবার যাবেন, তাঁরা তাঁকেই ভোট দেবেন। নৌকার মেয়র প্রার্থী ছাড়া অন্য প্রতীকের মেয়র প্রার্থীরা সাধারণ মানুষের কাছে এরই মধ্যে একাধিকবার পৌঁছেছেন বলেও ভোটাররা জানান।

রংপুর সিটি করপোরেশনের ৩৩টি ওয়ার্ডের মধ্যে বিএনপি সমর্থক কাউন্সিলর প্রার্থী আছেন ১২টিতে এবং জাতীয় পার্টি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী সাতটি ওয়ার্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। রংপুর জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত হলেও তিন ভাগের এক ভাগ ওয়ার্ডে দল সমর্থিত কোনো কাউন্সিলর প্রার্থী নেই। এই সুযোগে তৃণমূলে দলটির নেতাকর্মীরা জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার পক্ষে রাত-দিন প্রচারকাজ করছেন।

জাতীয় পার্টির মহানগর সাধারণ সম্পাদক এস এম ইয়াছির বলেন, ওয়ার্ড পর্যায়ে কাউন্সিলর পদে তাঁদের দলের হাতে গোনা কয়েকজন প্রার্থী থাকায় অধিকাংশ নেতাকর্মী দলের মেয়র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন।

২৯ নম্বর ওয়ার্ডে জাতীয় পার্টির কাউন্সিলর প্রার্থী নেই। ফলে এখানকার সব নেতাকর্মী দলের মেয়র প্রার্থীর পক্ষে প্রচারকাজ করছেন। এ ওয়ার্ডের দলটির নেতা রহিম পাঠান জানান, সব নেতাকর্মী একযোগে মেয়র পদে লাঙ্গল মার্কার পক্ষে কাজ করছে। এ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থীর সংখ্যা সাতজন। তাঁদের মধ্যে চারজন আওয়ামী লীগের।

কাউন্সিলর প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আলমগীর হোসেন চৌধুরী জানান, তিনি ঠেলাগাড়ি প্রতীক নিয়ে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করছেন। তিনি তাঁর নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। নির্বাচনে জয়ী হতে ব্যস্ত থাকায় দলের মেয়র প্রার্থী নিয়ে ভাবার সময় তাঁর নেই।

৩০ নম্বর ওয়ার্ডে পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম তোতা ও ওয়ার্ড শাখার সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেনও আছেন। বিএনপির মালেক নিয়াজ আরজু থাকলেও জাতীয় পার্টির প্রার্থী নেই। আনোয়ার হোসেন জানান, তিনি টিফিন ক্যারিয়ার প্রতীক নিয়ে কাউন্সিলর পদে লড়ছেন। নিজের প্রচারে ব্যস্ত থাকায় দলের মেয়র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার সুযোগ নেই তাঁর।

জাহাঙ্গীর আলম তোতা মিষ্টিকুমড়া প্রতীক নিয়ে এ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে লড়ছেন। তিনি অবশ্য দাবি করেছেন যে তিনি দলের মেয়র প্রার্থীর পক্ষেও ভোট চাচ্ছেন।

১ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী ছয়জন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থক চারজন। ২ নম্বর ওয়ার্ডে প্রার্থী চারজনের মধ্যে তিনজন আওয়ামী লীগ সমর্থক। ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ১১ প্রার্থীর মধ্যে চারজন আওয়ামী লীগ সমর্থক।

অন্যদিকে বিএনপি কাউন্সিলর প্রার্থী নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে ধানের শীষের মেয়র প্রার্থীর পক্ষে জোর প্রচার চালাচ্ছে। বিএনপির মেয়র প্রার্থী কাওছার জামান বাবলা জানান, ওয়ার্ডের নেতাকর্মীরা সবাই ধানের শীষের পক্ষে কাজ করছে।

শেষ পর্যন্ত থাকতে চায় বিএনপি : রংপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হওয়ার ব্যাপারে আশঙ্কা থাকলেও বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকতে চায় বলে জানিয়েছেন দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ইকবাল হাসান টুকু। তিনি বলেন, ‘আমরা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকতে চাই। নির্বাচনে অংশ নিয়ে দেখতে চাই সরকারের ভাবমূর্তি।’

গতকাল রবিবার দুপুরে নগরের গ্র্যান্ড হোটেল মোড়ে অবস্থিত বিএনপি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন টুকু। তিনি আরো বলেন, ‘নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড এখনো হয়নি। আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থীরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশন তাদের কিছুই বলে না। অথচ আমাদের প্রার্থী হোটেলে বসে চা পান করলেও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ করা হয়।’

ইকবাল হাসান টুকু অভিযোগ করে বলেন, ‘বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে আমাদের পোলিং এজেন্ট যারা থাকবে, তাদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে, হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আওয়ামী লীগের লোকজন বলছে, ১০টা ভোট পেলেও তারা জয়ী হবে।’

রংপুর সিটি নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিক, তা সরকার প্রথম থেকে চাচ্ছিল না—এমন দাবি করে দলটির নেতা ইকবাল হাসান টুকু বলেন, কাওছার জামান বাবলাকে মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়ার পর তাঁকে ঋণখেলাপি বলে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একক দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ফাঁকা মাঠে গোল দিতে চেয়েছিল; কিন্তু সে সুযোগ দেওয়া হবে না।’

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক, বিএনপির রংপুর বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু, বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী কাওছার জামান বাবলসহ দলের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিল।

আবারও প্রমাণিত হবে রংপুর এরশাদের ঘাঁটি : জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী গোলাম মোহাম্মদ কাদের গত শনিবার রাতে রংপুরে এসেছেন। গতকাল তিনি নগরীর বিভিন্ন এলাকায় লাঙ্গল প্রতীকের মেয়র প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার পক্ষে গণসংযোগ করেন। রংপুর মেডিক্যাল মোড়ে গণসংযোগকালে তিনি বলেন, ‘রংপুরের মাটি এরশাদের ঘাঁটি। আগামী ২১ ডিসেম্বর রংপুর সিটির নির্বাচনে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে আবারও তা প্রমাণিত হবে।’

গত শনিবার রাতে রংপুরে পৌঁছে গোলাম মোহাম্মদ কাদের নগরীর আনছারীর মোড়, আজিজনগর, সুলতান মোড়, সিগারেট কম্পানি ও কামারপাড়া এলাকায় পৃথক নির্বাচনী পথসভায় যোগ দেন। এ সময় তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর বিষয়ে নির্বাচনী আচরণবিধি নমনীয় হলেও অন্য প্রার্থীদের বেলায় তা কড়াকড়ি করা হচ্ছে। আমরা নির্বাচন কমিশনের এই দ্বৈত নীতির প্রতিবাদ জানিয়েছি। নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে উদ্যোগ না নিলে সুষ্ঠু নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হবে।’

 


মন্তব্য