kalerkantho


ডিএনসিসি উপনির্বাচন

ইসি আজ অবস্থান স্পষ্ট করবে

কাজী হাফিজ   

১৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ইসি আজ অবস্থান স্পষ্ট করবে

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র পদে উপনির্বাচন এবং সম্প্রতি যোগ হওয়া ১৮টি ওয়ার্ডের ১৮টি সাধারণ ও তিনটি সংরক্ষিত নারী আসনের কাউন্সিলর পদে নির্বাচনের বিষয়ে আজ রবিবারেই নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অবস্থান স্পষ্ট হবে বলে জানা গেছে।  একই সঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নতুন ১৮টি ওয়ার্ডেও সাধারণ ও সংরক্ষিত আসনে কাউন্সিলর পদে নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্তের কথা জানাতে পারে ইসি। 

কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের ধারণা, এই নির্বাচনের আয়োজন করা নিয়ে আইনগত কোনো জটিলতা নেই।  বরং যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে এ মাসেই অথবা আগামী মাসের প্রথম দিকে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে। এর পরও কোনো জটিলতা দেখা দিলে তা নিরসনের দায়িত্ব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের।

ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আজ (রবিবার) কমিশন সভায় এ নির্বাচন বিষয়ে কমিশনের অবস্থান স্পষ্ট হবে। সভায় ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হলে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার তারিখ নির্ধারণেরও  সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহের কোনো একটি দিন নির্ধারণ করা হতে পারে। এ নির্বাচনের জন্য ইসি সচিবালয় এসএসসি পরীক্ষার সময়সূচিও বিবেচনায় নেবে। আগামী ১ থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। সে হিসাবে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে পরীক্ষা শেষ হবে। 

ইসি সূত্র বলছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) খান মো. নুরুল হুদা একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে যোগ দিতে গত মঙ্গলবার শ্রীলঙ্কা যাওয়ার আগে সোমবার এ বিষয়ে সভার কার্যপত্র প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়ে যান। ওই দিন সিইসির সভাপতিত্বে এ বিষয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠকও হয়েছে।

সিইসির ওই নির্দেশ অনুসারে এরই মধ্যে তৈরি করা হয়েছে রবিবারের সভার কার্যপত্র। এতে ডিএনসিসি নির্বাচনসংক্রান্ত বিধি-বিধানসহ সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত সংযুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে যুক্ত নতুন ওয়ার্ডগুলোর সীমানা এরই মধ্যে পুনর্বিন্যস্ত করা হয়েছে। এসব ওয়ার্ডের  ভোটার তালিকার হালনাগাদের সব তথ্যও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। চলতি সপ্তাহে সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র যাচাই, ভোটার তালিকা যাচাই প্রতিবেদন কমিশনকে দেওয়া হবে। এদিকে সিইসি শ্রীলঙ্কা থেকে গত শুক্রবার দেশে ফিরছেন।

আজকের সভার আলোচ্যসূচির বিষয়ে ইসির উপসচিব (সংস্থাপন) মো. শাহেদুন্নবী স্বাক্ষরিত নোটিশে বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়রের শূন্য পদে নির্বাচন; সেই সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সম্প্রসারিত অংশে নতুন গঠিত ওয়ার্ডগুলোয় নির্বাচন নিয়ে আলোচনা।

ইসির ভারপ্রাপ্ত সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান, রবিবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নিয়ে কমিশন সভায় প্রাথমিক আলোচনা হবে। এই আলোচনা শেষে রবিবারই তফসিল ঘোষণার সিদ্ধান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা হতে পারে জানুয়ারির প্রথম দিকে। 

এর আগে গত রবিবার হেলালুদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের জানান, ডিএনসিসির মেয়র পদে উপনির্বাচন নিয়ে আইনি জটিলতা নেই। তা ছাড়া এই সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত হওয়া ১৮টি ওয়ার্ডে নির্বাচন করার জন্য এরই মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ ইসিকে অনুরোধ করেছে। সে ক্ষেত্রে এ নির্বাচন করতে আর কোনো জটিলতা নেই। তবে একই সঙ্গে এই নির্বাচন হবে নাকি শুধু উপনির্বাচন হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইন খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনার মাহাবুব তালুকদারের কাছে জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রবিবারেই এ নির্বাচন সম্পর্কে কমিশনের সিদ্ধান্ত আপনারা জানতে পারবেন।’

এদিকে ইসি সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, এ নির্বাচনে আইনগত যে জটিলতা রয়েছে তা নিরসন করতে খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়। জটিলতা হচ্ছে নতুন ওয়ার্ডগুলোর কাউন্সিলর নির্বাচন হলে নির্বাচিতদের মেয়াদ কত দিন হবে তা নিয়ে। সাধারণত এ ধরনের সাধারণ নির্বাচন হয় পাঁচ বছর মেয়াদের জন্য। কিন্তু বর্তমান ডিএনসিসি ও ডিএসসিসির মেয়াদ রয়েছে আড়াই বছরের মতো।

আর সিটি করপোরেশন আইনের ৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘সিটি করপোরেশনের মেয়াদ উহা গঠিত হওয়ার পর উহার প্রথম সভা হইতে পাঁচ বছর।’ ২০১৫ সালের  ১৪  মে ডিএনসিসির প্রথম সভা হয়। সে হিসাবে বর্তমান ডিএনসিসির মেয়াদ  ২০২০ সালের ১৩ মে পর্যন্ত।

তবে নির্বাচন কমিশনাররা মনে করছেন, নতুন ওয়ার্ডগুলোর কাউন্সিলররা ডিএনসিসি ও ডিএসসিসির  বর্তমান মেয়াদের জন্যই নির্বাচিত হবেন। তাঁদের মেয়াদ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ই ঠিক করে দেবে। বিষয়টি নিয়ে ইসির চিন্তা-ভাবনার কোনো কারণ নেই।

ইসি সচিবালয় সূত্র আরো জানায়, নির্বাচন কমিশনের আইন শাখা ডিএনসিসির নতুন ১৮টি ওয়ার্ড বাদ রেখে আগের ৩৬টি ওয়ার্ডের মধ্যেই মেয়র পদের উপনির্বাচনের সম্ভাব্যতা যাচাই করে। কিন্তু স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন-এর ৪ (২) ধারায় বলা আছে, ‘কোনো এলাকা সিটি করপোরেশনের এলাকার অন্তর্ভুক্ত করা হলে এই আইন, বিধি, প্রবিধান এবং এই আইনের সব আদেশ-নির্দেশ, ক্ষমতা উক্ত এলাকার জন্য প্রযোজ্য হবে।’ এই বিধানের কারণে নতুন ১৮টি ওয়ার্ড বাদ রেখে উপনির্বাচনের সুযোগ নেই। তা ছাড়া এসব ওয়ার্ডের নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে।

তবে ইসি সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনে কোনো সিটি করপোরেশনে নতুন ওয়ার্ড যোগ হলে সে ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে নির্বাচন ও তাঁদের মেয়াদ সম্পর্কে স্পষ্ট বিধান সংযোজন করা দরকার।

প্রসঙ্গত, গত জুলাই মাসে ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশনে নতুন করে যুক্ত হওয়া ১৬টি ইউনিয়নের সমন্বয়ে ৩৬টি ওয়ার্ড গঠন করে সরকার। এ নিয়ে দুই সিটি করপোরেশনে মোট ওয়ার্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৯টি। এ বিষয়ে গত ২৬ জুলাই স্থানীয় সরকার বিভাগ নতুন এসব ওয়ার্ড গঠনের গেজেট জারি করে। এতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পুরনো ৩৬টির সঙ্গে নতুন করে ১৮টি ওয়ার্ড যোগ হওয়ায় ওয়ার্ডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪টি। আর দক্ষিণ সিটির ওয়ার্ড সংখ্যা ৫৭টি থেকে বেড়ে হয়েছে ৭৫টি।

ওয়ার্ড গঠনের আগে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার) গত ৯ মে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে নতুন করে মোট ১৬টি ইউনিয়ন যুক্ত করার প্রস্তাব অনুমোদন করে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে যুক্ত বাড্ডা, ভাটারা, সাঁতারকুল, বেরাইদ, ডুমনি, উত্তরখান, দক্ষিণখান ও হরিরামপুর ইউনিয়নকে ৩৭  থেকে ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে।

ডিএনসিসির মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুতে ডিএনসিসির মেয়র পদ শূন্য হয়েছে গত ৩০ নভেম্বর থেকে। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে গত ৪ ডিসেম্বর এ বিষয়ে গেজেট জারি করা হয়। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনের ১৫ (ঙ) ধারা অনুসারে সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিনের আগে মেয়র বা কাউন্সিলরের পদ শূন্য হলে শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। সেই হিসাবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় রয়েছে মেয়রের শূন্য পদে উপনির্বাচনের। ওই সময়ের মধ্যে নির্বাচন করতে হলে এ মাসে অথবা আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেই ইসিকে নির্বাচনের তফসিল  ঘোষণা করতে হবে। কিন্তু তাতে এবারের হালনাগাদে যারা নতুন ভোটার হতে যাচ্ছে তারা ওই নির্বাচনে প্রার্থী হতে বা ভোট দিতে পারবে না। কারণ হালনাগাদ ভোটার তালিকা চূড়ান্ত হবে আগামী ৩১ জানুয়ারি।

নির্বাচন কর্মকর্তারা বলছেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বলে বিবেচনা করা হচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটির উপনির্বাচন এবং রংপুর বাদে পাঁচ সিটির ভোট। সংসদ নির্বাচনের আগে জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের মাপকাঠি হিসেবে এসব নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেবে রাজনৈতিক দলগুলো। কেননা ২০১৩ সালে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও গাজীপুর—এই পাঁচ সিটির সর্বশেষ নির্বাচনে জয়লাভ করেন বিএনপির প্রার্থীরা। ২০১৩ সালের ১৫ জুন এক দিনে গাজীপুর বাদে চার সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয়। আর গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয়েছিল ওই বছরের ৬ জুলাই।

 


মন্তব্য