kalerkantho


মিলু হত্যায় অনেক রহস্য

লাশের পাশে অচেনা মোবাইল ফোন, বাইরে জুতা

এস এম আজাদ   

১৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মিলু হত্যায় অনেক রহস্য

মিলু গোমেজ

রাজধানীর মহাখালীর আরজতপাড়ায় বাসার ভেতরে খ্রিস্টান বৃদ্ধা মিলড্রেড গোমেজ মিলু হত্যাকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক রহস্য দেখা দিয়েছে। বৃদ্ধ ও অসুস্থ স্বামী বাসায় থাকা অবস্থায়ই গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় মিলুকে। কে বা কারা, কেন মিলুকে খুন করছে সেই প্রশ্নের জবাব মেলেনি। তবে এই খুনের কয়েকটি আলামত এবং পূর্বাপর ঘটনা থেকে অন্তত ১১টি প্রশ্ন ও রহস্য দেখা দিয়েছে। এসব প্রশ্নের জবাব মিললেই উদ্ঘাটিত হতে পারে চাঞ্চল্যকর হত্যার রহস্য।

গত শুক্রবার রাতেই নিহত মিলুর ভাই হেনরি গোমেজ বাদী হয়ে মামলা করেন কারো নাম উল্লেখ ছাড়াই। পুলিশ মিলুর স্বামী এডওয়ার্ড অনিল গোমেজ ও গৃহকর্মী খুরশি বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দিয়েছে। তবে আটক রাখা হয়েছে কিরণ নামের এক ব্যক্তিকে, যিনি মিলুদের বাসায় বাজার করে দিতেন। আলামত দেখে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে পরিচিত লোকজন। খুনিরা বাসার নিরাপত্তা, বৃদ্ধ অনিলের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতাসহ অনেক কিছুই জানত।

স্বজন ও পুলিশ সূত্রের তথ্য এবং সরেজমিনে গিয়ে পরিদর্শনে জানা গেছে, শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হলেও অনিল গোমেজ বাসার দরজাটি খুলতে ও আটকাতে পারেন। এ কারণে স্বজনরা সন্দেহ করছে, খুনিরা তাঁকে দিয়েই বাসার দরজা আটকে যায়। তবু খুনিদের বাসায় আসা-যাওয়া নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। মিলুকে উত্তর দিকে মাথা রেখে শোয়ানোর পর গলা কেটে শরীরের বিভিন্ন অংশে উপর্যুপরি জখম করা হয়। মিলুর শোবার ঘরের আলমারি তছনছ করা ছিল। তাঁর ঘরে লক্ষাধিক টাকা ও প্রয়োজনীয় দলিলপত্র থাকত। সেসবের কিছু খোয়া গেছে কি না তা বলতে পারছে না ঘনিষ্ঠ কেউ। তবে ধর্মের ভাই বলে পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি পুলিশের কাছে একটি ব্রিফকেস দিয়েছে, যেখানে কিছু নথিপত্র আছে। খ্রিস্টান ও প্রতিবেশী ওই ব্যক্তি দাবি করেন, মিলু তাঁর কাছে আমানত হিসেবে ব্রিফকেসটি রেখেছিলেন। তবে নিকটাত্মীয়রা এ ব্যাপারে কিছুই জানে না।

মিলুর লাশের পাশ থেকে লাল রঙের একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করেছে পুলিশ। তবে ওই ফোন মিলুর নয় বলে নিশ্চিত করেছে স্বজনরা। মিলুর মোবাইল ফোনটির হদিস মিলছে না। তাঁদের বাসার সামনে থেকে উদ্ধার করা দুই জোড়া জুতার ব্যাপারেও কিছু বলতে পারছে না কেউ।

মিলুদের বাড়ির ভেতরে প্রতিদিনই মাদকের আড্ডা বসানো বখাটেদের সন্দেহ করছে স্থানীয় বাসিন্দারা। বাড়ির ভাড়াটিয়ারা বলে, বখাটেরা সিঁড়িতে বসে ইয়াবা সেবন করলেও ভয়ে তাদের কিছুই বলতেন না মিলু। তবে টাকা লুটের জন্য মাদকাসক্তরা তাঁকে খুন করতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিহত মিলুর নামে গ্রিন রোডে দুটি ফ্ল্যাটসহ কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি আছে। ছেলেরা তাঁকে বিদেশে চলে যেতে বললেও স্বজন ও দেশের মায়া ছেড়ে তিনি যেতে চাইছিলেন না। স্বামী অনিল স্ত্রীকে ছাড়া অচল। মিলু না থাকলে তাদের এই সম্পত্তিতে থাকার কেউ নেই। এ কারণেও পরিকল্পিতভাবে মিলুকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছে স্বজনরা।

এদিকে মিলু ও তাঁর স্বামী যখন কানাডায় ছেলেদের কাছে থাকতেন তখন জয়নাল মিয়া নামে এক ভাড়াটিয়া তাঁদের বাসায় থাকতেন এবং ভাড়া তুলতেন। গত ৩০ জুলাই হঠাৎ করেই দেশে ফেরেন তাঁরা। এরপর তিন দিনের নোটিশে জয়নালকে বাসা ছেড়ে দিতে হয়। আগামী ১ জানুয়ারি নিচতলায় এক ভাড়াটিয়াকে সরিয়ে জয়নালকে বাসায় তোলার কথা ছিল। এ ছাড়া আব্দুর রউফ সবুজ নামে এক ভাড়াটিয়ার সঙ্গে মিলুর লেনদেন নিয়ে বিরোধ হয়। মিলুর দাবি ছিল, সবুজ এক বছর ধরে তাঁকে ভাড়া দেয়নি। সবুজের দাবি, ভাড়া দিলেও মিলু তা ভুলে গেছেন। এ নিয়ে সালিস-বৈঠকও হয়। ১ জানুয়ারি থেকে সবুজকে বাসা ছাড়ার নোটিশ দেন মিলু। বাড়ির কোনো বিষয় নিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে কি না তাও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছে স্বজনরা।

গতকাল দুপুরে আরজতপাড়ার ৩৮/এইচ নম্বর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, মিলুর বোন শেলি গোমেজ বৃদ্ধ অনিলকে খাবার খেতে দিয়েছেন। খেতে বসেই অনিলের প্রশ্ন, ‘মিল, মিলু কোথায়?’ পাশে থাকা এক স্বজন তখন তাঁকে বলেন, ‘মিলু হাসপাতালে আছে। আপনি খান।’

খাওয়া শেষে স্বজনদের সহায়তায় অনিলকে দরজা আটকাতে অনুরোধ করা হলে তিনি কেঁপে কেঁপে ছোট করে পা ফেলে দরজার কাছে যান এবং ছিটকিনি বন্ধ করেন। এরপর খুলতে বললে তিনি ছিটকিনি খুলে দেন। এভাবেই কেউ দরজা আটকাতে বলেছিল কি না জানতে চাইলে তিনি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন। তখন পাশে থাকা স্বজনরা বলে, তিনি গত কয়েক বছর ধরেই কথায় সায় দেন এবং তাত্ক্ষণিক কিছু করতে পারেন। তবে মনে করে বা বুদ্ধি খাটিয়ে কিছু করতে পারেন না। 

নিহত মিলুর বোন নিলু ও শেলি গোমেজ এবং ভাই হেনরী ও হেরাল্ড গমেজ জানান, গৃহকর্মী খুরশি ও অনিলের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ তাঁদের বাসায় যাওয়ার অনুমতি দেয়। তবে জিজ্ঞাসাবাদে কোনো কথাই গুছিয়ে বলতে পারেননি অনিল। এরপর পার্শ্ববর্তী একটি বাড়ির কেয়ারটেকার কিরণকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে পুলিশ। কিরণ মিলুর বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন। তিনি মিলুকে বাজার করে দিতেন।

মামলার বাদী হেনরী গোমেজ বলেন, ‘বাসা থেকে কী খোয়া গেছে তা বুঝতে পারছি না। আমার বোন আমাদের সঙ্গে কিছু আলাপ করত না। তবে পাসপোর্ট পুলিশের কাছে আছে। শুক্রবার রাতে থানায় একটা ব্রিফকেস দেখেছি। এখানকার এক খ্রিস্টান ব্যক্তি নাকি দিয়েছে। দিদি (মিলু) ওনাকে নাকি ধর্মের ভাই বলে সেটি রাখতে দিয়েছে। আমরা এসব জানি না। ওই ব্রিফকেসে কাগজপত্র নাকি আছে। সব পুলিশের কাছে।’ ওই ব্যক্তির পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, মিলুর ছোট ছেলে মজেশের বন্ধু ভিক্টোর পরিচয় বলতে পারবে। আটক কিরণ ভিক্টোরেরই চাচা।

তবে গতকাল সন্ধ্যায় যোগাযোগ করা হলে ভিক্টোর বলেন, ব্রিফকেস ও আটকের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

তেজগাঁও থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ঘটনার রহস্য এখনো জানা যায়নি। আমরা চেষ্টা করছি। কিরণকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছে।’

মিলুর চার ভাই-বোনের কাছে জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, তিনতলা বাড়িসহ জায়গাটি কার নামে তাঁরা জানেন না। তবে ধারণা করছেন, অনিলের নামেই এই জমি। অনিলের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বলেন, মিলুর নামে। পরে আবার বলেন, ‘আমার নামেও হতে পারে!’

স্বজনরা জানায়, মার্কিন দূতাবাসের খাদ্য সরবরাহ বিভাগের ব্যবস্থাপক অনিল আরজতপাড়ায় বাড়ি নির্মাণ ছাড়াও নবাবগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে কিছু সম্পত্তি করেছেন। তবে মিলুর সম্পদের পরিমাণই বেশি। তাঁর মামা স্টেনলি টেনু গোমেজ নিঃসন্তান ছিলেন। তিনি ৭৯ গ্রিন রোডের বাড়িটি মিলুকে দলিল করে দিয়ে যান। তাঁর দেওয়া শর্ত অনুযায়ী, মিলু ওই বাড়ির চারটি ফ্ল্যাট চার ভাইকে দিয়েছেন। চার ভাই সেখানেই থাকেন। তবে মিলু নিয়েছেন দুটি ফ্ল্যাট। ২০০৯ সালে মামার মৃত্যুর পর সব সম্পত্তি তাঁরা ভাগ করে নিয়েছেন। ভাইদের ফ্ল্যাট দেওয়ার কারণে গাজীপুরের কালীগঞ্জের পাউড়ানে ৩৭ শতাংশ জমি মিলুকে বেশি দিয়ে যান তাঁর মামা। গ্রিন রোডের ফ্ল্যাটের ভাড়া ছোট ভাই হেনরী উঠিয়ে বোনকে দিতেন। তবে সব বিষয়ই তদারকি করতেন মিলু। নিহত হওয়ার আগের দিনও তিনি কালীগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে যান বলে জানায় স্বজনরা। তাদের দাবি, জমি নিয়ে কোনো ঝামেলা ছিল না। মিলু নিহত হলেও তাঁর চার ছেলে আছেন। তাঁরা এসব সম্পত্তি পাবেন। ফলে তাঁকে টার্গেট করার কারণ নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আত্মীয় অবশ্য বলেন, ‘আরজতপাড়ায় এই জায়গাটি নিয়ে সন্দেহ হচ্ছে। বাইরের প্রভাবশালী কেউ দখল করতে এটি করে থাকতে পারে বলে আমরা সন্দেহ করছি।’

মাদকসেবীদের ব্যাপারে ভাড়াটিয়া ও স্বজনরা বলে, মাদকের আড্ডায় থাকে এমন কয়েকজন আছে যাদের বাসায় ডেকে চকোলেট দিয়েছেন মিলু। অনেক সময় তারা বাসায় ব্যাগও পৌঁছে দিয়েছে। মিলু ঝামেলা না করলেও পুলিশ এখানে অভিযান চালিয়েছে। এ কারণে বা বাসায় ঢুকে টাকা নিতে গিয়ে খুন করা হয়ে থাকতে পারে।

স্বজনরা জানায়, বাড়ি থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা ভাড়া ওঠে। দুই ফ্ল্যাটের ভাড়া ৩৬ হাজার টাকা। জমি থেকেও আয় আসে। এসব টাকার মধ্যে একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ছোট ছেলেকে পাঠাতেন মিলু। বাকি টাকা ব্যাংকে রাখতেন। তবে বাসার মধ্যে সব সময়ই লক্ষাধিক টাকা থাকত বলে ধারণা সবার।

হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ফারুক-উল-ইসলাম গতকাল বিকেলে মিলুদের বাসায় গিয়ে স্বজনদের একটি মোবাইল ফোন দেখিয়ে জানান, ফোনটি ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা হয়েছে। ভেতরে এয়ারটেল নম্বরের সিম থাকলেও ফোনটি অচল। সেই ফোনটি কেউ চেনে না। স্বজনরা জানায়, মিলু যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতেন, সেটি অন্য রঙের। ওই ফোনটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

স্বজন ও বাড়ির বাসিন্দা অন্তত ১০ জন জানায়, তারা শুক্রবার সকালে দুই জোড়া জুতা দরজার কাছে দেখে, যে জুতা আগে কখনোই দেখা যায়নি। ওই জুতা পুলিশ জব্দ করলেও সে বিষয়ে কিছু জানায়নি।

বাড়ির দোতলার ভাড়াটিয়া স্বপন ফকির জানান, বাড়িতে কখনো বড় কোনো ঝামেলা দেখেননি তিনি। নিচতলার ভাড়াটিয়া আব্দুর রউফ সবুজ বলেন, ‘ভাড়া নিয়ে কোনো ঝামেলা ছিল না। আমি ভাড়া দিয়েছিলাম। আন্টি ভুলে যান। পরে বললে তিনি মেনে নিয়েছেন। এই ৭ তারিখে আমি ডিসেম্বর মাসের ভাড়া দিয়েছি।’

বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হেমন্ত আই কোড়াইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যে বা যারা এই খুনে জড়িত থাক না কেন, আমরা চাই এর বিচার হোক। আমরা আশা করব বড় দিনের আগেই এই নৃশংস খুনের রহস্য উদ্ঘাটিত হবে।’

স্বজনরা জানায়, মিলুর চার ছেলের মধ্যে বড় দুজন স্ট্যানলি গোমেজ ও রবার্ট ক্লাইভ গোমেজ আজ রবিবার দেশে আসছেন। তাঁরা কানাডা থেকে এলেই লাশ সমাহিত করাসহ অন্যান্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। ময়নাতদন্ত শেষে মিলুর লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গের হিমাগারে রাখা হয়েছে।


মন্তব্য