kalerkantho


ডিএনসিসি উপনির্বাচন

ঘুরেফিরে আসছে যাঁদের নাম

শফিক সাফি ও তৈমুর ফারুক তুষার   

১৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ঘুরেফিরে আসছে যাঁদের নাম

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র পদে উপনির্বাচনের তারিখ ঠিক না হলেও কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে সে বিষয়ে সংক্ষিপ্ত তালিকা এগিয়ে এনেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে এ সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে একজনকে মনোনয়ন দেওয়া হবে। দুই দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা কালের কণ্ঠকে এমনটা জানিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের তালিকায় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের স্ত্রী রুবানা হক এবং ব্যবসায়ী এ কে আজাদ দলের নীতিনির্ধারকদের কাছে এগিয়ে আছেন। আর বিএনপির প্রার্থী হিসেবে গত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল অনেকটা নিশ্চিত। তবে আওয়ামী লীগ ‘হেভিওয়েট’ কোনো প্রার্থী দিলে তাবিথের পরিবর্তে তাঁর বাবা, দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুকেও বিএনপি মনোনয়ন দিতে পারে বলে জানা গেছে।

আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো জানায়, সম্প্রতি কম্বোডিয়া সফর থেকে দেশে ফেরার পর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গণভবনে দলের জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতার সঙ্গে ডিএনসিসি নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়ে কথা বলেন। তিনি যোগ্যতাসম্পন্ন তিন-চারজন প্রার্থীর একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা (শর্ট লিস্ট) করতে বলেছেন।

 

আওয়ামী লীগ সভাপতির নির্দেশনা অনুযায়ী দলের স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতা প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ করছেন বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়ে আমাদের মধ্যে একটি আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে নেত্রীর সিদ্ধান্ত হলো—প্রথমে আমরা দেখব কারা কারা প্রার্থী। এরপর কয়েকজন প্রকৃত প্রার্থী খুঁজে বের করা। কারণ প্রার্থী তো অনেকেই আছেন; কিন্তু তাঁদের মধ্যে আসল প্রার্থী কজন সেটা দেখব।’

তবে ওই বোর্ডের সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রার্থী বাছাইয়ে আমাদের পর্যায়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি।’

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে ইতিমধ্যে একাধিক রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী তত্পর হয়েছেন। তবে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ে কয়েকজনকে নিয়ে আলোচনা চলছে। তাঁদের মধ্যে আছেন—প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের স্ত্রী রুবানা হক ও ছেলে নাভিদুল হক, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম রহমতুল্লাহ্ ও সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান, সাবেক প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সাবেক সদস্য আলাউদ্দিন চৌধুরী নাসিম, সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী, ব্যবসায়ী এ কে আজাদসহ বেশ কয়েকজন।

তবে দলীয় সূত্র জানায়, মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রুবানা হক এবং এ কে আজাদ আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের কাছে এগিয়ে আছেন। এ কে আজাদ এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর বেশ কয়েকজন সদস্য চাইছেন এ কে আজাদকে মনোনয়ন দেওয়া হোক।

কে মনোনয়ন পেতে পারেন—জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য মুহম্মদ ফারুক খান বলেন, ‘আমরা এমন একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেব, যিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে আনিসুল হক যে উন্নয়নের সূচনা করেছেন তা এগিয়ে নিতে সক্ষম হবেন। এই সক্ষমতার ওপর আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। আমরা খুবই আশাবাদী এ উপনির্বাচনে জয়লাভ করব। সে জন্য জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য একজন প্রার্থীকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে।’

কে হচ্ছেন বিএনপির প্রার্থী : মনোনয়ন পেতে বিএনপির আগ্রহী প্রার্থীদেরও দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। অনেকে নিজে অথবা পরিবারের সদস্যকে দিয়ে, আবার অনেকে আস্থাভাজন সিনিয়র নেতাদের দিয়ে তদবির করছেন বলে জানা গেছে। গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে এবং লন্ডনে তারেক রহমানের কাছে তদবির শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডিএনসিসি নির্বাচন নিয়ে দলের চেয়ারপারসনসহ সিনিয়র নেতারা আলোচনা করেছেন। আলোচনা হলেও সুনির্দিষ্ট কোনো প্রার্থী নিয়ে আলোচনা হয়নি। কারণ আমরা এখনো সংশয়ে আছি এই নির্বাচন সঠিক সময়ে হবে কি না।’

স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘ধানের শীষ কার হাতে যাবে সেটা নির্ভর করছে চেয়ারপারসনের ওপর। আমরা আলোচনা করেছি, গতবারের মতো যোগ্য প্রার্থীই থাকবে।’

তবে গত বুধবার রাতে গুলশান কার্যালয়ে দলের চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করেছেন গত নির্বাচনের প্রার্থী, দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল। খালেদা জিয়া তাঁকে গতবারের মতো কাজ করে যেতে, প্রস্তুতি নিতে বলেছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।

তা ছাড়া ডিএনসিসি মেয়র পদ শূন্য ঘোষণা করে গত ৪ ডিসেম্বর গেজেট প্রকাশ হওয়ার পর এখন পর্যন্ত তাবিথ আউয়ালের বাবা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, দলের সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) কামরুল ইসলাম, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) সভাপতি আন্দালিব রহমান পার্থ গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে বিএনপি প্রধানের সঙ্গে দেখা করেছেন।

এদিকে গত রবিবার রাতে গুলশানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ডিএনসিসি নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। তাতে সম্ভাব্য পাঁচ নেতার নাম এসেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকতউল্লা বুলু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মেজর (অব.) কামরুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সভাপতি এম এ কাইয়ুম ও গত নির্বাচনের প্রার্থী তাবিথ আউয়াল। আর ২০ দলীয় জোটের শরিক বিজেপি নেতা আন্দালিব রহমান পার্থও রয়েছেন আলোচনায়।

বিএনপি সূত্র বলছে, সাবেক চারদলীয় জোট সরকারের বাণিজ্য উপদেষ্টা বরকতউল্লা বুলু সফল রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। তবে তাঁর প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীরা বলছে—রাজধানীর রাজনীতির সঙ্গে তাঁর তেমন সংশ্লিষ্টতা নেই। গুলশান, বাড্ডা, ক্যান্টনমেন্টসহ উত্তরের বিএনপির একটি অংশ সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) কামরুল ইসলামকে চাইলেও সংস্কারপন্থী হওয়ায় তাঁর বিরোধিতা করছে আরেক পক্ষ। ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সভাপতি এম কাইয়ুম মনোনয়ন পাওয়ার দাবিদার হলেও রাজনৈতিক একটি মামলায় তাঁর দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ কারণে দলের অনেকে তাঁকে নিয়ে ভাবতে পারছে না।

আর গত নির্বাচনে বিএনপির ব্যানারে নির্বাচন করা তাবিথ আউয়াল আবারও নির্বাচনে অংশ নিন—এমন আশা দলের অনেকের। তবে সম্প্রতি আর্থিক কেলেঙ্কারি নিয়ে আন্তর্জাতিক ডাটাবেইস প্যারাডাইস পেপারসে নাম আসায় তাঁকে মনোনয়ন দেওয়ার ব্যাপারে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যেতে পারছেন না দলের শীর্ষ নেতৃত্ব।

আবার বিএনপির বাইরে, বিশেষ করে ২০ দলীয় জোটের শরিক বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থকে মনোনয়ন দেওয়া হোক সেটা চাচ্ছে না বিএনপি নেতাকর্মীরা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আগে প্রার্থী চূড়ান্ত করুক, এরপর আমাদেরটা চূড়ান্ত হবে। এখানে সমস্যা বা সংকটের কিছু নেই। প্রার্থী নির্ধারণে কিছু কৌশল থাকে। এই কৌশলের আগে অনেকের নামই আলোচনায় আসতে পারে।’

বিএনপি কাকে প্রার্থী করবে—এমন প্রশ্নের জবাবে মাহবুবুর রহমান বলন, ‘আগের প্রার্থীও থাকতে পারেন, আবার পরিস্থিতির কারণে নতুন কেউ আসতে পারেন। নিশ্চয়ই যাঁকে দিলে বিজয়ী হওয়া যাবে সেই সিদ্ধান্তই নেওয়া হবে।’

তবে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব পর্যায়ের এক নেতা কালের কণ্ঠকে জানান, জোটের এক শীর্ষ নেতা গত সপ্তাহে দলের চেয়ারপারসনের সঙ্গে দেখা করে ডিএনসিসি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। জবাবে বিএনপি চেয়ারপারসন তাঁকে জানিয়েছেন, জোট থেকে কে প্রার্থী হচ্ছেন তা ঠিক করা আছে। ওই প্রার্থীর বিষয়ে শীর্ষ নেতা জানতে চাইলে বেগম জিয়া তাঁকে নির্বাচনের সময় হলেই নাম ঘোষণা করা হবে বলে জানান।

বিএনপির ওই নেতা আরো জানান, আগে যে নির্বাচন করেছেন এখন পর্যন্ত তাঁকে নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন দলের হাইকমান্ড। তবে আওয়ামী লীগ হেভিওয়েট কোনো প্রার্থী দিলে সে ক্ষেত্রে বিএনপি নতুন করে চিন্তা করবে। এক প্রশ্নের জবাবে ওই নেতা বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর মতো প্রার্থীর বিষয়ে বিএনপি চিন্তা করবে।’

প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালের এপ্রিলের নির্বাচনে ২৩ লাখ ভোটের মধ্যে চার লাখ ৬০ হাজার ১১৭ ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন আনিসুল হক। ভোট শুরুর তিন ঘণ্টা পর সরে দাঁড়ালেও তাবিথ আউয়াল পেয়েছিলেন তিন লাখ ২৫ হাজার ৮০ ভোট।

প্রায় দুই বছর ধরে ওই দায়িত্ব পালনের মধ্যে গত জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন মেয়র আনিসুল হক। সেরিব্রাল ভাস্কুলাইটিসে আক্রান্ত আনিসুল হক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩০ নভেম্বর মারা যান। সে অনুযায়ী আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচনের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন।

মনোনয়ন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এ কে আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ আছে। নেত্রী (শেখ হাসিনা) আমাকে মনোনয়ন দিলে অবশ্যই নির্বাচন করব।’



মন্তব্য