kalerkantho


স্বপ্ন ধ্যান প্রাণ চট্টগ্রাম

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



স্বপ্ন ধ্যান প্রাণ চট্টগ্রাম

দেশ স্বাধীনের আগে-পরে গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে তাঁর ছিল অগ্রণী ভূমিকা। স্থানীয় ও জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে তিনি চট্টগ্রামবাসীর সবচেয়ে ভরসাস্থল ছিলেন। দীর্ঘ পাঁচ দশকের রাজনৈতিকজীবনে তিনি কখনো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির পাশাপাশি দলের নীতি, আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।

মন্ত্রী-এমপি না হলেও জনগণের সুখে-দুঃখে, সংকটে, দুরবস্থায় তিনি সব সময় পাশে থেকে সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। তিনি আর কেউ নন, সদ্য প্রয়াত এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী।

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের অসংখ্য মরদেহ উপকূলীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। তখন তিনি নিজেই অনেকের মরদেহ কাঁধে নিয়ে দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করেছেন। বন্দরটিলা ট্র্যাজেডিসহ অনেক দুর্যোগ-দুর্বিপাকে তিনি একাই ছুটে গেছেন মানুষের পাশে এবং অনেক পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান এই নেতাকে হারিয়ে শোকার্ত সব শ্রেণি-পেশার মানুষ তাদের প্রিয় নেতার এসব কীর্তি এখন স্মরণ করছে বেদনার্ত চিত্তে। তারা বলছে, মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুতে চট্টগ্রামবাসী তাদের অভিভাবককে হারাল এবং এই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়।

প্রয়াত এ নেতা সম্পর্কে দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি গতকাল শুক্রবার দুপুরে মহিউদ্দিনের বাসভবনে সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর হৃদয়জুড়ে, অন্তরজুড়ে শুধুই চট্টগ্রাম, এই মাটি ও মানুষকে ভালোবাসতেন। আজকে চট্টগ্রামে যে বাঁধভাঙা শোকাতুর মানুষ দেখছি, সেটা থেকেই বোঝা যায় তাঁর প্রতি মানুষের ভালোবাসা কতটা প্রকট। চট্টগ্রাম মহিউদ্দিন চৌধুরীর, মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামের।’ ওবায়দুল কাদের আরো বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা মহিউদ্দিন চৌধুরীকে মন্ত্রী হতে বলেছিলেন, তিনি রাজি হননি। আমাদের নেত্রী তাঁকে প্রেসিডিয়াম সদস্য হতে বলেছিলেন, তিনি রাজি হননি। তিনি বলতেন, আমার স্বপ্ন, আমার ধ্যান, আমার প্রাণ, আমার সব কিছুই হচ্ছে চট্টগ্রাম। চট্টগ্রামের বাইরের নেতা হওয়ার আমার কোনো স্বপ্ন নেই। এবং বারবার নেত্রী তাঁকে বলেছেন, সেই অনুরোধ তিনি রাখেননি।’

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, ‘অবহেলিত চট্টগ্রামের কাণ্ডারি ছিলেন এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তাঁর হাত ধরেই চট্টগ্রামের মানুষের প্রত্যাশা অনেকাংশে পূরণ হয়েছে। তিনি জীবন বাজি রেখে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য প্রাণপণ লড়াই করে ইতিহাসে কিংবদন্তি হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন।’

দলীয় নেতারা তাঁর মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলছেন, মহিউদ্দিন চৌধুরী গত প্রায় ৫০ বছরে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সামনে থাকার কারণে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তিনি চট্টগ্রামে ছিলেন, চট্টগ্রামের ছিলেন; কিন্তু তাঁকে চট্টগ্রামবাসী জাতীয় নেতাই মনে করত। মহিউদ্দিন ও চট্টগ্রামের রাজনীতি যেন একসূত্রে বাঁধা। তিনি যেন একটি প্রতিষ্ঠান ছিলেন। চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও মহিউদ্দিনও যেন অভিন্ন সত্তা। চট্টগ্রাম, মহিউদ্দিন, উন্নয়ন ও রাজনীতি, এসব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে—এমনই অভিমত বিশ্লেষকদের। তাদের মতে, দল-মত-নির্বিশেষে সব মানুষের নেতা ছিলেন তিনি। তিন দফায় প্রায় ১৭ বছর মেয়র থাকাকালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে (চসিক) নানা আয়বর্ধক প্রকল্পের মাধ্যমে অনেকটা সচ্ছলতা এনে দিয়েছিলেন মহিউদ্দিন, যা দেশের অন্য কোনো করপোরেশনের মেয়রের বেলায় দেখা যায়নি।

শিক্ষা সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সাবেক মন্ত্রী ডা. আফছারুল আমীন এমপি বলেন, ‘তাঁর রাজনৈতিকজীবন ছিল গণমুখী। পতেঙ্গায় বে-টার্মিনালবিরোধী, ভ্যাটবিরোধী, ঝুলন্ত সেতুবিরোধী, নগরের রানীর দিঘি ভরাটের বিরুদ্ধে—এ রকম অনেক জনস্বার্থমূলক কর্মকাণ্ডে তিনি এগিয়ে গেছেন।’ চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ান বলেন, ‘মহিউদ্দিন চৌধুরী দলের বাইরে গিয়ে গণমুখী সিদ্ধান্ত নিতেন। আরাফাত রহমান কোকোর গায়েবানা জানাজায় মহিউদ্দিন চৌধুরী অংশগ্রহণ করেছিলেন।’ জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ সোলায়মান আলম শেঠ বলেন, ‘বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী চট্টগ্রামের জাতির পিতা।’ চট্টগ্রাম পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আধুনিক চট্টগ্রামের রূপকার হিসেবে মহিউদ্দিন চৌধুরীর নামই প্রথমে আসবে।’

লোকমুখে এখনো শোনা যায়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বর্তমান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে এসে আওয়ামী লীগের মেয়র মহিউদ্দিনের ভূয়সী প্রশংসা করেন। মঞ্চে মহিউদ্দিন না থাকায় খালেদা জিয়া সামনের সারি থেকে মেয়র মহিউদ্দিনকে ডেকে নিয়ে মঞ্চে তোলেন। এমনও গুঞ্জন রয়েছে, ওই সময় ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে চট্টগ্রামে গিয়ে মেয়র মহিউদ্দিনের কাছ থেকে করপোরেশন কিভাবে পরিচালনা করতে হয় তা শেখার জন্য বলেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। হ্যাটট্রিক বিজয়ী মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরী ২০১০ সালের নির্বাচনে হারার আগ পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগরে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিচ্ছন্নতা, বাসস্থান, সড়কসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নমূলক কাজ করে সবার প্রশংসা অর্জন করেছেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে চট্টগ্রামে মহিউদ্দিনই প্রথম সোচ্চার হয়ে ওঠেন। নগরজুড়ে দেয়ালিকা সাঁটেন। সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর প্রথম বছর পূর্তিকে কেন্দ্র করে প্রায় তিন মাস সারা দেশে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড হলেও চট্টগ্রামকে অনেকটা অক্ষত রাখতে সক্ষম হন তিনি। দেশের সবচেয়ে বড় পরিসরে এবং সর্বপ্রথম মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মেলার আয়োজন করেছেন এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। নগরীর আউটার স্টেডিয়ামের বিশাল এলাকাজুড়ে প্রায় ২৯ বছর ধরে হওয়া বিজয় মেলায় এখনো মানুষের ঢল নামে। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর নেতৃত্বে চলেছে মেলা। দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণা করে থাকেন। ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মতিঝিলে হেফাজত তাণ্ডব চালালেও সংগঠনটির দুর্গ চট্টগ্রামে এর বিরুদ্ধে মাঠে ছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী এবং তাঁর দৃঢ় ভূমিকার ফলে হেফাজতের আন্দোলনের সময় বড় ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চট্টগ্রামে হয়নি। এ ছাড়া চট্টগ্রামের রাজনীতিতে সব দলের মধ্যে একটা ভ্রাতৃত্ববোধের সম্পর্ক সৃষ্টির জন্য মহিউদ্দিনের ভূমিকা ছিল বলে অনেকে মনে করেন। মানুষের স্বার্থে তিনি নিজ দলের বিরুদ্ধে কথা বলতে কুণ্ঠা বোধ করেননি বলেও দলীয় নেতারা জানান।

 

 

 



মন্তব্য