kalerkantho


অভিযোগের স্রোত, এক ট্রাইব্যুনালে হিমশিম

এম বদি-উজ-জামান   

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



অভিযোগের স্রোত, এক ট্রাইব্যুনালে হিমশিম

স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ২০১০ সালের ২৫ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। ২০১২ সালে সরকার ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়িয়ে দুটি করেছিল। ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে একটি ট্রাইব্যুনাল অকার্যকর হয়ে পড়ে। সেই থেকে এক ট্রাইব্যুনালেই বিচার হচ্ছে। এ অবস্থায় গত ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত গত আট বছরে মাত্র ৩০টি মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে ট্রাইব্যুনাল থেকে। ট্রাইব্যুনালে ১৮টি মামলা বিচারাধীন। আরো সাতটি মামলা শিগগিরই ট্রাইব্যুনালে দাখিলের অপেক্ষায় রয়েছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার অবশেষে শুরু হওয়ায় দিন দিন মামলার সংখ্যা বাড়ছেই। সূত্র মতে, সাড়ে তিন হাজার ব্যক্তির বিরুদ্ধে এখন ৬৫০টির বেশি অভিযোগ জমা রয়েছে তদন্ত সংস্থার কাছে। মামলা ও অভিযোগের স্তূপ জমার জন্য ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা এবং জনবলের অভাবকেই দূষছেন প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার প্রতিনিধিরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর থেকে এ পর্যন্ত তিন হাজার ৭৫১ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত সংস্থার কাছে ৭২৮টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৫৫টি অভিযোগের তদন্ত সম্পন্ন করতে পেরেছে তদন্ত সংস্থা। এর ফলে মাত্র ২০৪ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ হয়। চলমান ২৯টি অভিযোগে আসামির সংখ্যা ৩৯। এখনো তিন হাজার ৫৪২ জনের বিরুদ্ধে দাখিল হওয়া ৬৬৮টি অভিযোগ তদন্ত সংস্থার হাতে জমা রয়েছে।

তথ্যানুযায়ী ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ১৮ জন প্রসিকিউটর এবং তদন্ত সংস্থায় ১৯ সদস্য কাজ করছেন। প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একটি ট্রাইব্যুনালে এভাবে কাজ চললে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার সম্পন্ন করতে কয়েক শ বছর লেগে যাবে।

তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক আবদুল হান্নান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, একসময় ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা ছিল দুটি। গত আট বছরে সেখানে বিচার সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ৩০টি। এতে বোঝাই যায়, কত ধীরগতিতে বিচার হচ্ছে। তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা যদি বাড়ে, তবে মামলা নিষ্পত্তির হারও বাড়বে। তদন্ত সংস্থার তদন্ত আরো জোরদার হবে।

তদন্ত সংস্থার জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক সানাউল হক বলেন, ৪৬ বছর আগের অভিযোগ। বেশির ভাগ সাক্ষীই মারা গেছে। যারা বেছে আছে তারা বৃদ্ধ বয়সে। তাই অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে তদন্ত কর্মকর্তাদের অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হয়। এ কারণে তদন্তে সময় লাগে। তদন্ত সংস্থার জনবল যদি বাড়ানো যেত, তাহলে আরো অধিকসংখ্যক অভিযোগের তদন্ত সম্পন্ন হতো। ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা কম বলে নিষ্পত্তিও কম হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, এর ফলে তদন্ত সংস্থার সদস্যদের মধ্যে উৎসাহে কিছুটা ভাটা পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ এরই মধ্যে তদন্ত সংস্থা ২৫টি মামলার তদন্ত শেষ করেছে। আরো ২৯টি অভিযোগের তদন্ত শেষ পর্যায়ে।

সানাউল হক আরো বলেন, ‘একসময় বিচার হতো না। তাই মানুষের মনে আশঙ্কা ছিল বিচার আর হবে না। ট্রাইব্যুনাল করার পর ২০১৩ সালে যখন রায় হলো মানুষের মনে ধারণা জন্ম নিল যে বিচার হবে। এর পর থেকে অভিযোগ আসতে শুরু করল। এখন তো কয়েক শ অভিযোগ জমা রয়েছে। আরো জমা হচ্ছে।’ জরুরি ভিত্তিতে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আট বছরে শেষ হয়েছে ৩০ মামলার বিচার। আর বাকি মামলার বিচার শেষ হতে কত বছর লাগবে, তা অনুমান করলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে।’

ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বলেন, তদন্ত সংস্থার কাছ থেকে একের পর এক প্রতিবেদন আসছে। এতে ট্রাইব্যুনালে মামলার সংখ্যা আরো বাড়বে। তাই ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা, প্রসিকিউশন টিম ও তদন্ত সংস্থার জনবল সব দ্রুত বাড়ানো দরকার।

ট্রাইব্যুনালে সর্বপ্রথম সাঈদীর মামলার বিচার শুরু হলেও প্রথম রায় হয়েছে ফরিদপুরের মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের বিরুদ্ধে। ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। সব মিলে এ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ ৬৩ জনের বিরুদ্ধে ৩০টি মামলার বিচার শেষ হয়েছে। এসব মামলায় বেশির ভাগ আসামির সাজা হয়েছে। কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। গোলাম আযমসহ কয়েকজন আসামি কারাবন্দি অবস্থায় মারা গেছে। সাঈদীসহ বেশ কয়েকজন আমৃত্যু কারাদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে এখন কারাবন্দি।

 



মন্তব্য