kalerkantho


রমরমা মাদকের কারবার, ফায়দা লোটেন ওসি

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



রমরমা মাদকের কারবার, ফায়দা লোটেন ওসি

রাজশাহীর গোদাগাড়ী এলাকায় মাদকের কারবার চলছে রমরমা। হেরোইনসহ বড় ধরনের মাদক চালান পরিবহন করা হচ্ছে এ অঞ্চল দিয়ে। মাঝেমধ্যেই ধরা পড়ছে চালান, তাতে মিলছে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের মাদক। তবে মাদক চালানের বহনকারী ধরা পড়লেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে আড়ালে। মূলত র‌্যাবের টিমসহ অন্যরা মাদক চালান আটকে অগ্রণী ভূমিকা রাখলেও স্থানীয় থানা পুলিশ রহস্যজনক ভূমিকায় অবতীর্ণ। এ অবস্থায় মাদক কারবারিদের সঙ্গে সখ্য ও আঁতাতের অভিযোগ উঠেছে গোদাগাড়ী থানার ওসিসহ পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভাতেও বিষয়টি আলোচিত।

সূত্র জানায়, জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় গত রবিবার গোদাগাড়ী থানার ওসি হিফজুর আলম মুন্সির বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ করেন জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও গোদাগাড়ীর পৌর মেয়র মনিরুল ইসলাম বাবু। জনপ্রতিনিধিসহ স্থানীয় নেতারা পুলিশের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ করে আসছেন আগে থেকেই। কার্যত মাদক নির্মূলে পুলিশের ব্যর্থতা ক্ষুব্ধ করে তুলেছে এলাকাবাসীকে।

পৌর মেয়র মনিরুল ইসলাম বাবু অভিযোগ করে বলেন, ‘ওসির নেতৃত্বে পুলিশ বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাদকের নামে অভিযান চালায়। আটক করা হয় সাধারণ মানুষকে। তাদের পকেটে বা ঘরে হেরোইন রেখে পুলিশ ফাঁসিয়ে  দেয়। কিন্তু যারা চিহ্নিত মাদক কারবারি তাদের আটক করা হয় না। মাদক সিন্ডিকেটের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোয়ারা আদায় করছে পুলিশ। এ পরিস্থিতিতে ওসির বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে আবেদন জানাচ্ছি।’

স্থানীয় সূত্র জানায়, হেরোইন সিন্ডিকিটের সদস্যরা এলাকায় অবস্থান করে কম। মাদক পাচার কাজে ব্যবহার করা হয় শ্রমিক শ্রেণির লোকজনকে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করে মাদকের বড় কারবারিরা কোটি কোটি টাকার চালান আনা-নেওয়া করছে গোদাগাড়ী সীমান্ত দিয়ে। মাদকের স্থানীয় প্রতিনিধিদের নির্বিঘ্ন রেখে গোদাগাড়ী থানা পুলিশ ফায়দা লুটছে। বছরে কয়েক কোটি টাকা পুলিশ মাদক কারবারিদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গত ৯ অক্টোবর প্রায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের হেরোইনসহ র‌্যাব-৫ পদ্মার পার এলাকা থেকে আটক করে সাজেমান (৩৭) নামের এক মাদক কারবারিকে। একাধিক মাদক মামলায় পরোয়ানাভুক্ত এ আসামি আড়ে এলাকায় ঘোরাঘুরি করলেও পুলিশ গ্রেপ্তার করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে ২৮ সেপ্টেম্বর উজানপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিন কেজি ২৫০ গ্রাম হেরোইনসহ গ্রেপ্তার করা হয় রবিউল ইসলাম (২৫) নামের কারবারিকে। এর আগে গোদাগাড়ীর হেরোইন ব্যবসা নিয়ে কালের কণ্ঠে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হলে পুলিশের তৎপরতা বেড়েছিল। তখন কয়েকজন মাদক কারবারিকে আটকও করা হয়। তবে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে পুলিশ সোহেল রানা নামের একজনকে মাদক মামলায় গ্রেপ্তার দেখায়নি। তাকে নাশকতার মামলায় চালান করা হয়। মাদক কারবারিদের অনেকে পুলিশের প্রশ্রয়ে বর্তমানে এলাকাতেই অবস্থান করছে বলে স্থানীয় লোকজন জানায়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারিদের মধ্যে মহিষালবাড়ী এলাকার শহিদুল ইসলাম ওরফে ভোদল, মাদারপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য সেতাবুর রহমান বাবু, নাজিবুর, সেলিম, তোফাজ্জল হোসেন, মানিকচক গ্রামের শরিফুল ইসলাম, কোদালকাটি গ্রামের আব্দুল জাব্বার, মহিশালবাড়ী গ্রামের আজিজুল মায়ারী, হেলাল, বাবু, মেকাইল, বানি ইসরাইল, চর আলাতুলি গ্রামের খুয়াজ, হুমায়ন, চাইপাড়া এলাকার লোকমানসহ অনেকে পুলিশকে ম্যানেজ করে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে বলে অনেকে জানায়। মাদক কারবারি সেতাবুর রহমান বাবু দুই মাস আগেও পুলিশের অভিযানে পালিয়ে থাকলেও বর্তমানে ইউপি সদস্য পরিচয়ে ওসির সঙ্গে থানায় বসে বিচার-সালিস করেন বলে অনেকে জানায়। গোদাগাড়ী থানার ওসি ছাড়াও এসআই আকবর আলী, আব্দুর রাজ্জাক, এএসাই আব্দুল জাব্বারসহ কয়েকজন সদস্য মাদক কারবারিদের সঙ্গে আঁতাত করে চলেন বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

গোদাগাড়ী থানার ওসি হিফজুর আলম মুন্সি বলেন, ‘চরাঞ্চলটা এখনো মাদক কারবারিদের অভয়ারণ্য। সেখানে আমরা বড় অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছি। এলাকার যারা চিহ্নিত মাদক কারবারি তারা এখন পলাতক। তাদের ধরতে নিয়মিত অভিযান হচ্ছে। মাদক ব্যবসায়ী বাবু, ভোদলসহ অন্যরা পলাতক। তাদের থানায় আসার কোনো সুযোগ নেই।’

অভিযোগ প্রসঙ্গে ওসি বলেন, ‘কোনো মাদক কারবারির সঙ্গে আঁতাত করে অর্থ আদায়ের বিষয়টি সঠিক নয়। এগুলো যারা বলছে তারা ভুল তথ্য দিচ্ছে। মেয়র মনিরুল ইসলাম বাবুর সঙ্গে স্থানীয় এমপির দূরত্ব তৈরি হয়েছে। সে কারণেই তিনি এখন পুলিশকে প্রতিপক্ষ মনে করছেন।’

পুলিশ সুপার মোয়াজ্জেম হোসেন ভুঁইঞা বলেন, ওসির বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ উঠেছে। সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে।



মন্তব্য