kalerkantho


শেখ হাসিনাকে ম্যাখোঁর আশ্বাস

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ভূমিকা রাখবে ফ্রান্স

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ভূমিকা রাখবে ফ্রান্স

প্যারিসের এলিসি প্রাসাদে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁর সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছবি : এএফপি

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছে ফ্রান্স। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্বাস দিয়েছেন, চলমান রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে জাতিসংঘ ও অন্য আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে ফ্রান্স যথাযথ ভূমিকা পালন করবে এবং মানবিক সহায়তাও দেবে।

গতকাল মঙ্গলবার প্যারিসের এলিসি প্রাসাদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এ আশ্বাস দেন। ওই বৈঠকের পর পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক সাংবাদিকদের এ কথা জানান।

পররাষ্ট্রসচিব বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া শুরুর জন্য যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের প্রক্রিয়াকে আরো এগিয়ে নিতে মিয়ানমারের একটি প্রতিনিধিদল আগামী ১৯ ডিসেম্বর ঢাকায় আসবে।

উল্লেখ্য, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে গত ২৩ নভেম্বর মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সই হওয়া চুক্তি অনুযায়ী তিন সপ্তাহের মধ্যে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন এবং দুই মাসের মধ্যে প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়া শুরুর কথা। যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে তিন সপ্তাহের সময়সীমা আজ বুধবার অতিক্রান্ত হচ্ছে।

পররাষ্ট্রসচিবের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান অবস্থা, বাংলাদেশ বর্তমানে এ বিষয়ে কী  করছে এবং ফ্রান্সের কাছে প্রত্যাশার বিষয়ে জানতে চান ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ। জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এটি এ দেশের জন্য বড় বোঝা, পরিবেশের জন্যও সমস্যা।

প্রধানমন্ত্রী গত সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তাঁর উত্থাপিত পাঁচ দফা প্রস্তাবগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের মধ্যে এ সমস্যার প্রকৃত সমাধান রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী সম্প্রতি মিয়ানমার সফর করেছেন এবং মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই করেছেন। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমরা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই করেছি। তবে আমরা চাই, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের প্রতি সহযোগিতা অব্যাহত রাখুক এবং মিয়ানমারকে চাপ দিক। নয়তো এ চুক্তি বাস্তবায়ন হবে না।’

এরপর প্রধানমন্ত্রী পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বিষয়টি সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করার আহ্বান জানান।

পররাষ্ট্রসচিব সাংবাদিকদের বলেন, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ উভয়েই দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে একটি যৌথ অর্থনৈতিক কমিশন গঠনের ব্যাপারে সম্মত হন। ওই কমিশনের কর্মপদ্ধতির বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ইমানুয়েল ম্যাখোঁ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফ্রান্সের ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক খাতগুলো চিহ্নিত করার আহ্বান জানান। জবাবে প্রধানমন্ত্রী জ্বালানি, অবকাঠামো, ওষুধ, তথ্য-প্রযুক্তি খাত এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর কথা উল্লেখ করেন। শেখ হাসিনা আজ বুধবার ফ্রান্সের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে বাংলাদেশে বাণিজ্য সম্ভাবনা ও বিশেষ সুবিধাগুলোর বিষয়ে আলোচনা করবেন জেনে প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ সন্তোষ প্রকাশ করেন।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এই দুই হুমকি মোকাবেলায় বাংলাদেশ কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার নীতি অনুসরণ করছে এবং এগুলোকে কঠোর হাতে মোকাবেলা করছে।

শেখ হাসিনা ও ইমানুয়েল ম্যাখোঁ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের ব্যাপারেও আলোচনা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন নির্গমনে কোনো ভূমিকা না রাখা সত্ত্বেও জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বিরূপ প্রভাবের শিকার।

প্যারিস জলবায়ু চুক্তির দুই বছর পূর্তি ও জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার পটভূমিতে ‘ওয়ান প্লানেট সামিট’ আয়োজনের জন্য প্রধানমন্ত্রী ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানান।

গত সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে বৈঠকে জলবায়ু ইস্যুতে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা নিতে শেখ হাসিনার আহ্বানের কথা স্মরণ করেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, এই সম্মেলনে প্যারিস চুক্তির বাস্তবায়ন বিষয়ে সবাই মিলে করণীয় ঠিক করা হবে।

আগামী বছরের শুরুর দিকে ঢাকা সফরের সম্ভাবনা : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ তা গ্রহণ করে বলেন, আগামী বছরের শুরুর দিকে তাঁর এশিয়া সফরের সময় তিনি বাংলাদেশে আসতে পারেন। দুই দেশের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে ওই সফরের তারিখ ও সময় ঠিক করা হবে।

বৈঠকে অন্যদের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব সুরাইয়া বেগম, ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত কাজী ইমতিয়াজ হোসেন উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে এলিসি প্রাসাদে এসে পৌঁছালে শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানান ম্যাখোঁ। প্রধানমন্ত্রীকে এলিসি প্রাসাদে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। বৈঠকের পর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান।

উল্লেখ্য, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং জলবায়ুবিষয়ক ‘ওয়ান প্লানেট সামিটে’ অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সোমবার প্যারিসে যান। তিনি আজ প্যারিস সময় বুধবার সন্ধ্যায় ফ্রান্স থেকে রওয়ানা হয়ে আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকায় পৌঁছাবেন।

 



মন্তব্য