kalerkantho


তালুকদারে ভরসা আ. লীগের বিএনপিতে এগিয়ে ফরিদ

এম এ মোতালেব, মোংলা   

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



তালুকদারে ভরসা আ. লীগের বিএনপিতে এগিয়ে ফরিদ

বাগেরহাটের চারটি সংসদীয় আসনের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয় মোংলা ও রামপাল উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনটিকে। কারণ এ আসনের মোংলায় রয়েছে সমুদ্রবন্দর। পর্যটন ও শিল্পনগরী হিসেবে মোংলা সুপরিচিত। এটা জাতীয় সংসদের ৯৭ নম্বর আসন, যা বাগেরহাট-৩।

আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত এই আসনটিতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের কিছু কিছু তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে। তাঁদের মধ্যে আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য তালুকদার আব্দুল খালেকের মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত বলে জানা গেছে। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতিমন্ত্রী এবং খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়রও ছিলেন। তবে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড যদি মনে করেন, তাঁকে খুলনা সিটি কপোরেশন নির্বাচনে আবার মেয়র পদে মনোনয়ন দিবেন, সে ক্ষেত্রে তাঁর সহধর্মিণী বেগম হাবিবুন নাহারকে প্রার্থী করার দাবি জানাবেন তিনি। হাবিবুন নাহার এ আসনে একবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

অন্যদিকে সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি ১৯৯১ সালের পর একবার এ আসনে জয়লাভ করেছিল। ’৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেও বিএনপি প্রার্থী এখানে জয়লাভ করেন। সে নির্বাচনও ছিল বিতর্কিত। ফলে বিএনপি চায় আওয়ামী লীগের ভোটের দুর্গে হানা দিতে। দলটির মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে আছেন লায়ন ড. শেখ মো. ফরিদুল ইসলাম। তিনি ছাড়াও আরো কয়েকজন দলের মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক জামায়াতও এ আসনে প্রার্থী দিতে পারে। দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এমনটাই জানা গেছে।

এ ছাড়া জাতীয় পার্টি (জাপা) ও জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রার্থী প্রায় চূড়ান্ত। বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন বাগেরহাটের অন্য তিন আসনে প্রার্থী ঠিক করলেও এ আসনে এখনো চূড়ান্ত করতে পারেনি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও ব্যবসায়ী মেজর  (অব.) মো. জিল্লুর রহমান এ আসন থেকে নির্বাচন করবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি এলাকায় গণসংযোগও করছেন। তবে কোনো দল থেকে তিনি মনোনয়ন চাইবেন কি না সেটা নিশ্চিত করেননি তিনি।

জিল্লুর রহমান প্রথমে বিএনপির হয়ে মাঠে নামেন। পরে আবার আওয়ামী লীগের হয়ে কিছুদিন কাজ করেন। এখন তিনি কোন দলের হয়ে গণসংযোগ করছেন তা নিশ্চিতভাবে কেউ বলতে পারেনি।

আওয়ামী লীগ : স্বাধীনতার পর থেকে যখন যে দলই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসুক না কেন এ আসনে বলতে গেলে সব সময়ই আওয়ামী লীগের প্রার্থীই বিজয়ী হয়েছেন। ১৯৯১ সাল থেকে, মাঝে দুবার ছাড়া ২০১৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে চারবার জিতেছেন তালুকদার আব্দুল খালেক। তিনি খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে জয়লাভ করায় ২০০৮ সালে তাঁর স্ত্রী হাবিবুন নাহার এ আসনে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য হন। ’৯৬ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী হন খালেক।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বলছে, আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তালুকদার আব্দুল খালেক যদি খুলনার মেয়র পদে প্রার্থী না হন তাহলে বাগেরহাট-৩ আসন থেকে জাতীয় নির্বাচন করবেন। সেই পরিকল্পনা নিয়ে তিনি দল গুছিয়েছেন। বিগত দিনের তুলনায় মোংলায় আওয়ামী লীগ অনেক বেশি সুসংগঠিত। তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকায় প্রচুর সময় দেন। এলাকার সব উন্নয়ন প্রকল্পের তদারকি তিনি নিজেই করেন। এসব বিবেচনায় আগামী নির্বাচনে তিনি আবার জয়লাভ করবেন—এমনটাই মনে করে তাঁর কর্মীরা-সমর্থকরা।

এলাকায় তাঁর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরে সংসদ সদস্য খালেক বলেন, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দির-গির্জাসহ এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ আসনের জন্য প্রকল্প এবং অর্থ বরাদ্দ দিয়ে সহায়তা না করলে এভাবে উন্নয়ন করা আমার পক্ষে সম্ভব হতো না।’

তালুকদার আব্দুল খালেক মনে করেন, মোংলা-রামপাল আসনে আওয়ামী লীগে তাঁর বিকল্প প্রার্থী নেই। সে জন্য এখন পর্যন্ত দলীয় প্রার্থী হিসেবে দল তাঁকেই বিবেচনায় রেখেছে।

এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের হয়ে মনোনয়ন চাইবেন—এমন আরো দু-একজনের নাম শোনা গেলেও তাঁরা প্রকাশ্যে কোনো তৎপরতা শুরু করেননি।

বিএনপি : ১৯৯১ সালের নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির প্রার্থী আ স ম মোস্তাফিজুর রহমান তালুকদার আব্দুল খালেকের কাছে হেরে যান। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী এ ইউ আহম্মেদ জয়লাভ করেন। তাঁরা দুজনই প্রয়াত। এ ছাড়া এ আসনে বিএনপি জোটের শরিক জামায়াতের প্রার্থী কয়েকবার নির্বাচন করে পরাজিত হন।

বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নব্বই দশকের ছাত্রনেতা দলের বাগেরহাট জেলা শাখার সহসভাপতি লায়ন শেখ মো. ফরিদুল ইসলাম। তিনি সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনেরও চেয়ারম্যান। দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে তিনি এগিয়ে আছেন বলে নেতাকর্মীরা জানায়।

সাংগঠনিকভাবে দক্ষ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির জন্য গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠা ফরিদুল ইসলাম মাঠপর্যায়ে হামলা-মামলার শিকার নেতাকর্মীদের সব রকম সহযোগিতা দিয়ে আসছেন। এ ছাড়া অসহায় দরিদ্রদের চিকিৎসা এবং অর্থিক সাহায্য করে এলাকায় কিছুটা আলোচনায় এসেছেন।

দলীয় মনোনয়ন তিনিই পাবেন—এমন দাবি করেছেন ফরিদুল ইসলামও। তিনি বলেন, দল থেকে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হলে নবীন-প্রবীণদের সমন্বয়ে মোংলা ও রামপাল উপজেলার উন্নয়নে কাজ করবেন তিনি।

বিএনপির হয়ে আরো যাঁরা মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে শোনা যাচ্ছে তাঁরা হলেন—বাগেরহাট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আলী রেজা বাবু ও সাবেক সংসদ সদস্য বাগেরহাটের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী এম এ এইচ সেলিম।

জামায়াতে ইসলাম :  ১৯৯১ সাল থেকে জামায়াতের প্রার্থী গাজী আবু বকর দুবার একক এবং দুবার জোটবদ্ধ নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছেন। জামায়াত মনে করে, তাদের পরাজয়ের কারণ বিএনপি। জোটের নেতৃত্বে থাকা দলটির একটি অংশের ভোট জামায়াতের পক্ষে পড়েনি বলে প্রার্থী হেরে গেছেন।

আগামী নির্বাচনে বাগেরহাট জেলা জামায়াতের সিনিয়র নায়েবে আমির শেখ আব্দুল ওয়াদুদ জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করতে পারেন বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সম্প্রতি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ঘোষণা অনুযায়ী জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির জোট অটুট আছে। জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল নিয়ে মামলা চলছে। রায় জামায়াতের অনুকূলে না এলে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে দলটি নির্বাচন করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্বাচন করবে জামায়াত।

জাতীয় পার্টি (জাপা) : বিরোধী দল জাতীয় পার্টি এ আসনে দলটির নেত্বতাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান সেকেন্দার আলী মনির নাম ঘোষণা করে। সাবেক স্বৈরশাসক এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনীল শুভরায় মোংলা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এ ঘোষণা দেন।  সেকেন্দার আলী মনি মোংলার মিঠাখালী গ্রামের বাসিন্দা। এলাকায় তাঁর বেশ পরিচিতি রয়েছে।

জাতীয় পার্টি (জেপি) : মোংলা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি হোসাইন মোহাম্মদ দুলাল এ আসন থেকে সরকারের শরিক জেপির প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করতে চান। তিনি কালের কণ্ঠকে এমন কথাই জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন : দলটির খুলনা মহানগর সভাপতি মোজাম্মেল হক এর আগে এ আসন থেকে নির্বাচন করেছেন। আগামী নির্বাচনেও দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্বাচন করবেন বলে তিনি জানান। তবে দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত এ আসনে দলটির প্রার্থী  ঠিক করা হয়নি।

 


মন্তব্য