kalerkantho


মোংলা বন্দরে পণ্য খালাসে খরচ চট্টগ্রামের চার গুণ

পাঁচ দিন পেরোলেই গুনতে হয় বাড়তি ‘পোর্ট ডিউস’

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

১১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মোংলা বন্দরে পণ্য খালাসে খরচ চট্টগ্রামের চার গুণ

মোংলা বন্দরে জাহাজ থেকে পণ্য নামাতে চট্টগ্রাম বন্দরের চার গুণ বেশি খরচ পড়ছে। ‘পোর্ট ডিউস’ নামে এই ভাড়া চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের চার্টে একই। তবে মোংলার ক্ষেত্রে আলাদা স্ল্যাব বা ধাপ নির্ধারণ করায় বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে ব্যবহারকারীদের। এতে মোংলা বন্দরের পুরো সক্ষমতা কাজে লাগানোর বিষয়ে বর্তমান সরকারের উদ্যোগের সুফল মিলছে না।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে লাইটারেজ সংকট, জাহাজজটের কারণে অনেক ব্যবসায়ী চট্টগ্রাম ছেড়ে মোংলা বন্দরে পণ্য খালাস করতে যান। কিন্তু পোর্ট ডিউস, রিভার ডিউস, কাস্টমসের প্রক্রিয়াগত নানা খরচ বেশি থাকায় আবারও বাধ্য হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে ফিরে আসছে।

বন্দর ব্যবহারকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোংলা বন্দরের জলসীমায় পৌঁছার পর ২০ হাজার টন পণ্য ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি জাহাজ ৩০ দিন রাখলে ‘পোর্ট ডিউস’ গুনতে হচ্ছে ১৭ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম বন্দরে সেই

 খরচ পড়ছে পৌনে চার লাখ টাকা। চট্টগ্রাম বন্দরে একবার জাহাজ প্রবেশ করলে একবারই মাসুল গুনতে হয়; স্ল্যাব বা ধাপ নেই। বহির্নোঙরে বা সাগরে জাহাজ থেকে পণ্য নামাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এই পোর্ট ডিউস। এটি আদায় করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। পোর্ট ডিউস ছাড়াও মোংলা বন্দরে জাহাজের সার্ভে এবং বহির্নোঙরে গিয়ে কাস্টমস প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে চট্টগ্রামের চেয়েও বেশি খরচ লাগছে বলে জানায় ব্যবহারকারীরা।

মোংলা বন্দর ঘিরে বসুন্ধরা গ্রুপসহ দেশের অনেক শীর্ষ শিল্প গ্রুপের শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। নতুন আরো শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। সেসব প্রতিষ্ঠানের চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে পণ্য খালাসের সুযোগ নেই। তাই বাধ্য হয়ে বেশি মাসুল দিয়ে মোংলা বন্দর থেকে পণ্য খালাস করতে হচ্ছে। ফলে অন্য এলাকার তুলনায় তাদের পরিচালন ব্যয় বেশি হচ্ছে।

জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে বহির্নোঙরে পণ্যবাহী জাহাজ ভিড়লে জাহাজের ওজন অনুযায়ী ভাড়া কেবল একবার গুনতে হয়। আর মোংলা বন্দরে ভাড়া একই হলেও সেখানে প্রতি পাঁচ দিন পর পর বাড়তি হারে মাসুল নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। যেমন—২০ হাজার টনের একটি জাহাজ পাঁচ দিন সাগরে থাকলে দিতে হবে প্রায় ১২ লাখ টাকা, ৩০ দিন থাকলে গুনতে হবে ১৭ লাখ টাকা। ব্যবসায়ীরা আমদানি পণ্য এনে নিজেদের চাহিদা ও প্রয়োজনমতো জাহাজ থেকে নামায়। ফলে দীর্ঘদিন জাহাজ সাগরে বসিয়ে রাখলে বেশি মাসুল গুনতে হচ্ছে। বহির্নোঙরে বেশি দিন রাখলে বন্দরের কোনো ক্ষতি নেই, পণ্য ওঠানামায়ও কোনো সমস্যা হচ্ছে না। এর পরও বাড়তি মাসুল আদায় করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারকারী সুলতান শিপিংয়ের কর্ণধার এ কে এম সামশুজ্জামান রাসেল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুই বন্দরের পোর্ট ডিউস একই হারে হওয়া উচিত। এতে মোংলা বন্দরের পুরো সক্ষমতা কাজে লাগানো যাবে। চট্টগ্রাম ছাড়াও দেশের অন্য ব্যবসায়ীদের জন্যও একটি বিকল্প তৈরি হবে।’

সি কম শিপিংয়ের পরিচালক জহুর আহমদ মনে করেন, এক দেশ এক মন্ত্রণালয়ে দুই নিয়ম বা মাসুল থাকা উচিত নয়। এক মাসুল হলে সবাই সমান সুযোগ পাবেন।

এ বিষয়ে জানতে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে গতকাল রবিবার রাতে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমোডর এ কে এম ফারুক হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ মুহূর্তে মন্তব্য করতে পারব না। একজন ভিআইপির সঙ্গে কথা বলছি, ব্যস্ত আছি।’

ব্যবহারকারীরা জানান, পণ্যবাহী একটি জাহাজ মোংলা বন্দরের অদূরে ফেয়ারওয়ে স্থানে পৌঁছে। এরপর বন্দরে ঢোকার নির্ধারিত গভীরতা অনুযায়ী জাহাজ থেকে পণ্য নামিয়ে ওজন হালকা করে তারপর জেটিতে ঢোকে। বন্দর জেটি থেকে ফেয়ারওয়ে বয়ার দূরত্ব বেশি হওয়ায় জাহাজের সার্ভে রিপোর্ট নিতে এবং কাস্টমস কর্মকর্তাকে সেই স্থানে নিতে বাড়তি টাকা দিতে হয়। এ ছাড়া সেই স্থানে বোট ভাড়া করে নিতেও ২০ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে।

জানা গেছে, বর্তমান সরকার মোংলা বন্দরের কার্যক্রম বাড়িয়ে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক গতি বাড়াতে ২০১১ সালে একটি নির্দেশনা জারি করে। তাতে দেশে সরকারিভাবে আমদানি করা মোট ভোগ্য পণ্য ও সারের ৪০ শতাংশ মোংলা বন্দরে খালাস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নির্দেশনাটি এখনো কার্যকর আছে। মোংলা বন্দর সচল করতে সরকার গাড়ি আমদানি ও রাখার ট্যারিফ বা মাসুলও চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে অনেক কমিয়ে দেয়। এতে বেশ সুফল মিলেছে।

মোংলা বন্দরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১১ সালের ওই নির্দেশনার পর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জাহাজ আসা বেড়ে গিয়েছিল। সেবার জাহাজ এসেছিল ৩৪৫টি। অথচ এর আগের বছরও জাহাজ এসেছিল মাত্র দেড় শ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জাহাজ এসেছিল ৪১৬টি, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এসেছিল ৪৮২টি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এসেছিল রেকর্ডসংখ্যক জাহাজ, ৬২৩টি। এর মধ্যে শুধু গত নভেম্বরেই ৮০টি জাহাজ এসেছে।

জাহাজ বৃদ্ধির পাশাপাশি রাজস্ব আয়ও বেড়েছে বহুগুণ। এর ফলে এই এলাকা ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য। পদ্মা সেতু নির্মাণের পর এখানকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আমূল পরিবর্তন ঘটার অপেক্ষায় ব্যবসায়ীরা।

এমন সম্ভাবনার মধ্যেই গত ৩০ অক্টোবর একটি সার্কুলারের মাধ্যমে মোংলা বন্দরের ট্যারিফ নতুন করে নির্ধারণ করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। এতে ৫৬টি ট্যারিফের মধ্যে বেশ কিছু ক্ষেত্রে মাসুলের হার আগের চেয়ে বেড়ে গেছে।

চট্টগ্রাম লাইটার জাহাজ ঠিকাদার সমিতির সভাপতি হাজি শফিক আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লাইটার জাহাজ সংকটের কারণে খরচ কমাতে অনেকেই মোংলা বন্দরে যান। কিন্তু সেখানে চট্টগ্রামের চেয়ে দ্বিগুণ খরচ হওয়ায় পরে আর কেউ যেতে সাহস করছে না।



মন্তব্য