kalerkantho


‘ক্রোধের’ মিছিলে ইসরায়েলি সেনাদের গুলি

এক ফিলিস্তিনি নিহত আহত অন্তত ২৫০

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



‘ক্রোধের’ মিছিলে ইসরায়েলি সেনাদের গুলি

ছবি: ইন্টারনেট

জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়ার পর বিক্ষুব্ধ ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরায়েলি বাহিনীর সহিংসতা ক্রমেই বাড়ছে। ফিলিস্তিনিদের ঘোষিত ‘ক্রোধ দিবসে’ গতকাল শুক্রবার বিক্ষোভের সময় পশ্চিম তীর ও গাজাসহ অন্তত ৩০টি এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে তাদের সহিংসতা হয়। ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে একজন নিহত এবং অন্তত ২৫০ জন আহত হয়েছে।

এই ‘ক্রোধ দিবসেই’ গাজা থেকে ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে তিনটি রকেট হামলা চালায় ফিলিস্তিনের সংগঠন আল তৌহিদ ব্রিগেডস। এর জবাবে এই সংগঠনের দুটি স্থাপনা লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। দুই হামলার কোনোটিতেই হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।   

যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণার পর এই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ গতকাল বাংলাদেশ সময় মধ্যরাতে জরুরি বৈঠকে বসেছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ওই বৈঠক চলছিল।

তবে বৈঠকে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে পরিচিত যুক্তরাজ্য, সুইডেনসহ অনেক দেশ ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। এমনকি জাতিসংঘ এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

জাতিসংঘের মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়া বিষয়ক বিশেষ সমন্বয়ক নিকোলা ম্লাদেনভ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণার পর শুরু হওয়া সহিংসতার শেষ কোথায় তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। উত্তেজনায় ঘি ঢালার মতো পদক্ষেপ না নিতে তিনি দুই পক্ষের প্রতিই আহ্বান জানান।     

নিরাপত্তা পরিষদের এই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রকে তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে ফিলিস্তিন। তবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তাদের ঘোষণার প্রেক্ষাপটেই সহিংসতা হচ্ছে এ কথা যারা বলছে তারা শান্তিপ্রক্রিয়ার অংশীজন নয়।

ট্রাম্পের ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ফিলিস্তিনের কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতিরও ইঙ্গিত মিলেছে। ফিলিস্তিনের এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে ফিলিস্তিনে স্বাগত জানানো হবে না। তাঁর সঙ্গে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের পূর্বনির্ধারিত বৈঠকও বাতিল করা হবে। চলতি মাসের শেষ দিকে, মাইক পেন্সের ফিলিস্তিন সফর করার এবং আব্বাস ও অন্য নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে।

এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের দপ্তর হোয়াইট হাউস সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, মাইক পেন্সের সঙ্গে মাহমুদ আব্বাসের পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিল করলে তা ফিলিস্তিনের জন্য ‘উল্টো ফল’ বয়ে নিয়ে আসবে।

ট্রাম্পের ঘোষণার পরই বৃহস্পতিবার পশ্চিমতীর ও গাজায় ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। ওই এলাকাগুলোতে ইসরায়েল অতিরিক্ত কয়েক শ সেনা মোতায়েন করে। এরই মধ্যে গাজা শাসনকারী ইসলামি আন্দোলন হামাসের নেতা ইসমাইল হানিয়া ফিলিস্তিনে নতুন ইন্তিফাদার (গণ-অভ্যুত্থান) ডাক দেন। গতকাল দিনটিকে ‘ক্রোধ দিবস’ ঘোষণা করে বিক্ষোভের ডাক দেন। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ইসরায়েল ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে অতিরিক্ত পুলিশ ও সেনা মোতায়েন করে রাখে।

গতকাল গাজার দক্ষিণ দিকে ইসরায়েল সীমান্তে বিক্ষোভকারীদের ওপর ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে মাহমুদ আল-মারসি নামের ৩০ বছর বয়সী এক যুবক নিহত হয়। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, বিক্ষোভকারীরা তাদের ওপর হামলা চালিয়েছিল।

এদিন জুমার নামাজের পর বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে জেরুজালেমের ওল্ড সিটি, হেবরন, বেতেলহেম, নাবলুসসহ পশ্চিম তীর ও গাজার অন্তত ৩০টি এলাকায়। কিছু এলাকায় ফিলিস্তিনি বিক্ষোভাকারীরা ইসরায়েলি সেনাদের দিকে পাথর ছুড়ে মারে। জবাবে সেনারা গুলি, রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাসের শেল ছোড়ে। জেরুজালেম ওল্ড সিটিতে প্রায় ৫০ জন পুলিশ অন্তত ২০০ জন বিক্ষোভকারীকে লাথি-ঘুষির পাশাপাশি লাঠিচার্জ করে। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট জানায়, পশ্চিম তীরে সেনাদের গুলিতে একজন গুরুতর আহত হয়েছে। এ ছাড়া রাবার বুলেটে আহত হয়েছে ২১ জন। গাজা উপত্যকায় টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেটের আঘাতে আহত হয়েছে আরো অন্তত ১৪ জন।

ওল্ড সিটিতে আল-আকসা মসজিদে নামাজ পড়তে এসেছিলেন ২০ বছর বয়সী ওমর। ট্রাম্পের ঘোষণার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কথা বলে আর কী হবে?’ তিনি আরো বলেন, ‘কী হবে তাতে কিছু আসে যায় না। আমরা শুধু এটাই জানি যে, জেরুজালেম ফিলিস্তিনের রাজধানী, ইসরায়েলের নয়। ইসরায়েল হচ্ছে দখলদার।’

এর আগে পশ্চিম তীর ও গাজায় সেনাদের রাবার বুলেট ও গুলিতে বৃহস্পতিবার অন্তত ৩১ জন আহত হয়। বেতেলহেম, রামাল্লাহ ও অন্য শহরগুলোতে সংঘর্ষে ৪৯ জন আহত হওয়ার খবর জানায় রেড ক্রিসেন্ট।

ফিলিস্তিনিদের পক্ষে গতকাল বিক্ষোভ হয়েছে তুরস্ক, ইরান, মিসর, মালয়েশিয়া, আফগানিস্তানসহ অন্যান্য মুসলিম দেশেও। জুমার নামাজের পর কয়েক হাজার মুসলিম তুরস্কের রাজধানী ইস্তাম্বুলের রাস্তায় বিক্ষোভে নামে। ইস্তাম্বুলের কেন্দ্রে অটোমান ফাতিহ মসজিদ থেকে নামাজ শেষ করে নামা মুসল্লিদের কণ্ঠে ছিল—‘জেরুজালেম আমাদের, আমাদেরই থাকবে’, ‘আমেরিকা নিপাত যাক’, ‘ইসরায়েল নিপাত যাক’ শীর্ষক বিভিন্ন স্লোগান। ইস্তাম্বুলের অন্যান্য এলাকায়ও বিক্ষোভ মিছিল বের হয়।

ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ থেকে ট্রাম্পের নিন্দা ও তাঁর ঘোষণার প্রতিবাদ জানানো হয়। বিক্ষোভকারীরা এ সময় মার্কিন ও ইসরায়েলবিরোধী নানা স্লোগানের পাশাপাশি দুই দেশের পতাকাও পোড়ায়।

মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে জুমার নামাজের পর প্রায় পাঁচ হাজার লোক মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ করে। এ সময় তাদের হাতে ছিল, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিপাত যাক’, ‘জেরুজালেমে নাক গলাবে না’ লেখা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড।

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে প্রায় এক হাজার মুসলিম বিক্ষোভ করে। বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘ইসরায়েল ধ্বংস হোক’, ‘যুক্তরাষ্ট্র ধ্বংস হোক’ ইত্যাদি স্লোগান। বিক্ষোভকারীরা এ সময় ট্রাম্পের কুশপুত্তলিকা পোড়ায়।

এদিকে, ট্রাম্পের জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ফিলিস্তিনের কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতির ইঙ্গিত মিলেছে। বৃহস্পতিবার সকালে মাহমুদ আব্বাসের ফাতাহ পার্টির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জিব্রিল রাজৌব বলেন, পেন্সকে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে স্বাগত জানানো হবে না। ‘আব্বাসের সঙ্গে তাঁর পূর্ব নির্ধারিত বৈঠকও হবে না।’ যদিও এ বিষয়ে আব্বাস গতকাল পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেননি। পরে ওই দিনই হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ভাইস প্রেসিডেন্ট পূর্ব নির্ধারিত সময়েই ওই বৈঠক আয়োজন চান। ‘মাইক পেন্স এখনো আব্বাস ও ফিলিস্তিনের অন্য নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আগ্রহী। ওই বৈঠক বাতিলের কোনো পরিকল্পনা তাঁদের (ফিলিস্তিন) জন্য উল্টো ফল বয়ে নিয়ে আসবে।’ এর আগে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ বলেছিল,  ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাষ্ট্র আর কোনোভাবেই ফিলিস্তিন-ইসরায়েল শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে পারবে না। ট্রাম্পের ঘোষণার নিন্দা জানায় জাতিসংঘ, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ।

সোমবার তুরস্ক যাচ্ছেন পুতিন : এদিকে ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী স্বীকৃতির ঘোষণা দেওয়ার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আগামী সোমবার তুরস্কে যাচ্ছেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবেন তিনি। গতকাল এরদোয়ানের কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানায়, এ বিষয়টি এবং সিরিয়া নিয়ে আলোচনার জন্য প্রেসিডেন্ট পুতিন তুরস্ক সফরে আসছেন। এর আগে ক্রেমলিন এক বিবৃতিতে জানিয়েছিল, এরদোয়ানের সঙ্গে টেলিফোন আলাপে ট্রাম্পের ঘোষণা নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন পুতিন। পুতিন বলেন, মার্কিন প্রশাসনের এ রকম একটি সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। তিনি ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি নিয়ে পুনরায় আলোচনা শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন।

ট্রাম্পের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ। গতকাল প্যারিসে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরির সঙ্গে এক আন্তর্জাতিক বৈঠকে তিনি এ আহ্বান জানান। বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনও উপস্থিত ছিলেন। ম্যাখোঁ বলেন, ‘ওই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বাড়াবে এমন সিদ্ধান্ত (ট্রাম্পের ঘোষণা) দেওয়া উচিত নয়। আমি সবার কাছ থেকে শান্তি ও দায়িত্বপূর্ণ আচরণ আশা করব, যা আমাদের লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি আবারও বলতে চাই যে ওই ঘোষণা (ট্রাম্পের ঘোষণা) আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। দুই রাষ্ট্রের ভিত্তিতে আরবের সমস্যা সমাধানেই আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন গতকাল আরো স্পষ্ট করে বলেছেন, পরের বছরও সম্ভবত মার্কিন দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে সরানো সম্ভব হবে না। সূত্র : এএফপি, বিবিসি, সিএনএন।

 



মন্তব্য