kalerkantho


এক সালিসেই মৃত্যু লেখা হলো পারভেজের

শাহীন আকন্দ, গাজীপুর   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



এক সালিসেই মৃত্যু লেখা হলো পারভেজের

পারভেজ মিয়া

অসহায় পারভেজ মিয়া (১৯) বাঁচতে চেয়েছিলেন। শিশুকাল থেকেই চলছিল তাঁর বাঁচার লড়াই।

দরিদ্র পরিবারের সন্তান, তাঁর কাছে জীবন মানে কেবল পেটের ভাত জোগাড় করা। কাজ পেয়েছিলেন যাত্রীবাহী লেগুনার হেলপার হিসেবে। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যান তিনি। এরপর ক্রাচের ওপর ভর। এরপর ভিক্ষা করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল তাঁর জীবন। কিন্তু...  

এক ছাত্রলীগ নেতার ক্ষমতা আর দাপটের শিকার হন পারভেজ। সামান্য এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে সালিস বসিয়ে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেন ছাত্রলীগ নেতা বাঁধন (২২)। এই টাকা না পেয়ে পরিবারের সদস্যদের কুপিয়ে হত্যা করার হুমকি দেওয়া হয়। অসহায় পরিবারটি দিশাহারা হয়ে পড়ে।

অপমানে, ভয়ে একপর্যায়ে মায়ের মোবাইল ফোনের মেমোরি কার্ড বিক্রি করে বিষপান করেন পারভেজ। কিন্তু ওই যাত্রা বেঁচে যান তিনি। মরণ থেকে বাঁচলেও রেহাই মেলেনি তাঁর।

ছাত্রলীগ নেতা বাঁধন ও তাঁর সহযোগীরা ওই টাকার জন্য অব্যাহত হুমকি দিতে থাকেন তাঁকে। জরিমানার টাকার জন্য ১২ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন। অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণা আর আতঙ্কে ভুগতে থাকে পরিবারটি। মা-বাবার কষ্ট সইতে না পেরে বাড়ি থেকে বের হন পারভেজ। এরপর টঙ্গী জংশনের কাছে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন পারভেজ। এরপর...

গ্রামে চাঁদা তুলে মর্গ থেকে পারভেজের লাশ নিয়ে আসে প্রতিবেশীরা। কিন্তু ছাত্রলীগ নেতাসহ তাঁর সহযোগীরা তড়িঘড়ি দাফনের হুকুম দেন। এই ঘটনায় মামলা তো দূরের কথা, কারো কাছে মুখ খুললে হত্যা, নয়তো এলাকা ছাড়ার হুমকি দিতে থাকেন ওই ছাত্রলীগ নেতা।

গাজীপুরের শ্রীপুর পৌর এলাকার মাওনা দক্ষিণপাড়া এলাকায় প্রায় ১৫ বছর ধরে ভাড়া বাসায় থাকে পারভেজের পরিবার। তাঁদের বাড়ি জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার পঁচাবহলা ইউনিয়নের ধর্মকোরা গ্রামে। মা পারভীন আক্তার ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ করেন।

অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতার নাম বাঁধন দাস। ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার সাধন দাসের ছেলে। তাঁর পরিবার মাওনা বাজার এলাকায় ভাড়ায় থাকে। বাঁধন মাওনা পিয়ার আলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি। বর্তমানে তিনি গাজীপুর জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক বলে দাবি করেন। যদিও জেলা ছাত্রলীগ তা অস্বীকার করেছে।

স্বজনরা জানায়, পারভেজের পরিবারটি খুবই দরিদ্র। পাঁচ ভাই, এক বোন তাঁরা। ভাই-বোনদের মধ্যে তৃতীয় তিনি। তীব্র অভাবের কারণে কখনো বিদ্যালয়মুখী হতে পারেননি তিনি। লেগুনার হেলপার হিসেবে কাজ করতে গিয়ে পঙ্গু হয়ে যান তিনি। অক্ষম শরীর নিয়ে বাড়ি থেকেই তেমন বের হতেন না পারভেজ।  

গত ২৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় বাড়ির পাশে জুয়েলের মুদি দোকানের সামনে বসে ছিলেন পারভেজ। ওই সময় পাশে ছিল তাঁর বন্ধু মোস্তফা। সেখানে সুমন নামে এক প্রতিবেশী ধারের ৫০ টাকার জন্য মোস্তফাকে গালাগাল ও টানাহেঁচড়া শুরু করে। ওই সময় সুমনকে গালাগাল করতে নিষেধ করেন পারভেজ। এতে সুমন পারভেজের সঙ্গে বাগিবতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তা হাতাহাতি পর্যন্ত গড়ায়। এ সময় সুমন ধারালো ছুরি নিয়ে পারভেজের ওপর হামলা চালায়। ওই সময় পারভেজের হাতে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায় সুমন। পড়ে গিয়ে সুমনেরও কপাল কেটে যায়।

পারভেজের মা পারভীন আক্তার জানান, ওই দিনই রাত প্রায় ৮টার দিকে মাওনা বাজার রোডের মনির হোসেন নামে একজন চায়ের দোকানদান তাঁর কাছে যান। সুমন ছাত্রলীগ নেতা বাঁধনের ‘লোক’ বলে জানান তাঁকে। ঘটনাটি ছাত্রলীগ নেতা বাঁধন জেনেছেন বলে জানিয়ে নানাভাবে ভয় দেখিয়ে ‘নেতা’র জন্য আট হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা দাবি করেন। নইলে ঘটনাটি অনেক বড় হবে বলেও ভয় দেখান মনির। এতে তিনি ভেঙে পড়েন। আশঙ্কায় তিনি রাতভর কাঁদেন।

পরদিন বৃহস্পতিবার দুপুর প্রায় ১২টার দিকে পারভেজ বিষপান করেন। টের পেয়ে তাঁকে তাত্ক্ষণিক পাশের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান তাঁরা। সেখান থেকে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয় তাঁকে। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা পাকস্থলী পরিষ্কারের পর আশঙ্কামুক্ত ঘোষণা করলে সন্ধ্যায় বাড়ি নিয়ে যাওয়া হয় পারভেজকে।

মা পারভীন আক্তার জানান, ঘরে কোনো টাকা না পেয়ে তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের মেমোরি কার্ড প্রতিবেশী একজনের কাছে বিক্রি করে কীটনাশক কিনে পান করেছিলেন পারভেজ। তাঁর ছেলে ভয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। এর পরও ওই দিন সন্ধ্যায়ই মনির হোসেনের দোকানে সালিসের কথা বলে বারবার খবর পাঠিয়ে তাঁদের ডেকে নেওয়া হয়।

পারভীন আক্তার আরো জানান, নিরুপায় হয়ে তিনিসহ তাঁর বড় ছেলে রুবেল ও পারভেজ সালিস বৈঠকে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন, ছাত্রলীগ নেতা বাঁধন ও তাঁর সহযোগী জাকির। পাশেই রয়েছেন সুমন ও চায়ের দোকানদার মনির। বাঁধন কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেন পারভেজকে। মাত্র ১০ মিনিটে কথিত ওই সালিস শেষ করে চলে যান বাঁধন।

পারভীন আক্তার জানান, তাঁরা এক মাস চেষ্টা করেও পাঁচ হাজার টাকার ব্যবস্থা করতে পারবেন না। ওই টাকা না দিলে ‘বড় বিপদ’ হতে পারে বলে দুশ্চিন্তায় রাতভর ঘুমাতে পারেননি তাঁরা। সকালে উঠেই পারভেজ তাঁকে বলেন, ‘আমার লাইগ্যা কেউরে বিপতে পড়ুন লাগতো না। আমি ভাঙা পাও দেহাইয়া ভিক্কা (ভিক্ষা) করাম। তারা আইলে আতো-পায়ো ধইরা ইকটু সময় লইনযে। পাও দেহাইলে মাইনষে আমারে ভিক্কা দিব। আমি খুব চালাইয়া (দ্রুত) জরিমানা দেয়া দেম। ’

পারভেজের মা পারভীন আক্তার জানান, ১ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তাঁর ছেলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। কোথায় যাচ্ছেন, কিছুই তিনি জানতে চাননি।

পারভেজের মা জানান, জরিমানার টাকা আদায়ের জন্য মনির বারবার ফোন দিচ্ছিলেন। ছাত্রলীগ নেতা বাঁধনসহ তাঁর সহযোগীরা পারভেজকে খুঁজছিলেন। দুপুরে তাঁর ছেলে ফোন দিয়ে তাঁকে বলেন, ‘আমি বাড়িত আইয়া পড়ি?’ জবাবে তিনি শুধু বলেছেন, ‘বাঁধন নেতা লোক দিয়া তরে খুঁজাইতাছে। ’ তা শুনেই মোবাইল ফোনের সংযোগ কেটে দেন পারভেজ। এর প্রায় আধা ঘণ্টা পর বিমানবন্দর রেলওয়ে ফাঁড়ির সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) রবিউল ফোন করে ট্রেনে কাটা পড়ে পারভেজের মৃত্যুর খবর জানান।

পারভেজের মা অভিযোগ করে বলেন, ‘ছাত্রলীগ নেতা বাঁধন আমার ছেলেরে মাইরা ফালাইবো কইয়া হুমকি দিছিল। হের লাইগ্যা ডরাইয়া ছেলেডা গাড়ির (ট্রেনের) নিচে পইড়া জীবনডাই শেষ কইরা দিল। আমি হেগর সবার বিছার চাই। ’

তবে ছাত্রলীগ নেতা বাঁধন দাস বলেন, ‘সুমন নামে একজন ছেলের মাথা ফাটিয়েছিল পারভেজ। পরে আপসের জন্য ডেকে নিয়েছিলাম পারভেজসহ তাঁর পরিবারকে। পারভেজের মা বলেছিল চার হাজার টাকা দেবে ওই ছেলেটিকে চিকিৎসার জন্য। পরদিন পারভেজের বড় ভাই উল্টো সুমনের কাছে ১০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেছিল। ’ পারভেজসহ তাঁর পরিবারের কাউকে তিনিসহ তাঁর কোনো কর্মী হুমকি দেননি বলেও জানান বাঁধন।


মন্তব্য