kalerkantho


যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাব গৃহীত

রোহিঙ্গা নির্যাতনকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞার ডাক

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



রোহিঙ্গা নির্যাতনকারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞার ডাক

রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালানোর নিন্দা জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের আইন সভা কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ। ওই প্রস্তাবে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ওপর হামলা বন্ধ করার এবং রাখাইন রাজ্যে মানবিক সহায়তাকর্মীদের প্রবেশাধিকার অবিলম্বে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া মিয়ানমারের সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের হোতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান রয়েছে ওই প্রস্তাবে।

গত বুধবার ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলে প্রতিনিধি পরিষদে ‘বার্মার (মিয়ানমার) রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনযজ্ঞের নিন্দা এবং হামলা বন্ধ ও অবিলম্বে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পুনঃ প্রতিষ্ঠার আহ্বান’ শীর্ষক প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শেষে ৪২৩-৩ ভোটে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। ছয়জন সদস্য ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন।

জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র গত মঙ্গলবার নিউ ইয়র্কে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, রোহিঙ্গারা রাখাইনে ফিরে যাওয়ার মতো নিরাপদ বোধ না করলে তাদের জোর করে ফেরত পাঠানো যাবে না। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের ডেপুটি হাইকমিশনার কেলি ক্লেমেন্টস গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বর্তমানে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনের জন্য উপযুক্ত অবস্থায় নেই।

মার্কিন কংগ্রেসম্যান জোসেফ ক্রাউলি গত ৭ নভেম্বর প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। গত বুধবার প্রস্তাবটি গৃহীত হওয়ার পর এবার তা সিনেটে উঠছে। সিনেটে প্রস্তাবটি গৃহীত হলে মিয়ানমার নতুন করে বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়বে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক সহায়তাসহ মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতাও কাটছাঁট হবে।

প্রতিনিধি পরিষদে গৃহীত আট দফা প্রস্তাবের প্রথম দফায় বেসামরিক জনগণের ওপর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর হামলার নিন্দা এবং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বেসামরিক জনগণের ওপর সব ধরনের হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক মিন অং হ্লাইংয়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রস্তাবের দ্বিতীয় দফায় মিয়ানমারে সহিংসতা ও হামলা থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকারের জোরালো প্রশংসা রয়েছে। তৃতীয় দফায় আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) হামলার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, এসব হামলা কোনোভাবেই অসংযমী প্রতিক্রিয়ার যৌক্তিকতা প্রমাণ করে না। মিয়ানমার বাহিনীর অসংযমী প্রতিক্রিয়ায় বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন, হত্যাযজ্ঞ ও জাতিগত নিধন হয়েছে। প্রস্তাবের চতুর্থ দফায় ন্যায়বিচার, সামাজিক পুনর্মিলন, মানবিক সহায়তা ও নাগরিকত্বের মতো বিষয়সহ রাখাইন রাজ্যবিষয়ক পরামর্শক কমিশনের (আনান কমিশন) সুপারিশ বাস্তবায়নে গঠনমূলক কাজ করতে অং সান সু চির নেতৃত্বে মিয়ানমার সরকার এবং সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুতদের কাছে অব্যাহতভাবে ত্রাণ পৌঁছানোর সুযোগ দিতে মিয়ানমার সরকার এবং দেশটির সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে প্রস্তাবের পঞ্চম দফায়। ষষ্ঠ দফায় জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাউন্ডিং মিশনকে মিয়ানমারে প্রবেশের সুযোগ দিতে এবং সহযোগিতা করতে দেশটির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে মার্কিন কংগ্রেস। গত বছর অক্টোবর থেকে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে ওই মিশন গঠন করে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ। কিন্তু ওই মিশনকে ঢুকতে দিচ্ছে না মিয়ানমার। প্রস্তাবের সপ্তম দফায় রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফেরার ক্ষেত্রে অন্যায্য বাধাগুলো দূর করতে এবং রাখাইনে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখা আইন ও নীতিগুলো পরিবর্তন করতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে মার্কিন কংগ্রেস। অষ্টম দফায় মিয়ানমারের সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের হোতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রস্তাব নিয়ে প্রতিনিধি পরিষদে আলোচনায় পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাড রয়েস রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমার সরকার ধারাবাহিকভাবে সংখ্যালঘু মুসলমান রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের বেশির ভাগ কয়েক প্রজন্ম ধরে মিয়ানমারে বসবাস করে এলেও ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনে তাদের নাগরিকত্ব প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে চলাচলের স্বাধীনতা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তিনি আরো বলেন, পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটাতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর নতুন করে নির্মম ধরপাকড় অভিযান শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র যথার্থভাবেই একে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ছয় লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য করা হয়েছে।

রাখাইন রাজ্যে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা হত্যার শিকার হয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে অ্যাড রয়েস বলেন, সীমান্তে স্থলমাইন পাতা হয়েছে। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গাদের ধর্ষণসহ সব ধরনের সহিংসতা চালিয়েছে। তিনি বলেন, গৃহীত প্রস্তাবে সিনিয়র জেনারেল অং মিনের নেতৃত্বে বেসামরিক জনগণের ওপর হামলারই কেবল নিন্দা জানানো হয়নি; বরং রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনযজ্ঞ চলার বিষয়টিও জোর দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। সু চিকে অবশ্যই রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের সবার মানবাধিকার সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

কংগ্রেসম্যান স্টেনি হোয়ার বলেন, ‘এই হত্যাযজ্ঞ অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। বার্মার (মিয়ানমারের) নেতাদের কাছে শক্তিশালী বার্তা পাঠানোই আমাদের প্রস্তাবের উদ্দেশ্য। ’

কংগ্রেসম্যান এলিয়ট এল এনজেল বলেন, প্রস্তাবে অং সান সু চিকে নৈতিক নেতৃত্ব চর্চার আহ্বান জানানো হয়েছে; যা বর্তমানে খুব প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালানোর যে দাবি করছে তা আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। সেখানে যা ঘটেছে তা আক্ষরিক অর্থেই জাতিগত নিধনযজ্ঞ। ’

‘বার্মা অ্যাক্ট ২০১৭’ বিলও বিবেচনাধীন : জানা গেছে, এর আগে ২ নভেম্বর মার্কিন কংগ্রেসে ‘বার্মা অ্যাক্ট ২০১৭’ নামের একটি বিল উত্থাপিত হয়েছে। ওই বিলের পুরো নাম ‘২০১৭ সালের কঠোর সামরিক জবাবদিহিতা আইনের মাধ্যমে একীভূত বার্মা’। প্রস্তাবিত ওই বিলে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান এবং মিয়ানমারে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বড় ধরনের সংস্কার প্রত্যাশা করা হয়েছে। এ ছাড়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট বেশ কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ রয়েছে।

কংগ্রেসের বিবেচনাধীন ওই বিলে বলা হয়েছে, মিয়ানমার গণতন্ত্রের পথযাত্রায় অর্থবহভাবে অগ্রসর হলেও বেশ কিছু বাধা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ২০০৮ সালের সংবিধান এবং আইনি ও সরকারি কাঠামো অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস মনে করে, মিয়ানমারের পার্লামেন্টের ২৫ শতাংশ আসনে নিয়োগের ব্যাপারে দেশটির সামরিক বাহিনীর সরাসরি ও অগণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ বন্ধ হতে হবে। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও সীমান্তবিষয়কসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে সামরিক নিয়ন্ত্রণ বন্ধ হতে হবে।

ওই বিলে মানবাধিকার লঙ্ঘনে সম্পৃক্ত সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, বিল গৃহীত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে এবং ছয় মাস পর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সংশ্লিষ্ট কংগ্রেস কমিটিকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা মিয়ানমারের সামরিক কর্মকর্তাদের নামের তালিকা অবহিত করবেন। রোহিঙ্গাসহ অন্যদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের নির্দেশদাতা জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা ও অধীনস্তদের মানবাধিকার লঙ্ঘন তদন্তে ব্যর্থ হওয়া কর্মকর্তাদের ওই তালিকায় স্থান দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। ভিসা নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওই ব্যক্তিদের ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করবেন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে বের করার ব্যবস্থা নেবেন। গত বছরের অক্টোবর থেকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্মূল অভিযান চালানোর জন্য মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক মিন অং হ্লাইং, মেজর জেনারেল মং মং সো, মেজর জেনারেল খিন মং সোসহ সংশ্লিষ্ট সব জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা ও তাঁদের সহযোগীদের যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।


মন্তব্য