kalerkantho


বিচারকদের চাকরিবিধির চূড়ান্ত খসড়া সুপ্রিম কোর্টে

নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রপতির হাতেই!

এম বদি-উজ-জামান   

২২ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রপতির হাতেই!

নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিধিমালার চূড়ান্ত খসড়া সুপ্রিম কোর্টে পাঠিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়। খসড়াটি পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে রেখেই বিধিমালার খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির সঙ্গে আইনমন্ত্রীর বৈঠকের পর আইন মন্ত্রণালয় এই খসড়া পাঠাল। সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন পেলে তা পাঠানো হবে রাষ্ট্রপতির কাছে। যদিও গেজেট জারির বিষয়ে আগামী ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারকে সময় বেঁধে দেওয়া রয়েছে। আইনমন্ত্রী কয়েক দিন আগেই আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, নির্ধারিত সময়ের আগেই গেজেট জারি করা সম্ভব হবে। তবে পুরোটা এখন নির্ভর করছে নতুন চূড়ান্ত খসড়ার ওপর আপিল বিভাগের মতামত কী হয় তার ওপর।

সুপ্রিম কোর্টের স্পেশাল অফিসার ও মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যারিস্টার মো. সাইফুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ গেজেটের খসড়া পেয়েছি। তবে এর চেয়ে বেশি কিছু জানি না। ’

খসড়ার বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘চূড়ান্ত খসড়া সুপ্রিম কোর্টকে দেওয়া হয়েছে।

এ খসড়া সুপ্রিম কোর্ট থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরত গেলেই তা অনুমোদনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। নিয়ন্ত্রণক্ষমতা কার কাছে থাকছে তা গেজেট জারির পরই জানতে পারবেন। ’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারের সবচেয়ে বড় আপত্তির জায়গা ছিল নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা কার হাতে থাকবে তা নিয়ে। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে এ ক্ষমতা এখন রাষ্ট্রপতির হাতে। তবে সুপ্রিম কোর্ট রাষ্ট্রপতিকে বাদ দিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রস্তাব করেছিল। ওই প্রস্তাব নিয়ে গত ১৬ নভেম্বরের বৈঠকে সমঝোতা হয়েছে বলে জানা গেছে। সূত্র মতে, নিয়ন্ত্রণক্ষমতা এখন যে অবস্থায় রয়েছে সে অবস্থায় অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির হাতেই থাকছে।

সুপ্রিম কোর্টের সংশোধন করা খসড়া নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে জোর আপত্তি তোলা হয়। বিশেষ করে বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা কার হাতে থাকবে তা নিয়ে কথা ওঠে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আইনজীবীদের এক অনুষ্ঠানে বলেন, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্ট নিতে চান।

নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিধিমালা জারি করা নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিচার বিভাগের টানাপড়েন চলছে দীর্ঘদিন ধরেই। সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সময়ে এ টানাপড়েন চরম পর্যায়ে পৌঁছে। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের আলোকে নিম্ন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে রেখে গত বছর বিধিমালার খসড়া চূড়ান্ত করে তা সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করেছিল আইন মন্ত্রণালয়। কিন্তু ওই খসড়া আপিল বিভাগের মনঃপূত না হওয়ায় তার কয়েকটি জায়গায় কিছু শব্দ পরিবর্তন করা হয়। বিশেষ করে দুটি শব্দ নিয়ে টানাপড়েন বেড়ে যায়। সরকারের করা খসড়ার ৩৭টি ধারার মধ্যে পাঁচটি ধারা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে খসড়া সংশোধন করে দেন আপিল বিভাগ। তাতে বিচার বিভাগের স্থানীয় নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে সরকারের প্রস্তাব বাতিল করে সুপ্রিম কোর্টকে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বলা হয়। এ ছাড়া সরকারের গেজেট জারির বিধান বাতিল করে নতুন বিধান যুক্ত করা হয়। তাতে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্ট যে তারিখে বিধিমালা কার্যকর করতে বলবে সেই তারিখে আইন মন্ত্রণালয় গেজেট জারি করবে। সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শে বিধিমালা কার্যকর করার বিধান রাখা হয়।

প্রেষণে সরকারের অন্য কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগে দায়িত্বরত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উত্থাপিত হলে তাঁকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্তির বিধান করা হয় খসড়ায়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট এতে বাদ সাধেন। সুপ্রিম কোর্ট ওই বিধান বাদ দেন। অভিযোগ ওঠার পর অনুসন্ধান করা নিয়েও সরকারের খসড়া নিয়ে আপত্তি জানান সুপ্রিম কোর্ট। খসড়ায় হাইকোর্টের বিচারকের পাশাপাশি অভিযুক্ত কর্মকর্তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দিয়ে অনুসন্ধান পরিচালনার বিধান করার প্রস্তাব করা হয়। এ ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে যেকোনো বিচারকের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করা এবং শুধু হাইকোর্টের বিচারক দিয়ে অনুসন্ধান করার ক্ষমতা চান।

গত ৩০ জুলাই প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বৈঠকে বসার জন্য আইনমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। এর জবাবে সেদিনই আইনমন্ত্রী টেলিফোনে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কথা বলেন এবং ৩ আগস্ট বৈঠকের দিন নির্ধারণ করেন। কিন্তু আইনমন্ত্রী অসুস্থ থাকায় নির্ধারিত দিনে বৈঠকটি হয়নি। এ অবস্থায় প্রধান বিচারপতি গত ৬ আগস্ট আবারও বৈঠকে বসার আহ্বান জানান। কিন্তু সেই বৈঠকও হয়নি। এরই মধ্যে প্রধান বিচারপতি ছুটি নিয়ে বিদেশে গেছেন। এ অবস্থায় গত ৮ অক্টোবর ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা বসার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সেদিন তিনি আদালতে বলেন, ‘আমার মনে হয় এটা (বিধিমালা) হওয়া দরকার। এটা নিয়ে বসা দরকার। কোথায় কোথায় আপত্তি আছে সেটা খোঁজা দরকার। সময় চাচ্ছেন, সময় দিচ্ছি। তবু এটা হওয়া দরকার। ’ এরপর গত ১১ অক্টোবর ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টে এক বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আপিল বিভাগের সকল বিচারপতির সঙ্গে বসব। আশা করি আগামী নির্ধারিত তারিখের আগেই সুরাহা হবে। ’ এরই ধারাবাহিকতায় গত ৫ নভেম্বর আপিল বিভাগে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতকে জানিয়েছিলেন যে আইনমন্ত্রী আপিল বিভাগের বিচারপতিদের সঙ্গে বসতে চান। গত ১৬ নভেম্বর আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির সঙ্গে বৈঠক করেন আইনমন্ত্রী। ওই বৈঠকেই বিধিমালা নিয়ে মতবিরোধ দূর হয় বলে সাংবাদিকদের জানান আইনমন্ত্রী। তিনি সেদিন বলেছিলেন, ‘যেসব মতবিরোধ ছিল সেগুলো নিরসন করেছি। মতপার্থক্য দূর করেছি। আমরা শৃঙ্খলাবিধির ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছেছি। এটা মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাব। মহামান্য রাষ্ট্রপতির হুকুম পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা গেজেট প্রকাশ করব। যদি রাষ্ট্রপতি রাজি হন তাহলে তাঁর অনুমতি নিয়ে আশা করছি ৩ ডিসেম্বরের আগেই গেজেট প্রকাশ করতে পারব। ’

১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর ১২ দফা নির্দেশনা দিয়ে মাসদার হোসেন মামলায় রায় দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ। তাতে নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশনাও ছিল। কিন্তু গত বছর ২৮ আগস্ট শুনানিকালে আপিল বিভাগ খসড়ার বিষয়ে বলেন, শৃঙ্খলা বিধিমালাসংক্রান্ত সরকারের খসড়াটি ছিল ১৯৮৫ সালের সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার হুবহু অনুরূপ, যা মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থী। এরপর ওই বছরের ১২ ডিসেম্বর আইন মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব আদালতে হাজির হয়ে রাষ্ট্রপতির একটি প্রজ্ঞাপন দাখিল করেন। ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, গেজেট জারির প্রয়োজন নেই। এর পরও আপিল বিভাগ ১৫ জানুয়ারির মধ্যে গেজেট জারির নির্দেশ দেন। কিন্তু গেজেট জারি না করে একের পর এক সময়ের আবেদন করছে রাষ্ট্রপক্ষ। এ প্রেক্ষাপটে গত ১৬, ২০ ও ২৭ জুলাই প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বৈঠক করেন আইনমন্ত্রী। ২৭ জুলাই খসড়া হস্তান্তর করেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট ওই খসড়া গ্রহণ করেননি।


মন্তব্য