kalerkantho


বিড়ালের মুখ থেকে ফিরে আসা নবজাতকের মৃত্যু

পুলিশ ও হাসপাতালকে দুষছে সবাই

শরীফ আহমেদ শামীম, গাজীপুর   

২১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



পুলিশ ও হাসপাতালকে দুষছে সবাই

জন্মের পরপরই ঠাঁই হয়েছিল ডাস্টবিনে। নবজাতকটি আরেকটু দেরি হলেই বিড়ালের খাবার হতো।

উদ্ধার করে একজন মায়ের মমতায় নিয়ে যান হাসপাতালে। কিন্তু উটকো ‘ঝামেলা’ হতে পারে ভয়ে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশুটিকে সামান্য চিকিৎসা দিয়ে ছাড়পত্র দিয়ে দেয় এবং বলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে। উদ্ধারকারী গার্মেন্টকর্মীর সে সামর্থ্য ছিল না। তাঁর মাথায় ছিল, রাতটা দেখে প্রয়োজনে টাকা-পয়সার ব্যবস্থা করে পরদিন ঢাকায় নিয়ে আসবেন। দুই মাসের ছুটিও তিনি নিয়েছিলেন ফোনে নিজ কর্মস্থল থেকে। কিন্তু মাঝরাতে তাঁর কোলে থাকা অবস্থায়ই হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে চলে যায় পিতৃমাতৃ পরিচয়হীন কন্যাশিশুটি। উদ্ধারকারী গার্মেন্ট শ্রমিক রেখা আক্তার নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে শিশুটির নাম রেখেছিলেন রাবেয়া আক্তার। সবাইকে বলেছিলেন, সন্তান পরিচয়েই তিনি নবজাতকটি বড় করতে চান। গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত শিশুটির জন্মদাত্রী মায়ের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

গতকাল দুপুরে গাজীপুর শহরের লক্ষ্মীপুরা এলাকার ভাড়া বাসায় গিয়ে দেখা গেছে কয়েকজন নারী রেখা আক্তারকে ঘিরে আছে। শিশুটিকে হারিয়ে রেখা শোকগ্রস্ত। বারবার চোখ মুছছিলেন। রেখা বলেন, তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল চেনেন না। সঙ্গে টাকা-পয়সাও তেমন ছিল না। তিনি শিশুটিকে সরকারি অ্যাম্বুল্যান্সে ঢাকায় পৌঁছে দিতে অনুরোধ করেছিলেন। হাসপাতালের কেউ শোনেনি। উপায় না দেখে তিনি শিশুটিকে নিয়ে বাসায় চলে আসেন। অনেকেই দত্তক হিসেবে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। নিজের ছেলে প্রতিবন্ধী। তাই শিশুটিকে মেয়ের মতো লালন-পালনের স্বপ্ন নিয়ে ঘরে ফিরে যান। সিদ্ধান্ত নেন টাকা জোগাড় করে সোমবার সকালে শিশুটিকে নিয়ে ঢাকায় যাবেন। এ সময় শিশুটি কান্না করছিল। প্রতিবেশী এক নারীর কাছ থেকে দুধ এনে খাওয়ান। খাওয়ার পর কান্না থেমে গেলে তিনি কাপড় গরম করে শিশুটির ক্ষতস্থানে (সম্ভবত বিড়ালের কামড়ে) সেঁক দেন। কিছুক্ষণ পর শিশুটি প্রস্রাব-পায়খানা করে। হাত-পা ছুড়ে খেলে। এতে রেখার মনে আশার সঞ্চার হয়, ভয় কেটে যায়। রেখা জানান, কী না কী হয়, ভেবে শিশুটিকে কোলে নিয়েই তিনি বসে ছিলেন। রাত ১টার  কিছুক্ষণ পর নড়াচড়া কমে গেলে তিনি ভাবেন হয়তো ঘুমাচ্ছে। এর পরও সন্দেহ হলে বাড়িওয়ালার স্ত্রীকে ডেকে আনেন। বাড়িওয়ালার স্ত্রী ধরে দেখে বলেন, ‘আল্লাহ তোমার বাচ্চাকে নিয়ে গেছে। ’ জানা যায়, গতকাল দুপুরে রেখার দেবর মনির হোসেন ও এলাকার মানুষ মিলে শিশুটিকে পশ্চিম লক্ষ্মীপুরা এলাকার দৌলা কবরস্থানে দাফন করে। রেখাসহ অনেকেই অভিযোগ করে, হাসপাতাল থেকে বের করে না দিলে নবজাতকটির এই অকালমৃত্যু হতো না।

গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসকও নাম গোপন রাখার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁদের হাসপাতালেই শিশুটির চিকিৎসা সম্ভব ছিল। শুধু ঝামেলা এড়াতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে পাঠানোর যথাযথ ব্যবস্থা না করে ‘রেফার্ড’ লিখে তড়িঘড়ি শঙ্কটাপন্ন শিশুটিকে হাসপাতাল থেকে রেখা আক্তারের কাছে ছেড়ে দেওয়া হয়।

তবে হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. প্রণয় ভূষণ দাস কালের কণ্ঠকে বলেন, শিশুটি ভূমিষ্ঠ হওয়ার ঘণ্টা দুই পরেই হাসপাতালে আনা হয়। তাকে ময়লাভর্তি একটি ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। শিশুটির শরীরে বিভিন্ন স্থানে ক্ষত ছিল।   হাসপাতালের ব্রাদার্স ও চিকিৎসকরা তাকে বাঁচানোর সম্ভব সব চেষ্টা করেছেন। তাকে অক্সিজেন, স্যালাইন বিভিন্ন ইনজেকশন দেওয়া হয়। শিশুটিকে হাসপাতালে আনার পরপরই ঘটনাটি জয়দেবপুর থানার ওসি ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এনডিসিকে জানানো হয়। হাসপাতালের অ্যাম্বুল্যান্স অন্য রোগী নিয়ে ঢাকায় থাকায় রেখা বেগমকে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু সিস্টারদের চোখ এড়িয়ে রেখা আক্তার একপর্যায়ে কাউকে না জানিয়ে শিশুটিকে নিয়ে চলে যান।

হাসপাতালের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর সদর হাসপাতালটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে উন্নীত হওয়ার পর দুই শতাধিক ডাক্তার পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। সব বিভাগে পর্যাপ্ত ডাক্তার ও কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি পড়ে থাকলেও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের নেতাদের দাপটে আইসিও এবং ২৪ ঘণ্টা অপারেশন থিয়েটার চালু করা যাচ্ছে না। দুপুর ২টার পর জরুরি বিভাগ ছাড়া হাসপাতালে ডাক্তার থাকেন না। তাঁরা বাইরে রোগী দেখে ব্যস্ত সময় কাটান।

হাসপাতালের পরিচালক ডা. সৈয়দ মো. হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘শিশুটিকে হাসপাতালের অ্যাম্বুল্যান্সে ঢাকা মেডিক্যালে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই মহিলা শিশুটিকে বাড়িতে নিয়ে যান। এ ঘটনায় কর্তব্যরত সিস্টারদেরও দায়িত্বে অবহেলা রয়েছে। ’ 

জয়দেবপুর থানার ওসি মো. আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, দুপুরে হাসপাতাল থেকে খবর দেওয়া হলে পুলিশ গিয়ে দেখে নবজাতকটি হাসাপাতালে ভর্তি। এরপর পুলিশ চলে আসে। পরে যে শিশুটিকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়, তা পুলিশকে আর জানানো হয়নি এবং পুলিশও নিজ থেকে আর খোঁজ নেয়নি।

রেখা আরো জানান, শিশুটিকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে ভর্তি করা হয়। অক্সিজেনও দেওয়া হয়। পরে চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র দিলে তিনি ২৩০ টাকা দিয়ে বাইরে থেকে ওষুধ কিনে আনেন। ‘রোগীর অবস্থা ভালো নয়’ জানিয়ে এক ঘণ্টা পর ছাড়পত্র দিয়ে চিকিৎসক শিশুটিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। তিনি ওই হাসপাতালেই শিশুটির চিকিৎসার ব্যবস্থার অনুরোধ করলেও কেউ শোনেনি। একপর্যায়ে বেডে অন্য রোগী তুলে দেওয়া হয়।

প্রতিবেশী সিদ্দিক মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রেখা শিশুটিকে বাঁচানোর সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন। শিশুটির মৃত্যুতে রেখার মতো আমরাও শোকাহত। ওই হাসপাতালে কোনো চিকিৎসা নেই। রোগী গেলেই ঢাকায় রেফার্ড লিখে বিদায় করে দেওয়া হয়। ’

হাসপাতালের জরুরি বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নবজাতকটিকে গত রবিবার দুপুর ২টা ১০ মিনিটে জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন রেখা আক্তার। রেজিস্টারে লেখা তথ্য অনুযায়ী শিশুটি ঠাণ্ডাজনিত শ্বাসকষ্টে ভুগছিল। তার বাঁ চোখ, গলা ও মুখে রক্তাক্ত জখম ছিল। জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. রাশেদুল ইসলাম শিশুটিকে অক্সিজেন দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে ভর্তি করতে বলেন। পরে তাকে শিশু বিভাগের পি২৪ নম্বর বেডে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে বিকেলে চিকিৎসক ছাড়পত্র দিয়ে শিশুটিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন।

 


মন্তব্য