kalerkantho


কোন্দলের কারণেই বড় দুই দলে একাধিক মনোনয়নপ্রার্থী

তারিকুল হক তারিক, কুষ্টিয়া   

২০ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



কোন্দলের কারণেই বড় দুই দলে একাধিক মনোনয়নপ্রার্থী

ভারত সীমান্তঘেঁষা কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের ৭৫ নম্বর আসন। এটি কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসন।

এ উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা দুই লাখ ৬৭ হাজার ৯৩০ জন।

আসনটি আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির দখলে ছিল বিভিন্ন সময়। তবে একসময় আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত আসনটি বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলের ‘বিদ্রোহীর’ কবজায়। সে কারণে কোন্দলও রয়েছে এখানে। অন্যদিকে সংসদের বাইরে থাকা বিএনপিতেও কোন্দল রয়েছে। যে কারণে দুই দলেরই একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী নির্বাচনকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন এলাকায়।

উল্লেখ্য, ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আজিজুর রহমান আক্কাস জয়লাভ করেছিলেন। কিন্তু জিয়াউর রহমানের শাসনামলে শাহ আজিজুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এ আসনটি চলে যায় বিএনপির দখলে। এরশাদের শাসনামলে এ আসনটি আবার জাতীয় পার্টির দখলে যায়।

এরশাদের স্বৈরশাসনের পতনের পর ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আহসানুল হক মোল্লা পর পর তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। প্রতিবারই তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী আফাজ উদ্দিন আহমেদ। ২০০৩ সালের ১২ ডিসেম্বর আহসানুল হক মোল্লা মারা যাওয়ায় আসনটি শূন্য হয়। ২০০৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে জোটপ্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে তাঁর ছেলে রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাতীয় পার্টির নেতা সাবেক খাদ্য প্রতিমন্ত্রী কোরবান আলী। আওয়ামী লীগ ওই  উপনির্বাচন বর্জন করেছিল। নির্বাচনে পরাজিত হয়ে কোরবান আলী আওয়ামী লীগে যোগদান করেন।

পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে এখানে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আফাজ উদ্দিন আহমেদ। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আফাজ উদ্দিন আহমেদ আবার দলীয় মনোনয়ন পান। কিন্তু তাঁকে হারিয়ে দিয়ে সংসদ সদস্য হন দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী রেজাউল হক চৌধুরী।

এলাকাবাসী জানায়, এ আসন থেকে অন্য দলের যে-ই মনোনয়ন পান না কেন তাঁকে ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সঙ্গে।

আওয়ামী লীগ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক সংসদ সদস্য আফাজ উদ্দিন আহমেদ আবার মনোনয়ন পেতে সক্রিয় রয়েছেন। দশম সংসদ নির্বাচনে দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জয়লাভ করা রেজাউল হক চৌধুরীও নির্বাচন করবেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে কুষ্টিয়া বিশেষ জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শরীফ উদ্দিন রিমনও মনোনয়ন পাওয়ার লক্ষ্যে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

দলীয় নেতাকর্মীরা জানায়, এ আসনে আওয়ামী লীগের বর্তমান ও সাবেক দুই সংসদ সদস্যের মধ্যকার সম্পর্ক খুবই খারাপ। পরিস্থিতি এমন যে কেউ কারো মুখ পর্যন্ত দেখেন না। তাঁদের দুজনকে ঘিরে এখানে আওয়ামী লীগ দুই ভাগে বিভক্ত।

নেতাকর্মীরা জানায়, ২০১৪ সালে রেজাউল হকের নেতৃত্বে দৌলতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের নতুন কমিটি করা হয়। কিন্তু সেই কমিটি অনুমোদন পায়নি। আগের কমিটিতে তিনি সহসভাপতি ছিলেন। ওই কমিটির সভাপতি ছিলেন আফাজ উদ্দিন আহমেদ।

সাবেক সংসদ সদস্য আফাজ উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার সময়ে আমি কী করেছি তা এলাকার মানুষ জানে। তার পরও এক কেন্দ্রীয় নেতার কারণে গতবার আমাকে পরাজয়বরণ করতে হয়েছে। আশা করি আমার কাজের মূল্যায়ন করলে আমি মনোনয়ন পাব। ’

বর্তমান সংসদ সদস্য রেজাউল হক চৌধুরী বলেন, ‘কে কী বলল সেটা বিষয় নয়। আমরা ক্ষমতায় থেকে এলাকায় কতটুকু উন্নয়ন করলাম সেটাই বিবেচ্য। আমি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে এলাকার উন্নয়নমূলক কাজ করেছি। এলাকার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তাদের জন্য আমার রাজনীতি। আশা করি মনোনয়ন আমিই পাব এবং এ জন্য আমি কাজ করে যাচ্ছি। ’

রিমন বলেন, ‘এলাকার মানুষজন এখানকার সাবেক আর বর্তমান সংসদ সদস্যের কাউকেই ভরসা করতে পারছে না। সে জন্য আমি আগামীতে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করছি। ’

বিএনপি : ২০০৩ সালের উপনির্বাচনে বিএনপির রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা নির্বাচিত হওয়ার পর নানা কারণে সমালোচিত হন। এরপর ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি রাজনীতি থেকে নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নেন। সে কারণে এ আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি জোটের প্রার্থী করা হয়েছিল জেলা বিএনপির সহসভাপতি আলতাফ হোসেনকে। অবশ্য বর্তমানে সাবেক সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লাই এ আসনে বিএনপির হাল ধরে রেখেছেন। তিনি গণসংযোগের পাশাপাশি দলকে সংগঠিত করার কাজ করছেন। বাচ্চু মোল্লার পাশাপাশি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শহীদ সরকার মঙ্গল, দলের আরো দুই নেতা আলতাফ হোসেন ও রমজান আলী সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে এলাকায় গণসংযোগ করছেন। এ ছাড়া জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক অনুসারী জেলা বিএনপির সহসভাপতি মিনহাজুর রহমান আলোও নির্বাচনকেন্দ্রিক জনসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন।

রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সুসময়ে অনেকই পাশে থাকে। কিন্তু দুঃসময়ে দলের ধারেকাছেও কেউ নেই। আমি একাই সরকারি দলের নানা নিপীড়নের মধ্যেই দলের হাল ধরে দলকে টিকিয়ে রেখেছি। যে কারণে মনোনয়ন নিয়ে আমি চিন্তিত নই। ’

শহীদ সরকার মঙ্গল ও আলতাফ হোসেনও দাবি করেছেন যে তাঁরা সুখে-দুঃখে দলের সঙ্গেই ছিলেন। জেল-জুলুম, অত্যাচার সহ্য করে এখনো দলের সঙ্গেই আছেন তাঁরা। আগামীতে তাঁরা দলের কাছে মনোনয়নও চাইবেন।

অন্যান্য : কুষ্টিয়া-১ আসনে জাতীয় পার্টির (মঞ্জু) জেলা আহ্বায়ক রোটারিয়ান জাহাঙ্গীর হোসেন, জাতীয় পার্টির (এরশাদ) জেলা সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার জামিল জুয়েল ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) শরিফুল কবীর স্বপন সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে এলাকায় তৎপরতা চালাচ্ছেন। জাতীয় পার্টির (জেপি) আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘কারো সাথে ব্যক্তি বিরোধিতা বা হিংসা-বিদ্বেষ নয়, এলাকার মানুষের জীবন মানের উন্নয়নের জন্য আমি এখানে নির্বাচনে আগ্রহী এবং সেই লক্ষ্যে কাজ করছি। ’


মন্তব্য