kalerkantho


প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিং

গবেষণার পদ্ধতিগত ত্রুটি নিয়ে প্রশ্ন নর্থ সাউথের

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২০ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



গবেষণার পদ্ধতিগত ত্রুটি নিয়ে প্রশ্ন নর্থ সাউথের

প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির র‍্যাংকিং বিষয়ক গবেষণার পদ্ধতিগত ত্রুটি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (এনএসইউ)। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী ফ্যাকচুয়াল র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষে রয়েছে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি আর পারসেপচুয়াল র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষে রয়েছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।

তবে দুটির সমন্বয়ে নর্থ সাউথকে পেছনে ফেলে র‍্যাংকিংয়ের প্রথম স্থান দখল করে নিয়েছে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি। এনএসইউ কর্তৃপক্ষ বলছে, ফ্যাকচুয়াল ডাটাটি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন-ইউজিসি থেকে নেওয়া ২০১৪ সালের তথ্য। বাস্তবে তা ২০১৩ সালের তথ্য। আর পারসেপচুয়াল ডাটা সাম্প্রতিক সময়ের। যদি ফ্যাকচুয়াল ডাটাটিও সাম্প্রতিক সময়ের হতো তাহলে নর্থ সাউথের পয়েন্ট আরো অনেক বেড়ে যেত। তবে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি প্রথম হলেও তাদের সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্ব নেই বলে জানায় এনএসইউ কর্তৃপক্ষ।

সম্প্রতি দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ে বাংলা ট্রিবিউন-ঢাকা ট্রিবিউনের যৌথ উদ্যোগে একটি র‍্যাংকিং নির্ণয়বিষয়ক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে প্রথম স্থান অর্জন করে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি। এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি এবং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছে ওআরজি কোয়েস্ট রিসার্চ লিমিটেড।

গবেষণায় ফ্যাকচুয়াল স্কোর করা হয়েছে কয়েকটি ক্যাটাগরির ওপর। যেমন—মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা, লাইব্রেরিতে বইয়ের সংখ্যা, গবেষণা ব্যয়, পিএইচডি ডিগ্রিধারীর সংখ্যা, ক্যাম্পাসের আয়তন, শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত, পূর্ণকালীন শিক্ষকের হার ও গবেষণাপত্রের সংখ্যা। আর পারসেপচুয়াল স্কোরের ক্ষেত্রে শিক্ষার পরিবেশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শিক্ষকদের মান, চাকরি ক্ষেত্রে পাস করা শিক্ষার্থীদের কর্মদক্ষতা, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা ইত্যাদি দেখা হয়েছে। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির মোট স্কোর ৭৮.৯৫ আর নর্থ সাউথের স্কোর ৭১.১৩।

গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশের ৯ দিন পর গতকাল রবিবার এনএসইউ কর্তৃপক্ষ র‍্যাংকিং নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়সভার আয়োজন করে। বিশ্ববিদ্যালয়টির নিজস্ব ক্যাম্পাসে আয়োজিত এই সভায় উপস্থিত ছিলেন উপাচার্য প্রফেসর আতিকুল ইসলাম, গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ বিভাগের পরিচালক প্রফেসর শরিফ নুরুল আহকাম, জনসংযোগ বিভাগের প্রধান বেলাল আহমেদসহ রেজিস্ট্রার ও বিভিন্ন বিভাগের ডিনরা।

প্রফেসর শরিফ নুরুল আহকাম গবেষণার বিভিন্ন পদ্ধতিগত ত্রুটি উল্লেখ করে বলেন, ‘শিক্ষক-শিক্ষার্থীর স্ট্যান্ডার্ড অনুপাত ১ঃ২০। সেখানে ব্র্যাকে দেখানো হয়েছে ১ঃ১১ আর এনএসইউর ১ঃ১৮। আমাদের অনুপাত স্ট্যান্ডার্ড থাকলে কেন কম নম্বর দেওয়া হবে? এনএসইউতে পিএইচডিধারী শিক্ষকের সংখ্যা ৪৯৯ জন দেখানো হয়েছে, আর ব্র্যাকে আছে ১৭৭ জন। এ ছাড়া প্রফেসরসহ অন্যান্য শিক্ষকের সংখ্যাও ব্র্যাকের চেয়ে দ্বিগুণ নর্থ সাউথে। তার পরও নম্বরের তেমন তারতম্য হয়নি। ’

এনএসইউর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের এই পরিচালক বলেন, ‘রিপোর্টটা ঠিকভাবে করা হয়নি। যাঁরা এর দায়িত্বে ছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন বাদে অন্যরা কেউ পরিসংখ্যানবিদ নন। পদ্ধতিতেও বেশ ত্রুটি রয়েছে। আমাদের দেখানো হয়েছে, আমরা গবেষণায় মাত্র ৫৪ লাখ টাকা খরচ করেছি, অন্যদিকে ব্র্যাক করেছে ৪০ কোটি টাকা। এটা কি বাস্তবতা হতে পারে? অথচ নর্থ সাউথ এখনো গবেষণায় বেস্ট। তাহলে যাঁরা গবেষণাটি করেছেন তাঁদের কি এতটুকু দায়িত্ববোধ ছিল না বিষয়টি খতিয়ে দেখার? আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার?’

প্রফেসর আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। ব্র্যাক র‍্যাংকিংয়ে এক নম্বর হয়েছে এ জন্য তাদের অভিনন্দন। কিন্তু এই র‍্যাংকিংয়ে আমাদের মনে অনেক প্রশ্ন জেগেছে। যেখানে আমরা অনেক বেশি নম্বর পেতে পারতাম, সেটা পাইনি। গবেষণায় পারসেপচুয়াল ডাটা নেওয়া হয়েছে ২০১৭ সালের আর ফ্যাকচুয়াল ডাটা প্রকৃত অর্থে ২০১৩ সালের। তাহলে দুটোর সমন্বয় কিভাবে হলো? এ ছাড়া কতগুলো ফ্যাক্টসও ঠিক হয়নি। ’

পৃথিবীর অন্যান্য দেশে বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়ে যে বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়া হয় এর অনেক কিছুই এই গবেষণায় আসেনি বলে জানান এনএসইউ উপাচার্য। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সম্পর্কে কী ভাবছে? কত বিদেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী আছে, কত ছাত্র বাইরে গেছে, কত শিক্ষক বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছেন? কত পিএইচডি শিক্ষক আছেন, শিক্ষক-কর্মকর্তা-শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কী ভাবছে তা দেখা উচিত। আর পাবলিকেশন্স কখনো বিভাগভিত্তিক হওয়া উচিত নয়। এটা হতে হবে শিক্ষকভিত্তিক। ’

নর্থ সাউথের শিক্ষার্থীদের নানা সুবিধার বিষয়ে উপাচার্য বলেন, ‘আমাদের ছয়তলা একটা বিল্ডিংয়ের পুরোটাই লাইব্রেরি। দেড় লাখ বই আছে সেখানে। আর ভার্চুয়াল জগতে অর্থাৎ অনলাইনে আমাদের বইয়ের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এনএসইউ উপাচার্য আরো বলেন, ‘ওআরজি কোয়েস্ট রিসার্চ লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপারে আমার জানা নেই। তারা যদি আমাকে কোনো চিঠি পাঠায় তাহলে অনেক সময় সেটার রেসপন্স নাও পেতে পারে বা আমার হাত পর্যন্ত তা নাও আসতে পারে। এত বড় একটি গবেষণার আগে তাদের উচিত ছিল আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা বা আমার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা। কিন্তু সেটা তারা করেনি। আমার সঙ্গে দেখা করলে হয়তো তাদের আরো আপডেট তথ্য দিতে পারতাম। তবে আমরা র‍্যাংকিং প্রত্যাখ্যান করছি না। কিন্তু পদ্ধতিটা আরো অনেক শক্ত হওয়া উচিত ছিল। ’

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই র‍্যাংকিংয়ের বিষয়ে ইউজিসিকে কিছুই জানানো হয়নি। আর এই গবেষণা কারা করেছে, কিভাবে করেছে, কোন মেথডে করেছে, তা আমাদের জানা নেই। তবে কারো এ ধরনের গবেষণা করতে বাধা নেই। কিন্তু সেটা অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হওয়া উচিত। ’  এর সদস্যরা হলেন—অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, ওআরজি কোয়েস্টের চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর মনজুরুল হক, বাংলা ট্রিবিউনের সম্পাদক জুলফিকার রাসেল, প্রথম আলোর বার্তা সম্পাদক শরিফুজ্জামান পিন্টু এবং ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেটিকস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের সিইও সাঈদ আহমেদ।

গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছিল যে উপদেষ্টা কমিটির তত্ত্বাবধানে, তার অন্যতম সদস্য অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সরাসরি গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম না। কী কী সূচক হতে পারে সেটা নির্ধারণ করে দেওয়া আমাদের কাজ ছিল। ওই অনুযায়ীই গবেষণার ছক তৈরি হয়েছে। আমার জানা মতে, গবেষণার জন্য তথ্য চাওয়া হলেও সেটা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেয়নি। আর ফ্যাকচুয়াল ডাটাটি যদি সবার ক্ষেত্রেই ২০১৪ সালের নেওয়া হয়, তাহলে তো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আর কাউকে চিঠি দেওয়ার পর সে যদি উত্তর না দেয় তাহলে সেটা তাদের প্রশাসনিক দুর্বলতা। তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে সবাই যদি সহযোগিতা করত তাহলে গবেষণা আরো পরিপূর্ণ হতো, এটা ঠিক। আর নর্থ সাউথ কর্তৃপক্ষ যেসব ত্রুটির কথা বলেছে, গবেষণা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের উচিত আগামীতে সেগুলোর প্রতিও যত্নবান হওয়া। ’


মন্তব্য