kalerkantho


মিয়ানমারে আসেম বৈঠকেই এখন সবার দৃষ্টি

রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নিতে চাপ দেবে ইউরোপ

পরিস্থিতি দেখতে কক্সবাজারে পাঁচ পররাষ্ট্রমন্ত্রী

কূটনৈতিক প্রতিবেদক, ঢাকা ও নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার   

২০ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নিতে চাপ দেবে ইউরোপ

রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক হাইরিপ্রেজেন্টেটিভ ফেদেরিকা মগেরিনি। ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়াসহ এ সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে মিয়ানমারকে চাপ দেবে ইউরোপীয় দেশগুলো। মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে আজ সোমবার শুরু হচ্ছে দুই দিনব্যাপী এশিয়া ইউরোপ মিটিংয়ের (আসেম) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সমালোচনা ও চাপ এড়াতে মিয়ানমার যখন বিদেশি অতিথিদের দৃশ্যত এড়িয়ে চলছিল তখন আসেম বৈঠক নেপিডোতে বসে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির এক সুযোগ সৃষ্টি করেছে। আসেমের ৫৩টি সদস্যের মধ্যে আছে বেশ কটি ইউরোপীয় ও এশীয় দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ান সচিবালয়। বৈঠক উপলক্ষে ৫৩টি সদস্য দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংস্থার শীর্ষ প্রতিনিধিরা নেপিডোতে গেছেন।

এদিকে আসেম সদস্য হিসেবে নেপিডোতে গেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীও। সফরসূচি অনুযায়ী, আসেম বৈঠক শেষে আরো দুই দিন অর্থাৎ বুধ ও বৃহস্পতিবার মিয়ানমারে অবস্থান করবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সে সময় দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে একটি চুক্তির চেষ্টা চালাবে বাংলাদেশ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার এক কর্মকর্তা গতকাল রবিবার দুপুরে মিয়ানমারের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে কালের কণ্ঠকে বলেন, শেষ পর্যন্ত উভয় পক্ষ ছাড় দিলে একটি চুক্তি হতে পারে। ছাড় দেওয়ার বিষয়টি উভয় দেশের রাজনৈতিক পর্যায় থেকে আসতে হবে। তিনি বলেন, চুক্তি সইয়ের পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনের প্রসঙ্গ আসবে।

আন্তরিকতা থাকলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই কাজ শুরু করা সম্ভব। গত দুই মাসে মিয়ানমারের সুর আগের চেয়ে বেশ নরম হয়েছে। কিন্তু এখনো দেশটির আন্তরিকতার যথেষ্ট ঘাটতি আছে। তাই বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে সরব থাকবে।

জানা গেছে, গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নতুন মাত্রায় রোহিঙ্গা নিধন শুরুর পর ছয় লাখ ২১ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। একে সমসাময়িককালের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুততম বাস্তুচ্যুতি বলছেন বিশ্লেষকরা।

ঢাকাস্থ পশ্চিমা কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আসেমের বৈঠককে কাজে লাগাতে চায় ইউরোপীয় দেশগুলো। আনুষ্ঠানিক বৈঠকে এবং বৈঠকের ফাঁকে মিয়ানমারের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় ইউরোপীয় দেশগুলো রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কথা বলবে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকটের যে কত বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়েছে, তা অনুধাবন করার জন্য বেশ কটি ইউরোপীয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কক্সবাজার সফর বেশ সহায়ক হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশে পশ্চিমা দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরাই রোহিঙ্গা সংকটের ভয়াবহতার বিষয়ে নিজ নিজ দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়কে অবহিত করেছেন। বিষয়টিকে তাঁরা বেশ গুরুত্ব দিচ্ছেন।

এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী গতকাল সকালে জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিগমার গ্যাব্রিয়েল, সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গট ওয়ালস্ট্রম, জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কানো এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা বিষয়ক হাইরিপ্রেজেন্টেটিভ ফেদেরিকা মগেরিনিকে নিয়ে কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির পরিদর্শন করেছেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, পররাষ্ট্রসচিব মো. শহিদুল হকসহ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাঁদের সঙ্গে ছিলেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এভাবে একসঙ্গে বাংলাদেশ সফরের নজির নেই। পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তাঁদের বাংলাদেশ সফরে ভূমিকা রেখেছে। তাঁরা সবাই মিয়ানমারে যাওয়ার আগে পরিস্থিতি সরেজমিনে গিয়ে দেখেছেন।

জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিগমার গ্যাব্রিয়েল গতকাল রবিবার কক্সবাজারের কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, ‘সুইডেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপানে আমাদের সহকর্মীদের নিয়ে আমরা আসিয়ান (দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট) ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করব। আমরা জার্মানরা শরণার্থী (রোহিঙ্গা) ও স্থানীয় সম্প্রদায়কে আরো সহযোগিতার অঙ্গীকার করতে এবং এ ইস্যুতে আরো সম্পৃক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ’

জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আসিয়ানের বৈঠকে একটি জোরালো বার্তা আসা প্রয়োজন। আর ওই বার্তাটি হলো, রোহিঙ্গারা যাতে তাদের বাড়িঘরে ফিরে যেতে পারে এবং নিজেদের জীবন পুনর্নির্মাণ করতে পারে সে জন্য আমাদের সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। ’

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম সাংবাদিকদের বলেন, চার বিদেশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ দেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি দেখে খুব অবাক হয়েছেন। এর আগে তাঁরা কখনো এত কম জায়গায় এত বেশি মানুষ দেখেননি। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে আসেম বৈঠকে কথা বলবেন বলে তাঁরা জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ওই চার বিদেশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আলাদাভাবে সাক্ষাৎ করে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কথা বলেছেন।

মিয়ানমার বাহিনীর নৃশংসতাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ বললেন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্যরা : রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে দুই দিনের সফরে বাংলাদেশে আসা যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্যরা গতকাল মিয়ানমার যাওয়ার আগে ঢাকায় গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সে সময় তাঁরা রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার বাহিনীর নৃশংসতাকে যুদ্ধাপরাধের শামিল এবং মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেন। যুক্তরাষ্ট্র সিনেটের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির প্রভাবশালী সদস্য জেফ ম্যার্কলির নেতৃত্বে কংগ্রেস সদস্যরা বলেন, প্রত্যেক দেশের এই অপরাধ ও জাতিগত নিধনের নিন্দা জানানো উচিত। এই সংকটের সমাধান ও উদ্বাস্তুদের তাদের নিজ দেশে ফেরাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরো সোচ্চার হতে হবে। তাঁরা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদার সহযোগিতার প্রশংসা করেন।

মিয়ানমার বাহিনীর ভয়ংকর নিপীড়নের বর্ণনা দিয়ে জেফ ম্যার্কলি বলেন, তাঁরা কক্সাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে নির্যাতিতদের কাছ থেকে সরাসরি নিপীড়নের তথ্য সংগ্রহ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ইহসানুল করিম জানান, প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কফি আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, মানবিক কারণে মিয়ানমার বাহিনীর নৃশংসতার শিকার নাগরিকদের আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ।

ব্রিটিশ প্রিন্সেসের সংহতি : যুক্তরাজ্যের প্রিন্সেস সোফি হেলেন রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধে ও সংকট নিরসনে মিয়ানমারের ওপর জোরালো আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগে ঢাকার আহ্বানে সহমত পোষণ করে বাংলাদেশের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন। গতকাল গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে ‘কাউন্টিস অব ওয়েসেক্স’ প্রিন্সেস সোফি হেলেন ওই সংহতি জানান।

প্রিন্সেসকে উদ্ধৃত করে প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব বলেন, ‘যুক্তরাজ্য রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন চায়। ’

সহযোগিতার আশ্বাস জাপানের : রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাবাসনে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কোনো। গতকাল গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার একটি চুক্তি করতে সক্ষম হবে বলে জাপান আশা করছে।

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারকে তার নাগরিকদের এ দেশ থেকে ফিরিয়ে নিতেই হবে।

পরিস্থিতি দেখতে কাল আসছেন কানাডার মন্ত্রী : বাংলাদেশে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব ও রোহিঙ্গা পরিস্থিতি স্বচক্ষে দেখতে আগামীকাল মঙ্গলবার ঢাকায় আসছেন কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নমন্ত্রী ম্যারি-ক্লদ বিবু। সফরকালে তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখার পাশাপাশি সরকারি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।

জোরালো সমর্থন জার্মানি, সুইডেন ও ইইউর : রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশকে জোরালো সমর্থন দিয়েছে জার্মানি, সুইডেন ও ইইউ। জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিগমার গ্যাব্রিয়েল, সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গট ওয়ালস্ট্রম এবং ইইউর পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তাবিষয়ক হাইরিপ্রেজেন্টেটিভ ফেদেরিকা মগেরিনি গতকাল রবিবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে ওই সমর্থনের কথা জানান। তাঁরা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করেন।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইউরোপীয় ওই মন্ত্রীদের কাছে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি তুলে ধরেন। রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিন এ দেশে রাখা কঠিন হবে বলেও তিনি জানান।

ইইউ হাইরিপ্রেজেন্টেটিভ প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ‘আমরা রোহিঙ্গা ইস্যুতে আপনার (শেখ হাসিনার) প্রজ্ঞা ও মানবিক ভূমিকার তারিফ করি। ’

ফেদেরিকা মগেরিনি প্রধানমন্ত্রীকে জানান, আসেম বৈঠকের বিভিন্ন পর্যায়ে মিয়ানমার নেতাদের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে তিনি আলোচনা করবেন। ইইউ বাংলাদেশ সরকারের প্রতি সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।

সুইডিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গট ওয়ালস্ট্রম বলেন, বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সংহতি অত্যন্ত প্রয়োজন। সারা বিশ্বের জনগণ আশা করে, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে সু চি আরো সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন।

মার্গট ওয়ালস্ট্রম মিয়ানমার সফরকালে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সু চির সরকারকে উৎসাহিত করবেন বলে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একমত পোষণ করে মার্গট ওয়ালস্ট্রম বলেন, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে এবং নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও সম্মান নিশ্চিত করেই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন করা উচিত।


মন্তব্য