kalerkantho


৩০০ ফুটের সার্ভিস রোড শেষ হয়নি ১৩ বছরেও

তোফাজ্জল হোসেন রুবেল   

১৯ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



৩০০ ফুটের সার্ভিস রোড শেষ হয়নি ১৩ বছরেও

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ২০০৪ সালে পূর্বাচল ৩০০ ফুট সড়ক নির্মাণ শুরু করে। প্রায় ১৩ বছর আগে শুরু হওয়া এ প্রকল্প এখনো শেষ করতে পারেনি সংস্থাটি।

৩৫০ কোটি টাকার এ প্রকল্প নিয়ে কর্তৃপক্ষের সবচেয়ে বেশি গাফিলতি দেখা যায় সার্ভিস রোড নির্মাণে। এ সড়কের বেশ কিছু অংশ নির্মাণের কাজ এখনো বাকি রয়ে গেছে। আর যেটুকু নির্মাণ হয়েছে তাও দায়সারাভাবে। অনেক স্থানে ভেঙে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। র‌্যাম্প নির্মাণ করা হয়নি বেশির ভাগ অংশে। কর্তৃপক্ষের এসব গাফিলতির কারণে প্রায় সাত কিলোমিটার সার্ভিস রোডে যাতায়াতকারী মানুষ পড়ছে বিপাকে। যদিও রাজউক থেকে বলা হচ্ছে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সার্ভিস রোডের কাজ শেষ করা হবে।

নগরবিদ স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজউক হলো নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা। রাস্তা তৈরি করার কোনো এখতিয়ার তাদের নেই; কিন্তু লাভের আশায় তারা রাস্তা তৈরি করতে যায়, ফ্ল্যাট বানাতে যায়।

লাভের জন্য রাস্তা তৈরি শুরু করেছিল কিন্তু শেষ করার প্রয়োজন তারা মনে করছে না। সাধারণ মানুষের অসুবিধায় তাদের কী যায়-আসে। সিটি করপোরেশনের ভেতরের রাস্তা সংস্থাটি নিজেরা তৈরি করতে পারবে। ভুল হলে মানুষ তাদের দোষী বলে চিহ্নিত করে দাবি আদায় করতে পারবে; কিন্তু রাজউক রাস্তার কাজ হাতে নিয়ে এভাবে ফেলে রেখে দেয় অথচ তাদের বলার কেউ নেই। দেশের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের চোখের সামনে এ ধরনের অপরাধ ঘটে যাচ্ছে অথচ কোনো পদক্ষেপ আমরা দেখছি না। ’

রাজউকের অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক (এপিডি) উজ্জ্বল মল্লিক বলেন, ‘আমরা কুড়িল থেকে বালু নদ পর্যন্ত সার্ভিস রোডের কাজ করছি না। সেখানে খালের সঙ্গে সমন্বয় করে সেনাবাহিনী তা করবে। আর বালু নদের পর থেকে কাঞ্চন ব্রিজ পর্যন্ত সাত কিলোমিটার সার্ভিস রোডের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সেখানে কিছু র‌্যাম্প আর রাস্তার ফিনিশিং বাকি আছে। তা আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে। ’

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দীর্ঘ পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাস্তাটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখায় সার্ভিস রোড এখন নির্মাণসামগ্রী, ভাঙাচোরা গাড়িসহ বেসরকারি বাড়িঘরের নির্মাণসামগ্রী রাখার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। প্রায় পরিত্যক্ত এ রাস্তা জুড়ে গড়ে উঠছে অবৈধ হাটবাজার। তা ছাড়া খাল খননের কাদামাটি তুলে এ সার্ভিস রোডের ওপরই স্তূপ করে রাখা হয়েছে। ফলে রাস্তা হয়ে উঠেছে কাদাপানির পিচ্ছিল খাল। শুধু কি সার্ভিস রোড? ৩০০ ফুট প্রধান সড়কটির নির্মাণকাজও যেন শেষ হচ্ছে না। ইদানীং এ রোডের চারটি ব্রিজের স্টিল অ্যাঙ্গেল তুলে আবার নতুন করে স্থাপন করতে হচ্ছে। এতে ব্রিজের একপাশ বন্ধ করে অন্য পাশ দিয়ে উভয় দিকের গাড়ি চলাচল করায় প্রায়ই যানজটের সৃষ্টি, ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা।

পূর্বাচল নতুন শহরের সঙ্গে রাজধানীর সংযোগ সৃষ্টির জন্য রাজউক এক যুগেরও বেশি সময় আগে ৩০০ ফুট রাস্তা প্রকল্পটি হাতে নেয়; কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন যান চলাচলের ব্যবস্থা আজও করতে পারেনি তারা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গাফিলতি, ঠিকাদারের দায়সারা কাজ, দফায় দফায় পরিকল্পনা পরিবর্তনসহ নানা টালবাহানায় রাস্তাটি নানা ত্রুটি-বিচ্যুতিতেই আটকে থাকছে। ইদানীং আবার রাস্তাটির দুই পাশে ১০০ ফুট প্রশস্ত খাল নির্মাণ শুরু হওয়ায় আরেক দফা ধকলের মুখে পড়েছে সড়কটি। এসব কারণে বছরের পর বছর ধরে নির্মাণাধীন সড়কজুড়ে অসংখ্য খানাখন্দ, ধুলাবালির ওড়াউড়ি, বর্ষায় কাদাপানির মাখামাখি পথচারীসহ আশপাশ এলাকার বাসিন্দাদের চরম বিপাকে ফেলছে। এ সড়কে যাতায়াতকারী মানুষেরও দুর্ভোগের অন্ত থাকছে না। অন্যদিকে কুড়িল-কাঞ্চন ব্রিজ-গাউছিয়া বাইপাস সড়কের মাধ্যমে রাজধানীর যানজট নিরসনের শুভ উদ্যোগটি রীতিমতো অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জানা গেছে, কুড়িল থেকে বালু নদসংলগ্ন পূর্বাচল প্রকল্প পর্যন্ত সাড়ে ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৩০০ ফুট প্রস্থের রাস্তা নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ করে রাজউক। এ সড়কটিতে চার লেনের এক্সপ্রেসওয়ের দুই পাশে দুটি সার্ভিস রোড রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। দুটি সার্ভিস রোডের জন্য দুটি স্বতন্ত্র ব্রিজ এবং মধ্যবর্তী স্থানে এক্সপ্রেসওয়ের জন্য পৃথক একটি ব্রিজ নির্মাণের ব্যয় ধরা হয় ৩০ কোটি টাকা। এর পর থেকেই চলতে থাকে নকশা আঁকাআঁকি, টেন্ডার কর্মকাণ্ড আর মাটি ভরাটের নানা তৎপরতা। সব শেষে কয়েক লেনে ভাগ করে পাকাকরণের কাজ শুরু হয়। মধ্যবর্তী দুই এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ শেষে যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হলেও এক্সপ্রেসওয়ের অন্য দুটি রোড ও সার্ভিস রোডের দুটি লেন পাঁচ বছর ধরেই ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কুড়িল-পূর্বাচল ৩০০ ফুট সড়কের দুই পাশের সার্ভিস রোডটির বেহাল। কোথাও কোথাও রাস্তার কাজ বহুদিন আগে শেষ হলেও শেষ হয়নি সার্ভিস রোড নির্মাণকাজ। কুড়িল থেকে সার্ভিস রোড ধরে পূর্বাচলের ৪৫ নম্বর বালু ব্রিজের ঢালে ইট, বালু স্তূপ করে বন্ধ করে রাখা হয়েছে রাস্তা। এ রাস্তা ধরে কোনো গাড়ি গেলে তাদের আবার উল্টো ঘুরে এসে মূল রাস্তায় উঠতে হবে অথবা উল্টো পাশ দিয়ে গাড়ি চালিয়ে আসতে হবে। আর এতে যেকোনো সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে যাত্রীরা। ব্রিজ শুরু হওয়ার আধাকিলোমিটার আগে থেকেই শেষ হয়ে যায় সার্ভিস রোড।

রাস্তার কাজ শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে অটোরিকশাচালক সালাউদ্দিন বলেন, এই রাস্তা দিয়ে যাত্রী নিয়ে যাওয়া-আসা করতে আমাদের খুব অসুবিধা হয়। সার্ভিস রোডের কাজ শেষ না হওয়ায় মূল রাস্তা দিয়ে যেতে হয়। কিন্তু যাত্রীরা সার্ভিস রোডের পাশে নামতে চায়। মূল রাস্তায় গাড়ি থামার জায়গা নেই। তাই সার্ভিস রোড দিয়ে কিছু রাস্তা গিয়ে আবার মূল রাস্তায় উঠতে হয়। এভাবে একবার মূল রাস্তা আরেকবার সার্ভিস রোড দিয়ে যাওয়া আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যায়। ৪৬ নম্বর বালু ব্রিজের নিচে আন্ডারপাস দিয়ে এক পাশের রাস্তা অন্য পাশে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পূর্বাচল থেকে আসার রাস্তায় কোনো আন্ডারপাস না রেখে এবং রাস্তার কাজ শেষ না করে ফেলে রাখা হয়েছে। তাই না জেনে এই পথে কেউ যদি সার্ভিস রোডে ঢুকে পড়ে তাহলে সে আর নদী পার হয়ে আসতে পারবে না। এ জন্য উল্টো পথে তাকে আবার ঘুরে আসতে হবে।

নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসছিলেন ফায়েজ-সুজাতা দম্পতি। মূল রাস্তায় ভিড় থাকায় ফাঁকা সার্ভিস রোড দিয়ে কিছু দূর আসতেই ব্রিজের নিচে আটকে পড়েন তাঁরা। রাস্তা না থাকায় পথচারীরা তাঁদের আবার উল্টো পথে গিয়ে মূল রাস্তায় উঠতে বলে। বিরক্ত হয়ে ফায়েজ বলেন, ‘এভাবে কেউ রাস্তার কাজ ফেলে রাখে! অর্ধেক রাস্তা আছে আবার অর্ধেক নাই। মানুষকে এভাবে বিপদে ফেলার কোনো মানে হয়! এই রাস্তা যারা নির্মাণ করছে তাদের দায়দায়িত্ব কী? সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ানো ছাড়া এরা আর কিছু পারে না। ’

রাস্তার ওপর মাটির স্তূপ। মাটি শুকিয়ে ধুলাময় হয়ে উঠেছে পুরো রাস্তা। নদী থেকে ধেয়ে আসা বাতাসের সঙ্গে মিশে ধুলায় অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট। ৪৬ নম্বর ব্রিজ পার হতেই দেখা যায়, সার্ভিস রোডের ওপর রেখে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন মডেলের গাড়ি। বেশ কিছু দামি জিপে ‘সেল’ লেখা পোস্টার লাগিয়ে সার্ভিস রোড দখল করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। পাশেই টিনের ছাপরা ঘর তুলে চলছে গাড়ি মেরামতের কাজ। এগুলোর সব কিছুই চলছে রাস্তা দখল করে। দোকান মালিকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মালিক নাই, আমাকে বলতে পারেন। ’ মিজান নামের সেই কর্মচারীর কাছে রাস্তার ওপর দোকান কেন তৈরি করা হয়েছে—জানতে চাইলে বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই এখানে গাড়ি মেরামতের কাজ চলছে। আর এখান থেকে ব্রিজের ঢাল পর্যন্ত রাস্তা না থাকায় কেউ চাইলেও আর আগে যেতে পারবে না। এ জন্য আমরা এখানে দোকান করি। ’ ৪৫ নম্বর থেকে ৪৬ নম্বর বালু ব্রিজে যাওয়ার এই সার্ভিস রোডের কাজ শেষ না হওয়ায় জনগণ যাতায়াত করতে পারছে না। আর এই সুযোগ নিয়ে রাস্তা দখল করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে কিছু মানুষ।

স্থপতি ফয়েজউল্লাহ বলেন, যেকোনো প্রকল্প শুরু করলে তার আগে সার্ভিস রোড তৈরি করতে হয়, যাতে প্রকল্পের কারণে জনসাধারণের যাতায়াতে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটে উল্টো। অনেকটা ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার মতো। সার্ভিস রোড নির্মাণ না করলে মানুষ যাওয়া-আসা করবে কিভাবে। এত বছরেও রাজউকের কাজ শেষ করতে না পারা হতাশাব্যঞ্জক।

এ ব্যাপারে রাজউক চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান বলেন, ‘সার্ভিস রোড আমরা যতটুকু করেছি, নতুন করে আর কোনো কাজে হাত দেব না। যা অবশিষ্ট আছে, তা এ মুহূর্তে শেষ করার পরিকল্পনা নেই। পুরো এলাকা নিয়ে বিশদ পরিকল্পনার পর কাজে হাত দেওয়া হবে। ’


মন্তব্য