kalerkantho


শেষরাতে কলিংবেল ও অনিরুদ্ধর ফিরে আসা

ওমর ফারুক   

১৯ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



শেষরাতে কলিংবেল ও অনিরুদ্ধর ফিরে আসা

রাত ৪টা। কলিংবেলের শব্দে নতুন করে আঁতকে ওঠেন শাশ্বতী রায়।

দরজার কাছে গিয়ে পরিচয় জানতে চাইলে ওপার থেকে একজন বলেন, ‘আমি অনিরুদ্ধ। ’ শাশ্বতী দরজা খুলে যা দেখেন, নিজের চোখকেও বিশ্বাস হচ্ছিল না। সামনে দাঁড়িয়ে প্রায় তিন মাস ধরে নিখোঁজ থাকা স্বামী। শাশ্বতী আনন্দ-আবেগে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। সন্তানদেরও ঘুম ভেঙে যায়। রাজধানী থেকে নিখোঁজ ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধর এই ফিরে আসা পরিবারে যে বাঁধভাঙা আনন্দ নিয়ে আসে এর সঙ্গে কিছুর তুলনা হয় না।

গত ২৭ আগস্ট বিকেলে ঢাকার কূটনৈতিক পাড়া গুলশানের ১ নম্বর সেকশনের ইউনিয়ন ব্যাংকের সামনে থেকে একটি মাইক্রোবাসে অনিরুদ্ধকে তুলে নেওয়া হয়েছে বলে থানায় করা জিডিতে জানানো হয়েছিল। এর ৮৩ দিন পর গত বৃহস্পতিবার ঘরের মানুষ ঘরে ফেরেন।

গত ২৩ আগস্ট থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত আলোচিত নিখোঁজ কয়েক ব্যক্তির মধ্যে এ পর্যন্ত দুজন ফিরলেন এবং সন্ধান পাওয়া গেছে আরো দুজনের।

রাজধানীর ফকিরাপুল থেকে গত ২৩ আগস্ট দুপুরে তুলে নেওয়া হয়েছিল আইএফআইসি ব্যাংকের কর্মকর্তা শামীম আহমেদকে। এর পাঁচ দিন পর ২৮ আগস্ট রাতে বাসায় ফেরেন তিনি। তবে ফেরার পর তিনি অপহরণের বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। স্বজনরা বলছে, বাসায় ফিরে চুপচাপই থাকছেন শামীম। শামীম আহমেদের ফেরার আগের দিন ২৭ আগস্ট থেকে নিখোঁজ ছিলেন অনিরুদ্ধ।

এ ছাড়া বাংলাদেশ জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি মিঠুন চৌধুরী ও কেন্দ্রীয় নেতা আশিক ঘোষ অসিতেরও খোঁজ পেয়েছে তাঁদের পরিবার। দুজনকেই ডিবি পুলিশ আদালতে পাঠানোর পর খোঁজ পায় তারা।

অনিরুদ্ধর স্ত্রী শাশ্বতী রায় গতকাল শনিবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে জানান, স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তিনি দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারেন না। তাঁর সন্তানরাও বাবার চিন্তায় অস্থির থাকে সারাক্ষণ। বৃহস্পতিবার ভোররাতেও শাশ্বতী রায়ের ঘুম আসছিল না। কিছুটা তন্দ্রা ভাব আসতেই তিনি কলিং বেলের শব্দ পান। এত রাতে কে কলিং বেল বাজাল! চমকে যান তিনি। পরে দেখেন, যে পোশাকে নিখোঁজ হয়েছিলেন অনিরুদ্ধ, সেই পোশাকেই ফিরে এসেছেন তিনি। শাশ্বতী রায় জানান, স্বামীকে ফিরে পেয়ে তিনি আবেগে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন।

শাশ্বতী রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার স্বামীকে ফিরে পেয়েছি, এতেই আমরা খুব খুশি। আপনারা আশীর্বাদ করবেন। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তাঁকে কে নিয়ে গিয়েছিল, কেন নিয়ে গিয়েছিল—এসব বিষয় জানতে চাইনি। ফেরার পর থেকে অনিরুদ্ধর বেশির ভাগ সময় ঘুমে কাটছে। ’ অনিরুদ্ধ রায়ের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে শাশ্বতী রায় বলেন, ‘এখন ঘুমুচ্ছেন। যদি কিছু বলতে চান তিনি পরে বলবেন। এখন বিশ্রাম নিচ্ছেন। ’

নিখোঁজের চাঞ্চল্যকর ঘটনার পর এর আগেও যাঁরা ফিরে এসেছেন তাঁরা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি।

গত ২৭ অক্টোবর রাজধানীর সূত্রাপুর এলাকা থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে তুলে নেওয়ার পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন নবগঠিত বাংলাদেশ জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি মিঠুন চৌধুরী ও কেন্দ্রীয় নেতা আশিক ঘোষ অসিত। তাঁদের খুঁজে পেতে সংবাদ সম্মেলন করেন দুজনের স্ত্রী। গত বুধবার মিঠুন চৌধুরীকে ও বৃহস্পতিবার আশিক ঘোষকে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) আদালতে পাঠালে দুজনের হদিস জানা যায়। পরিবার আটকের ঘটনা জানতে পারে। গতকাল সন্ধ্যায় আশিক ঘোষের স্ত্রী সতী রানী ঘোষ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার স্বামী এখন কারাগারে রয়েছেন। বৃহস্পতিবার তাঁকে ডিবি আদালতে পাঠায়। আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠিয়েছেন। ’

তবে সুখবর নেই আরো কিছু পরিবারে। গত ২৭ আগস্ট রাজধানীর ধানমণ্ডি এলাকা থেকে নিখোঁজ হন কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইশরাক আহমেদ। গতকাল পর্যন্ত তাঁর কোনো সন্ধান পায়নি পরিবার। ইশরাকের বাবা জামাল উদ্দীন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিখোঁজ ব্যবসায়ী অনিরুদ্ধ রায় ফিরে এসেছেন শুনে ভালো লাগছে। আমরা আশায় বুক বাঁধতে পারছি—নিশ্চয়ই আমার ছেলেও একদিন এভাবে ফিরে আসবে। সেই দিনের অপেক্ষায় থাকলাম। ’

গত ৭ নভেম্বর নিখোঁজ হয়েছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বার হাসান সিজার। তাঁর নিখোঁজের পর সারা দেশে অলোড়ন শুরু হয়। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত সেই শিক্ষককে উদ্ধারের খবর পাওয়া যায়নি।

গত ১০ অক্টোবর সাংবাদিক উৎপল দাস নিখোঁজ হন। গতকাল পর্যন্ত ২৯ দিন পেরিয়ে গেলেও তাঁর সন্ধান মেলাতে পারেনি পুলিশ। গত ২২ আগস্ট বিমানবন্দর সড়ক থেকে অপহৃত হন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও এবিএন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সাদাত আহমেদ। ওই দিন রাস্তায় তাঁর গাড়ি থামিয়ে অন্য একটি গাড়িতে তুলে নেওয়া হয় তাঁকে। এ ছাড়া ২৬ আগস্ট রাজধানীর পল্টন থেকে নিখোঁজ হন কল্যাণ পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান। গতকাল পর্যন্ত তাঁদের উদ্ধারের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।


মন্তব্য