kalerkantho


শ্রম ইস্যুতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বিতর্ক

বাংলাদেশকে চাপে রাখার তাগিদ

মেহেদী হাসান   

১৯ মে, ২০১৭ ০০:০০



বাংলাদেশকে চাপে রাখার তাগিদ

শ্রম ইস্যুতে বাংলাদেশের অগ্রগতি হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয় বলেই মত দিয়েছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টে (ইপি) বিতর্কে অংশ নেওয়া বেশির ভাগ সদস্য। তাঁদের অনেকেই বাংলাদেশের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে তাগিদ দিয়েছেন ইউরোপীয় কমিশনকে।

বিতর্কে অংশ নিয়ে ইউরোপীয় বাণিজ্য কমিশনার সিসিলিয়া ম্যালস্ট্রম বলেছেন, শ্রম ইস্যুতে অগ্রগতি না হলে বা শ্রম অধিকার ও মানবাধিকার ইস্যুতে ধারাবাহিকভাবে অবনতিশীল পরিস্থিতি থাকলে ইউরোপের বাজারে বাণিজ্য সুবিধা বন্ধ করে দেওয়ার মতো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তাঁদের আছে। আর সে ব্যবস্থা প্রয়োগ করতেও তাঁরা প্রস্তুত।

সিসিলিয়া ম্যালস্ট্রম বলেন, বাংলাদেশকে স্পষ্টভাবে এ বিষয়টি তাঁরা জানিয়েছেন। পরিস্থিতি উন্নয়নে বাংলাদেশকে আরো সুযোগ দিতে চান। পরিস্থিতি উন্নয়নে পার্লামেন্ট সদস্যদের নিয়েই তিনি বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়াতে চান।

ঢাকায় গতকাল বৃহস্পতিবার তৈরি পোশাক খাতের ‘সাসটেইনেবিলিটি কম্প্যাক্ট’ পর্যালোচনার আগের দিন গত বুধবার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ‘স্টেট অব প্লে অব দি ইমপ্লিমেন্টেশন অব দ্য সাসটেইনেবিলিটি কম্প্যাক্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক বিতর্কে এসব বিষয় উঠে আসে। বিতর্ক শেষে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, আগামী জুন মাসে এ বিষয়ে ভোট অনুষ্ঠিত হবে।

পার্লামেন্টে বিতর্কে সদস্য বার্নড লাঙ্গে বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে নতুন শ্রম আইনের উদ্যোগ, শ্রমিক সংগঠন নিবন্ধন দেখেছি। শ্রমিকদের ভালো মজুরি, দর-কষাকষির ক্ষমতা জরুরি।

কম্প্যাক্টের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, অগ্রগতিও হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) পর্যবেক্ষণ বাস্তবায়নে আরো কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় তা-ই এখন ইউরোপীয় কমিশনের সামনে প্রশ্ন। ’

ইউরোপীয় কমিশনার সিসিলিয়া ম্যালস্ট্রম বলেন, আইএলওর বিশেষ অনুচ্ছেদ বাংলাদেশের জন্য একটি জোরালো সতর্কবার্তা। শ্রম ইস্যুতে বাংলাদেশে কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত আছে। ইপিজেড আইনের খসড়া ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। তিনি বলেন, ‘অ্যাকর্ডের মেয়াদ নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা আছে। সাধারণ মানুষের ধারণা, আমাদের ২০১৮ সালের পরও কাজ চালিয়ে যাওয়া উচিত। আমাদের আরো অগ্রগতি প্রয়োজন। ’

সিসিলিয়া ম্যালস্ট্রম বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের সরকারকে স্পষ্টভাবেই জানিয়েছি, শ্রম ইস্যুতে দ্রুত অগ্রগতি করতে হবে। এটি রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে স্পষ্ট, স্বচ্ছ ও সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা থাকা জরুরি। ’ তিনি আরো বলেন, ‘মানবাধিকার ও শ্রম অধিকারের ধারাবাহিক লঙ্ঘন হলে আমরা জিএসপি প্রত্যাহার করার মতো ব্যবস্থা নিতে পারি। আমি আশা করি, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমাদের এ ব্যবস্থা নিতে হবে না। অগ্রগতি হচ্ছে। আমাদের আরো ভালোভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ’

ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য ফার্নান্দো রুয়াস বলেন, ‘আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় এগারো শর বেশি শ্রমিক নিহত হয়েছে।

এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সে জন্য আমাদের ইউরোপীয় রাজনীতিকদের ব্যবস্থা নিতে হবে। ’ তিনি বাংলাদেশের ওপর আরো চাপ বাড়ানোর তাগিদ দেন।

সদস্য অ্যাগনিস ইউগেরিউস বলেন, ‘কম্প্যাক্ট সই হওয়ার চার বছর পরও বাংলাদেশে শ্রম পরিস্থিতি বেশ খারাপ। অনেক ক্ষেত্রে যেমন—ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকারের ক্ষেত্রে পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। সৌভাগ্যক্রমে ইউরোপীয় কমিশনার বাংলাদেশের কিছু অগ্রগতির কথা বলেছেন। ’ বাংলাদেশকে আবার অগ্রগতির পরামর্শই দেওয়া হবে কি না তা তিনি জানতে চান।

পার্লামেন্ট সদস্য সাজ্জাদ করিম বলেন, ‘বাংলাদেশের দুটি গল্প। একটি অগ্রগতির, যা অর্জনে সহায়তার জন্য ইউরোপীয় পার্লামেন্ট গর্ব করতে পারে। অন্যটি হলো—হয় বাংলাদেশ সরকার আমাদের শুনছে না বা তারা আমাদের না শোনার পথ বেছে নিয়েছে কিংবা আমরা কী বলছি তা তারা বুঝতে পারছে না। ’ তিনি বলেন, ‘আমি বাংলাদেশকে স্পষ্ট জানাতে চাই, এমন পরিস্থিতি আমরা দেখতে চাই না যেখানে আপনাদের বিজয় বা অর্জন নেতিবাচক ফল আনবে। ’

পার্লামেন্ট সদস্য লোলা সানচেজ বলেন, ‘আমাদের প্রচেষ্টা বাংলাদেশে শ্রম অধিকার লঙ্ঘন ঠেকাতে পারছে না। ইউরোপীয় কমিশনের উচিত বাংলাদেশের জন্য শ্রম অধিকারের অগ্রগতির জন্য বাধ্যতামূলক নির্দেশনা দেওয়া। ’

চোখে কালো কাপড় বেঁধে বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন পার্লামেন্ট সদস্য অ্যাঞ্জেলো চিয়োক্কা। একপর্যায়ে চোখের বাঁধন খুলে তিনি বলেন, ‘জেগে উঠুন, জেগে উঠুন। যথেষ্ট হয়েছে। আর বহুজাতিক কম্পানির স্বার্থ হাসিল করবেন না। বহুজাতিক কম্পানিগুলো শ্রমদাসে পরিণত করছে, শিশুদের অধিকার লঙ্ঘন করছে। কোনো ধরনের সুরক্ষা ছাড়াই দিনে ১৩-১৪ ঘণ্টা কাজ করানো হচ্ছে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এগুলো অবৈধ পণ্য। এগুলো ইউরোপে ঢোকা বন্ধ করুন। শ্রম অধিকারের প্রতি কোনো ধরনের সম্মান দেখানো ছাড়াই এগুলো তৈরি হয়েছে। ’

পার্লামেন্ট সদস্য অ্যাডাম জেনফিল্ড বলেন, ‘এটা লজ্জার বিষয় যে পরিস্থিতি উন্নতির জন্য বড় ট্র্যাজেডির প্রয়োজন হয়। কিছু অগ্রগতি হয়েছে। এ প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হবে। শিল্প ধ্বংস না করে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে আমাদের ব্যবস্থা নিতে হবে। ’

পার্লামেন্ট সদস্য লিন্ডা ম্যাকাভান বলেন, ইউরোপের বাজারে প্রবেশাধিকার সুবিধা আছে বলেই বাংলাদেশের লাখ লাখ নারী পোশাককর্মী তাদের জীবন বদলাতে পেরেছে। আবার একইভাবে কারখানায় একতাবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে যে বাধার সম্মুখীন হয় তাও উল্লেখযোগ্য।

পার্লামেন্টের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক কমিটির প্রধান হিসেবে জিন ল্যাম্বার্ট বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসের পর ইউরোপ যেভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে এটি সম্পৃক্ততার একটি মডেল। এমন নয় যে বাংলাদেশই বিশ্বের একমাত্র সমস্যাগ্রস্ত দেশ। বাংলাদেশ সরকার সারা বছর আমাদের সঙ্গে কাজ করছে। আমরা দেখতে চাই, কম্প্যাক্টের মতো উদ্যোগ নবায়ন হচ্ছে এবং নতুন উদ্যমে কাজ চলছে। ’ পার্লামেন্ট সদস্য আর্নে লিত্জ বলেন, ‘বাংলাদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলছি, পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অগ্রগতি হয়েছে। ’

সদস্য নটিস মারিয়াস বলেন, ‘বহুজাতিক কম্পানি, বাংলাদেশ—সবাই লুকোচুরি খেলছে। বাংলাদেশের মতো পরিস্থিতি ইউরোপীয় কিছু দেশেও আছে। সেগুলোকেও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। ’

ইউরোপীয় কমিশনার সিসিলিয়া ম্যালস্ট্রম বিতর্কের সমাপনী বক্তব্যে বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারকে আরো অনেক কিছু করতে হবে। কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত আছে। কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। বন্ধুত্ব ও খোলাখুলি আলোচনা হবে। আমরা বাংলাদেশকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছি, আইএলওর সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। ’


মন্তব্য