kalerkantho


রক্ত ঝরেছে বলেই ওরা আমাদের ভাষা কেড়ে নিতে পারেনি

ডা. সাঈদ হায়দার

আপেল মাহমুদ   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



রক্ত ঝরেছে বলেই ওরা আমাদের ভাষা কেড়ে নিতে পারেনি

দেশভাগের পর সাতচল্লিশেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়েছিল। ভারতের আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ ১৯৪৭ সালের জুনে এক সেমিনারে সর্বপ্রথম উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করেন।

তাঁর প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রশ্নে সরব হয়েছিলেন কয়েকজন লেখক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী। নেতৃত্বে ছিলেন সাংবাদিক আবদুল গনি হাজারী, আবদুল হক, কবি ফররুখ আহমদ প্রমুখ। লেখনীর মাধ্যমে জিয়াউদ্দিনের প্রস্তাবের প্রতিবাদ করেছিলেন তাঁরা। বাংলার ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অবস্থান তুলে ধরতে থাকেন তাঁরা। ভাষা আন্দোলনের প্রকৃত মূল্যায়ন করতে হলে সেই ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে হবে।

কথাগুলো জানালেন ভাষাসৈনিক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত ডা. সাঈদ হায়দার। ভাষা আন্দোলনের সংগঠক ও একুশে চেতনা পরিষদের এই সহসভাপতি প্রথম শহীদ মিনারের অন্যতম নকশাবিদও। তাঁর সঙ্গে কথা হচ্ছিল রাজধানীর উত্তরা মডেল টাউনের ৫ নম্বর সেক্টরে, তাঁর নিজের বাড়িতেই।

বয়স এখন ৯২, তবে চোখে-মুখে এখনো খেলা করে তারুণ্যের দীপ্তি।

ডা. সাঈদ হায়দার বলতে থাকেন, ‘উপাচার্য জিয়াউদ্দিন আহমেদের দেখানো পথে হাঁটতে গিয়েই ১৯৫২ সালে তত্কালীন পাকিস্তান সরকার বড় ধরনের ভুলটি করে। এ ভুলের খেসারত দিতে গিয়ে তারা শুধু অগ্নিকুণ্ডে ঘি-ই ঢালেনি, সেই সঙ্গে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের পথ সুগম করে দেয়। আমাদের জীবনে আসে সেই ঐতিহাসিক একুশে ফেব্রুয়ারির মহান ভাষা আন্দোলন। সেদিন যদি আমরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করতাম তাহলে আমাদের জীবনে এত সহজে সে জয়টা আসত কি না সন্দেহ। রক্ত ঝরেছে বলেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আমাদের মুখ থেকে বাংলা ভাষা কেড়ে নিতে পারেনি। সেদিন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা ১৪৪ ধারা ভাঙার বিপক্ষে মতামত দিলেও তিন প্রগতিশীল তরুণ শিক্ষার্থী তা ভাঙার পক্ষে অনড় থাকেন। ’

গৌরবের সাক্ষী এ ভাষাসংগ্রামী জানান, বায়ান্নর ২০ ফেব্রুয়ারি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেদিন রাতে ঢাকার নবাবপুরে আওয়ামী লীগ অফিসে সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভায় বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিরা আন্দোলন নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। যুবলীগ নেতা অলি আহাদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা আবদুল মতিন ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রসংসদ ভিপি গোলাম মাওলা পরের দিন ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভেঙে আমতলায় ছাত্র সমাবেশ করে মিছিল নিয়ে অ্যাসেম্বলি অভিমুখে যাত্রা ও স্মারকলিপি দেওয়ার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন। ঘটনাস্থলটি মেডিক্যাল কলেজ লাগোয়া হওয়ায় সেখানে উপস্থিত ছাত্র-জনতার অধিকাংশই ছিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের। সে সময় মেডিক্যাল ছাত্রসংসদের সভাপতি গোলাম মাওলা ও সাধারণ সম্পাদক শরফ উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো। সে সভায় মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীরও উপস্থিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি যোগ দেননি। এ নিয়ে তখন উপস্থিত লোকজনের মধ্যে বেশ সমালোচনাও হয়।

স্মৃতি হাতড়ে ডা. সাঈদ হায়দার বলেন, ‘রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে কয়েক বছর লোকসান দিয়ে দেশভাগের পর আমি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হই। এর আগে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা মেডিক্যাল কলেজেও ছিলাম। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময়টাতে আমি বয়সে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় সবার সিনিয়র ছিলাম। ছাত্রসংসদের ভিপি ও জিএস আমার চেয়ে বয়সে দু-তিন বছরের জুনিয়র ছিলেন। যার কারণে তাঁরা যেকোনো বিষয়ে আমার মতামত নিতে আসতেন। ২০ ফেব্রুয়ারির সর্বদলীয় সভায় তাঁদের কী ভূমিকা থাকবে সে ব্যাপারে আমার মতামত জানতে চাইলে আমি সরাসরি বলে দেই যে আন্দোলনের পরিবর্তে কোনো আপসরফার পক্ষে যেন মত না দেওয়া হয়। প্রয়োজনে পাকিস্তানিদের আইন ভঙ্গ করে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে মাতৃভাষার সম্মান উঁচুতে তুলে ধরতে হবে। ’

প্রথম শহীদ মিনারের অন্যতম এই নকশাবিদ জানান, ১৯৫২ সালে মেডিক্যালের পরীক্ষা হওয়ার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে ১৯৫৩ সালে চলে যায়। এ কারণে তিনি আরো সক্রিয়ভাবে ভাষা আন্দোলনে শরিক হতে পেরেছিলেন। একুশের দুপুরে পুলিশ তাঁর চোখের সামনেই মেডিক্যাল ছাত্রাবাস ও ব্যারাকে প্রবেশ করে নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালায়। এর ফলে আন্দোলনের চরিত্রটাই পাল্টে যায়। রাতে মেডিক্যালের ছাত্রসংসদের ভিপি গোলাম মাওলার রুমে জরুরি সভা হয়। সেখানে তিনি উপস্থিত থেকে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তিনিসহ অন্যরা ২২ ফেব্রুয়ারি মেডিক্যাল ব্যারাক হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদদের গায়েবানা জানাজা শেষে বিশাল গণমিছিল নিয়ে গুলিস্তানের প্রধান সড়ক দিয়ে নবাবপুর হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত যান। হাজারো মানুষ রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে সেই মিছিলের সঙ্গে সহানুভূতি প্রকাশ করে। ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা মেডিক্যালের ছাত্ররা গড়ে তোলেন সেই শহীদ মিনার। নকশা নেই, ইট নেই, বালু কিংবা কোনো নির্মাণ শ্রমিকও ছিল না। শুধু মনের জোরকে পুঁজি করে তাঁরা এতে হাত দেন। প্রথমে শহীদ মিনারের নকশা আঁকার দায়িত্ব দেওয়া হয় বদরুল আলমের ওপর। তাঁকে তিনি সহযোগিতা করেন। দুজন মিলে যে নকশাটা করেন তা মেডিক্যালের ভিপি-জিএসসহ সাধারণ শিক্ষার্থীদের সবাই পছন্দ করলেন।

ডা. সাঈদ হায়দার জানান, কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে মগবাজারে বড় বোনের বাড়িতে ওঠেন তিনি। সেখানে থেকেই মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনা করতেন। তাঁর বাবা শিক্ষকতা পেশা সূত্রে দেশের নানা প্রান্তে থাকতেন। সেদিন ভাষা আন্দোলনে কারা অংশ নিয়েছিলেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্দোলনটা দানা বেঁধেছিল ঠিক। তাই বলে এর একক কৃতিত্ব শুধু আমাদের নয়। ঢাকা ছাড়াও সেই আন্দোলন রাজশাহী, রংপুর, পাবনা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের অনেক মফস্বল শহরে ছড়িয়ে পড়েছিল। তাই দেশের অনেকেই ভাষাসৈনিকের মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য। আজকের প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী ভাষা আন্দোলনের সময় পাবনায় কলেজ ছাত্র ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে সেখানে বিশাল আকারের আন্দোলন হয়েছিল। নারায়ণগঞ্জে মর্গান স্কুলের প্রধান শিক্ষক মমতাজ বেগম আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে কারাবরণ করেছিলেন। তাই ইতিহাসের সব দিক বিবেচনা করে ভাষাসৈনিকদের মূল্যায়ন করতে হবে। ’

ডা. সাঈদ হায়দার বলেন, ‘বিভিন্ন সরকার ভাষা আন্দোলন ও ভাষাসৈনিকদের ব্যাপক মূল্যায়ন করেছে। এর বাইরেও কিছু বিষয় চোখের আড়ালে রয়ে গেছে। যেমন ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রসংসদের সাধারণ সম্পাদক শরফ উদ্দিন আহমেদকে এখন পর্যন্ত ভাষাসৈনিক হিসেবে একুশে পুরস্কার দেওয়া হয়নি। তাঁর পরিবার অনেক চেষ্টা করেও সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে পারেনি। এমনকি আমি গত বছর ২৪ অক্টোবর তাঁকে মরণোত্তর পুরস্কার দেওয়ার জন্য লিখিতভাবে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দিয়েছি। তাঁর মতো এমন অনেক খ্যাতনামা ভাষাসৈনিক এখন পর্যন্ত একুশে পদক পাননি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের তত্কালীন ছাত্রনেতা ও ভাষাসৈনিক আলী আসগর ও মামুনুর রশিদও আছেন তাঁদের মধ্যে। তাঁরা রামপুরা ও বনানীতে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাচ্ছেন। অথচ মৃত্যুর আগে তাঁরা ভাষাসৈনিক হিসেবে একুশে পদক পেলে খুশি হতেন। ’

ডা. সাঈদ হায়দার বলেন, ‘এ কথা ঠিক, ভাষা আন্দোলনের সময় শুধু পাঁচজনই শহীদ হননি। এর বাইরেও নাম-ঠিকানা ও পরিচয়বিহীন অনেকে শহীদ হয়েছিলেন। কিন্তু আমাদের ব্যর্থতা হলো আমরা তাঁদের পরিচয় খোঁজার চেষ্টা করিনি। যার কারণে তাঁদের মূল্যায়নের পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। আমি মনে করি, এখনো চেষ্টা করলে ভাষা আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে নিহত বেওয়ারিশ শহীদদের পরিচয় খুঁজে পাওয়া সম্ভব। ’

প্রসঙ্গত, ১৯২৫ সালের ৫ পৌষ পাবনা শহরে জন্মগ্রহণ করেন ডা. সাঈদ হায়দার। অবসর জীবনের পুরোটা সময় তিনি বই পড়ে ও বই লিখে ব্যয় করছেন। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত তিন খণ্ডের ‘লোকসমাজ চিকিৎসাবিজ্ঞান’ তাঁকে বিশেষ খ্যাতি দিয়েছে। লিখেছেন জীবনীভিত্তিক ‘বেলাশেষে হিসেব নিকেশ’, ‘পিছু ফিরে দেখা’, ‘বাংলা ভাষা সাহিত্য নিদর্শন এবং’, ‘নেশা সর্বনাশা’, ‘দ্য গ্রেট ল্যাংগুয়েজ মুভমেন্ট’সহ বেশ কিছু বই। ভাষা আন্দোলনে গৌরবময় অবদানের জন্য ২০১৬ সালে একুশে পদক পেয়েছেন তিনি।


মন্তব্য