kalerkantho


২০ জনের তালিকা সার্চ কমিটির

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



২০ জনের তালিকা সার্চ কমিটির

নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে নাম সুপারিশ করার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে পাওয়া ১২৫ জনের নামের মধ্য থেকে ২০ জনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা করেছে এসংক্রান্ত সার্চ কমিটি। গতকাল মঙ্গলবার সার্চ কমিটির বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদসচিব সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলো অনুসন্ধান কমিটির কাছে নাম দিয়েছে। প্রায় ১২৫টি নাম থেকে কমিটির সদস্যরা আলোচনা শেষে ২০ জনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা করেছেন।

কী ধরনের যোগ্যতা বিবেচনা করে সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হয়েছে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদসচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, ‘সৎ, যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের তালিকা করা হয়েছে। রাজনৈতিক দলের নামগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর নাম পবিত্র আমানত। তাই নামগুলো আমরা প্রকাশ করব না। কমিটির ছয়জন সদস্য আবার বসবেন। সার্চ কমিটি চাইলে এ ২০ জনের বাইরেও নিজেদের অনুসন্ধান থেকে আরো নাম অন্তর্ভুক্ত করে তাদের প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে পারে। ’

সার্চ কমিটিকে ১০ কার্যদিবস অর্থাৎ আগামী ৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ পাঠাতে হবে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার পদে কমিটি কমপক্ষে একজন নারীসহ প্রতিটি পদের বিপরীতে দুটি করে নাম দেবে। কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এসব নাম চূড়ান্ত হবে। সিদ্ধান্তের সমতার ক্ষেত্রে সভায় সভাপতিত্বকারীর সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার থাকবে।

রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নেওয়া ৩১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ ২৫টি দল গতকাল নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সার্চ কমিটির কাছে তাদের প্রস্তাবিত নামের তালিকা জমা দিয়েছে। অন্য দুটি দল কোনো নাম না দিয়ে তাদের অভিমত জানিয়ে চিঠি দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পাঁচজনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। যাঁদের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে তাঁরা হলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব মোল্লা ওয়াহিদুজ্জামান, সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ, সাবেক মুখ্য সচিব আব্দুল করিম, সাবেক সচিব মঞ্জুর হোসেন এবং সাবেক তথ্য কমিশনার সাদেকা হালিম।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সচিব ও মন্ত্রিপরিষদসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কাউকে নতুন নির্বাচন কমিশনে অন্তর্ভুক্ত না করার প্রস্তাব আগেই রাখা হয়েছে বিএনপির পক্ষ থেকে।  

বিএনপির প্রস্তাব করা নামের মধ্যে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তাসনিম আরেফা সিদ্দিকী, সাবেক সচিব আসফউদ্দৌলা এবং বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিকের নাম শোনা যাচ্ছে। তাঁদের মধ্যে তোফায়েল আহমেদ, শাহদীন মালিক ও আসফউদ্দৌলার নাম ‘অভিন্ন’ হিসেবে ২০ দলের শরিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও দেওয়া হয়েছে বলে বিএনপি ও এর মিত্র কয়েকটি দলের সূত্রে জানা গেছে। বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের এক নেতা অবশ্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, তাসনিম আরেফা সিদ্দিকীর নাম বিএনপির পক্ষ থেকে নয়, শরিক দলগুলোর পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক একটি দলের পক্ষ থেকে সিইসি পদে সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব ড. সা’দত হুসাইন ও আলী ইমাম মজুমদার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদের নাম দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কমিশনার পদে ওই দলটি নাম দিয়েছে সাবেক সচিব আলাউদ্দিন আহমেদ, সাবেক আইজিপি আজিজুল হক, সাবেক অতিরিক্ত সচিব বেগম জেসমিন টুলী, সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাইনুদ্দিন আহমেদ ও সাবেক জেলা জজ এম এ গফুরসহ আরো কয়েকজনের। এ ছাড়া শরিক অন্য একটি দল বিজিবির সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব) এ এল এম ফজলুর রহমানের নাম দিয়েছে বলেও জানা গেছে।

এদিকে সার্চ কমিটি গত সোমবার দেশের ১২ জন বিশিষ্ট নাগরিকের সঙ্গে মতবিনিময়ের পর আজ বুধবার আরো চারজন বিশিষ্ট নাগরিকের সঙ্গে মতবিনিময় করতে যাচ্ছে। ওই চারজন হলেন সাবেক সিইসি আবু হেনা, ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশীদকে আগে আমন্ত্রণ জানানো হলেও মামলাসংক্রান্ত জটিলতার জন্য গতকাল তাঁকে নিষেধ করা হয়েছে।

গতকাল বিকেল ৩টা পর্যন্ত নাম জমা দেওয়ার সময়সীমা ছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আব্দুল ওয়াদুদের কাছে নামের তালিকা জমা দেয় দলগুলো। পরে অতিরিক্ত সচিব আব্দুল ওয়াদুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি মোট ৩১টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পরে রাষ্ট্রপতির গঠন করা সার্চ কমিটি ওই ৩১টি দলের কাছে নির্বাচন কমিশন গঠনে নামের তালিকা চেয়ে চিঠি দেয়। বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে ২৭টি দল সচিবালয়ে এসে নামের তালিকা জমা দিয়েছে। আমরা এগুলো সার্চ কমিটির কাছে পৌঁছে দেব। ’ আব্দুল ওয়াদুদ আরো বলেন, ‘আমরা ওই দলগুলোর চিঠি পেয়েছি সিলগালা খামে। সেগুলো আমরা সার্চ কমিটির কাছেই জমা দেব। ভেতরে কী আছে তা আমাদের জানার সুযোগ নেই। ’

জানা যায়, ওই ২৭ দলের মধ্যে দুটি দল সিপিবি ও জেএসডি শুধু চিঠি দিয়েছে, নাম দেয়নি। এ ছাড়া নামের তালিকা জমা দেয়নি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বিকল্প ধারা বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও গণফোরাম।

গতকাল দুপুর পৌনে ১টার দিকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলের দপ্তর সম্পাদক ড. আব্দুস সোবহান গোলাপ সচিবালয়ে উপস্থিত হয়ে নামের তালিকা জমা দেন। অন্যদিকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী ও দলীয় চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব আবদুস সাত্তার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে পাঁচজনের নামের তালিকা জমা দেন। আবদুস সোবহান গোলাপ কিংবা রুহুল কবীর রিজভী কেউই তাঁদের দলের প্রস্তাবিত নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ছাড়া আর যে ২৩টি দল নাম প্রস্তাব করেছে সেগুলো হচ্ছে জাতীয় পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ), ইসলামী ঐক্যজোট, জাতীয় পার্টি (জেপি), বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), সাম্যবাদী দল, জাসদ (আম্বিয়া), বাসদ, গণতন্ত্রী পার্টি, খেলাফত আন্দোলন,  বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ, গণফ্রন্ট, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল) ও জাকের পার্টি।    

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সার্চ কমিটিকে কোনো নামের তালিকা না পাঠিয়ে এর কারণ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে। গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সিপিবি যুক্তি তুলে ধরে বলেছে, কোনো রাজনৈতিক দল যদি কোনো নাম সুপারিশ করে, সে নাম ‘ডিসকোয়ালিফাই’ করা উচিত। জেএসডির পক্ষ থেকে অন্য এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘সরকার ইচ্ছা করলে সাত দিনের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠনের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের বিধান করে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের বিধান করতে পারে। তাই আমরা পাঁজনের নাম প্রস্তাব করে রাষ্ট্রপতিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিতর্কিত ও বিব্রত করতে চাই না। ’

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গত শনিবার তাদের প্রথম বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুসারে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নেওয়া ৩১টি রাজনৈতিক দলের কাছে পাঁচটি করে নাম চেয়েছিল। প্রথমে গতকাল সকাল ১১টার মধ্যে এ নাম জমা দেওয়ার সময়সীমা নির্ধারিত ছিল। পরে চার ঘণ্টা বাড়িয়ে বিকেল ৩টা নির্ধারণ করা হয়।

দেশে প্রথমবারের মতো ২০১২ সালের ২২ জানুয়ারি তত্কালীন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের উদ্যোগে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিটিতেও আহ্বায়ক ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। সেবার ওই সার্চ কমিটির কাছে আওয়ামী লীগসহ ২৩টি দল নাম প্রস্তাব পাঠালেও বিএনপিসহ ১৬টি দল কোনো প্রস্তাব পাঠায়নি। বিএনপি ও এর নেতৃত্বাধীন জোট ওই সার্চ কমিটি প্রত্যাখ্যান করে প্রথমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিল। এবার বিএনপি ও এর দলগুলো সে অবস্থান পরিবর্তন করেছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাব পাওয়ার পর সেগুলো নিয়ে গতকাল বিকেল পৌনে ৪টার দিকে মন্ত্রিপরিষদসচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম এবং অতিরিক্ত সচিব আবদুল ওয়াদুদ সচিবালয় থেকে সুপ্রিম কোর্টের জাজেস লাউঞ্জের উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে বিকেল ৪টায় বৈঠকে বসেন সার্চ কমিটির সদস্যরা।

নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ শেষে গত বুধবার সকালে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি করে দেন। সেই রাতেই এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। প্রজ্ঞাপনে সার্চ কমিটিকে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের সুপারিশ রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাতে বলা হয়। আগেরবারের মতোই সার্চ কমিটির সদস্যদের দেওয়া নামগুলো থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্য কমিশনারদের নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। প্রতিটি পদের বিপরীতে কমিটি দুটি করে নাম দেবে। কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এসব নাম চূড়ান্ত করা হবে।

সার্চ কমিটির সদস্যরা হলেন আপিল বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মাসুদ আহমেদ, সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য শিরীণ আখতার।

ইসি গঠন নিয়ে ৩১টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করেন রাষ্ট্রপতি। ১৮ ডিসেম্বর থেকে পর্যায়ক্রমে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয় বঙ্গভবনে। প্রথম দিন সংলাপে অংশ নেয় বিএনপি। আর গত ১১ জানুয়ারি অংশ নেয় আওয়ামী লীগ।


মন্তব্য