kalerkantho


অপহরণের পর সহোদর দুই শিশুকে হত্যা

চার নারীসহ আটক ৯, ৮টি ঘরে আগুন

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার   

২১ জানুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০



কক্সবাজারের রামু উপজেলায় মুক্তিপণ না দেওয়ায় দুই সহোদর শিশুকে হত্যা করেছে অপহরণকারীরা। শিশুদের উদ্ধারে পুলিশ ও এলাকাবাসীর তৎপরতা চলাকালেই গত মঙ্গলবার রাতে তাদের হত্যা করা হয়।

গত রবিবার তাদের বাড়ির পাশ থেকে অপহরণ করা হয়েছিল।

অপহরণের তিন দিনের মাথায় শিশুদের লাশ উদ্ধারের পর ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী মঙ্গলবার রাতেই

 অভিযুক্ত অপহরণকারীদের আটটি ঘরে আগুন দিয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ অপহরণকারী চক্রের সদস্য সন্দেহে চার নারীসহ আটজনকে আটক করেছে।

হত্যাকাণ্ডের শিকার এ দুই সহোদর হলো রামুর গর্জনিয়া ইউনিয়নের বড়বিল এলাকার বাসিন্দা ফোরকান আহমদের বড় ছেলে ইমাম হাসান কাজল (১১) ও ইমাম হোসাইন শাকিল (৯)। তাদের মধ্যে কাজল বাইশারী শাহ নুরুদ্দিন মাদ্রাসার তৃতীয় এবং শাকিল বাইশারী নারিসবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র ছিল।

দুই সহোদরের লাশ উদ্ধারের পর গতকাল বুধবার কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত হয়েছে। এরপর সন্ধ্যায় তাদের লাশ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করা হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন জানিয়েছে, গত রবিবার বিকেলে বাড়ির পাশে খেলা করার সময় অপহরণকারী চক্রের হোতা জাহাঙ্গীর শিশু শাকিল ও কাজলকে কৌশলে অপহরণ করে। পরে অপহরণকারীরা শিশুদের অভিভাবককে মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়ে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ চায়।

এর পর থেকে মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন দুই শিশুকে উদ্ধারের জন্য রামুর বড়বিল, থিমছড়ি, বাইশারী, ঈদগড়সহ বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় অনুসন্ধান চালায়।

ঘটনাস্থল কক্সবাজার ও বান্দরবানের সীমান্তবর্তী এলাকা বাইশারী বাজারের বাসিন্দা আবদুল হামিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অপহরণকারী চক্রের সর্দার জাহাঙ্গীর বেশ কিছুদিন ধরেই টার্গেট করেছিল এই দুই শিশুকে। গত রবিবার শিশুদের খেলার সময় জাহাঙ্গীর পাখি দেওয়ার লোভ দেখিয়ে তাদের জঙ্গলে নিয়ে যায়। ’

দুই শিশুর মা ছেনুয়ারা বেগমের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেশী হামিদ জানান, রবিবার রাতেই বাইশারী বাজারের কাপড়ের দোকানি আবদুল আলীর মোবাইল ফোনে অপহরণকারী জাহাঙ্গীর খুদে বার্তা পাঠিয়ে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।

প্রতিবেশী আবদুল হামিদ বলেন, দুই শিশুর বাবা ফোরকান আহমদ (৩৬) পাশের বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী বাজারে তাঁর মামা আবদুল আলীর কাপড়ের দোকানের কর্মচারী। ফোরকানের চার সন্তানের মধ্যে কাজল সবার বড় আর শাকিল মেজ। আবদুল আলী দীর্ঘদিন সৌদি আরবে কাটিয়ে দেশে ফিরেই বড় কাপড়ের দোকান খোলেন। অপহরণকারীরা মনে করেছিল, ফোরকানের দুই শিশুকে অপহরণ করা হলে মুক্তিপণের টাকা তাঁর মামা আবদুল আলীর কাছ থেকে সহজেই পাওয়া যাবে। এ জন্যই অপহরণকারীরা ঘটনার পরপরই চার লাখ টাকা চেয়ে আবদুল আলীর মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠায়।

গর্জনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান তৈয়ব উল্লাহ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফোরকান তার মামার দোকানে চাকরির সুবাদে নিশ্চয়ই কিছু টাকা সঞ্চয় করেছিল। ওই টাকা দিয়ে সে সম্প্রতি যৎসামান্য ইট কিনেছিল হয়তো বা ঘরের কিছু একটা কাজ করার জন্য। আর এই ইট কাল হয়ে দাঁড়ায়। অপহরণকারীরা মনে করেছে তার কাছেও টাকা পাওয়া যাবে। ’

ইউপি চেয়ারম্যান আরো বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই বান্দরবান ও কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী ঈদগড়, বাইশারী ও গর্জনিয়া এলাকায় অপহরণের ঘটনা ঘটছে। তিনি বড়বিল এলাকায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন।

রামু থানার ওসি আবদুল মজিদ জানিয়েছেন, গত রবিবার সন্ধ্যায় দুই শিশু অপহরণের ঘটনার পর থেকেই পুলিশ ও গ্রামবাসীর অভিযান অব্যাহত ছিল। রামুর গর্জনিয়া পুলিশ ফাঁড়ি এবং নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ যৌথভাবে পাহাড়ের পর পাহাড়ে অভিযান অব্যাহত রাখে।

ওসি জানান, ঘটনার রাতেই পুলিশ অপহরণকারী চক্রের মূল হোতা জাহাঙ্গীরকে আটক করতে সমর্থ হলেও অপহৃত শিশুদের উদ্ধার করা যায়নি। ততক্ষণে অপহরণকারী জাহাঙ্গীর দুই শিশুকে তার বাবা শুকুরের হাতে তুলে দেয়। শুকুরও এই চক্রের সদস্য। মঙ্গলবার রাতে শুকুরকে পুলিশ আটক করতে সমর্থ হয়। তাঁর স্বীকারোক্তি অনুযায়ী অপহরণের ঘটনাস্থলের কাছাকাছি পাহাড়ি এলাকা থেকে রাতেই শিশুদের লাশ উদ্ধার করা হয়।

পুলিশ কর্মকর্তা জানান, গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত পুলিশের অভিযানে অপহরণে জড়িত সন্দেহে আটক করা হয়েছে চার নারীসহ ৯ জনকে। শুকুর ও তাঁর ছেলে জাহাঙ্গীর ছাড়া বাকিরা হলো নুরুল আমিন টুলু, জয়নাল আবেদীন, আলমগীর ভুলু, লায়লা, রাশেদা, মোবারেকা ও খাদিজা। স্থানীয় লোকজন মঙ্গলরাতেই তাদের ঘরে আগুন দেয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবাদ : দুই সহোদর হত্যার প্রতিবাদে কক্সবাজার ও বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গতকাল সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। ঈদগড়, বাইশারী ও ঈদগড়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা এসব কর্মসূচিতে অংশ নেন। কর্মসূচি শেষে গতকাল বাইশারী হাই স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু শাফায়াত মো. শাহেদুল ইসলাম অবিলম্বে অপহরণকারী চক্র দমনে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার আশ্বাস দেন।

পাহাড়ি এলাকায় অপহরণকারী চক্র : দীর্ঘদিন ধরেই বান্দরবান ও কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী ঈদগড়, বাইশারী ও গর্জনিয়া নামের অরণ্যঘেরা এই তিনটি ইউনিয়নে কয়েকটি অপহরণকারী চক্র সক্রিয় রয়েছে। এ চক্রগুলোতে শতাধিক অপহরণকারী রয়েছে।

গর্জনিয়ার বাসিন্দা জিল্লু চৌধুরী জানান, এলাকার বখাটে যুবকরা অপহরণের ঘটনাকে টাকা রোজগারের একদম সহজ পন্থা হিসেবে ধরেই একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, রাজনৈতিক দলের কিছু অসাধু লোকের মদদেই অপহরণকারীরা এভাবে বেপরোয়া। তাদের দমনে র‌্যাব-পুলিশের যৌথ অভিযান দাবি করেন তিনি।

 


মন্তব্য