kalerkantho


সিঙ্গাপুর থেকে ২৭ বাংলাদেশি বহিষ্কার

বিদেশে বসে এ দেশে সশস্ত্র জিহাদের ছক

মেহেদী হাসান ও ওমর ফারুক   

২১ জানুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০



উগ্রবাদে বিশ্বাসী ২৭ বাংলাদেশি সিঙ্গাপুরের মাটিতে বসে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদের পরিকল্পনা করছিলেন বলে অভিযোগ করেছে সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই বাংলাদেশিদের মধ্যে ২৬ জনকে গত ১৬ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বরের মধ্যে সিঙ্গাপুর থেকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

আরো একজন ফেরার অপেক্ষায়। তবে বাংলাদেশ বলছে, ২৭ জনই ফিরে এসেছেন। এর মধ্যে ১৪ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। বাকি ১৩ জনকে আত্মীয়দের জিম্মায় দেওয়া হলেও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, সিঙ্গাপুর সরকারের আনা অভিযোগ পুলিশ খতিয়ে দেখছে। অন্যদিকে সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাহবুব উজ-জামান বলেছেন, ওই ব্যক্তিরা সিঙ্গাপুর সরকারের নজরদারিতে ছিলেন। তাঁদের আটক করার পর ফেরত পাঠানোর জন্য সিঙ্গাপুর সরকার বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ  করেছিল।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখার উপপুলিশ কমিশনার শেখ মারুফ হাসান সরদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে ২৭ জনকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছে সিঙ্গাপুর। তাদের মধ্যে ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আর ১৩ জনকে জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। তাদের পর্যবেক্ষণ রাখা হয়েছে। ’

বিভিন্ন গণমাধ্যমে সিঙ্গাপুর থেকে বহিষ্কৃত ওই বাংলাদেশিদের মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সমর্থক বা আদর্শে অনুপ্রাণিত হিসেবে অভিহিত করা হলেও তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ এ ধরনের তথ্য পায়নি। পুলিশের গোয়েন্দা শাখা ডিবির (দক্ষিণ) উপকমিশনার মাশরুকুর রহমান খালেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যে ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের অনুসারী হিসেবে স্বীকার করেছে এবং তদন্তে তাদের জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ’ তিনি বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, সিঙ্গাপুরে মসজিদে তারা নামাজ পড়ত এবং অন্যদের জিহাদে উদ্বুদ্ধ করত। তবে তাদের সঙ্গে আইএসের কোনো যোগাযোগ নেই। ’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঊর্ধ্বতন এক পুলিশ কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, ২৭ বাংলাদেশিকে বিভিন্ন দিনে সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে দুই দেশের পুলিশের মধ্যে যোগাযোগ হয়েছিল। সিঙ্গাপুরের কাছ থেকে তথ্য পেয়েই তাঁদের আটক করা হয়।

সিঙ্গাপুর সরকারের ভাষ্য : সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল বুধবার বিকেলে ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আইনের আওতায় ২৭ কট্টরপন্থী বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার’ শীর্ষক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা আইনে নির্মাণ খাতে কর্মরত ২৭ জন বাংলাদেশি পুরুষ কর্মীকে গত ১৬ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বরের মধ্যে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দপ্তর গ্রেপ্তার করে। এর মধ্যে ২৬ জন একটি ধর্মীয় পাঠচক্রের সদস্য ছিলেন। তাঁরা আল-কায়েদার সদস্য সংগ্রহে উদ্বুদ্ধকারী আনওয়ার আল-আওলাকির মতো উগ্র ও কট্টর ধর্মীয় আদর্শে বিশ্বাসী। তাঁরা আল-কায়েদা ও আইএসের কর্মকাণ্ডের সমর্থক। এর বাইরে আরো একজন বাংলাদেশি ওই চক্রের সদস্য নন। তবে তিনিও উগ্রবাদী আদর্শের সমর্থক। তাঁর কাছে জিহাদবিষয়ক সরঞ্জাম পাওয়া গেছে।

সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ওই ব্যক্তিরা আটক হওয়া এড়াতে গোপনে নিজেদের মধ্যে জিহাদি সরঞ্জাম বিনিময় করতেন এবং অন্য বাংলাদেশিদের তাঁদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। সদস্যদের কয়েকজন স্বীকার করেছেন, ধর্মের জন্য সশস্ত্র জিহাদে ঝাঁপিয়ে পড়া উচিত—এমন মতাদর্শ তাঁরা ধারণ করতেন। কয়েকজন মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে সশস্ত্র জিহাদে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। শিয়াদের তাঁরা পথভ্রষ্ট বলে মনে করতেন। তাই শিয়াদের লক্ষ্য করে সন্ত্রাসী হামলাকেও তাঁরা সমর্থন করেছেন।

সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরো জানায়, ওই বাংলাদেশিরা বাংলাদেশ সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন। ইসলামী পাঠচক্রের সদস্যদের সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশে ফিরে এসে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদ শুরু করতে উদ্বুদ্ধ করা হতো। এমনকি তাঁরা সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশে উগ্র গোষ্ঠীগুলোকে টাকা পাঠাতেন।

সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ওই বাংলাদেশিদের কাছে জিহাদি বই, ভিডিও এমনকি সন্ত্রাসীদের শিবিরে শিশুদের প্রশিক্ষণ নেওয়ার ভিডিও পাওয়া গেছে। কয়েকজন সদস্যের কাছে বিভিন্ন উপায়ে গুপ্তহত্যা চালানোর নির্দেশনারও ছবি পাওয়া গেছে।

আটকের পর তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের বিষয়ে সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তাঁরা বিদেশে সশস্ত্র জিহাদের পরিকল্পনা করলেও সিঙ্গাপুরে সন্ত্রাসী হামলার কোনো পরিকল্পনা তাঁদের ছিল না। সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশিদের বহিষ্কারের তথ্য তুলে ধরে জানায়, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সিঙ্গাপুর সরকারের জোরালো ও স্পষ্ট অবস্থান রয়েছে।

রিমান্ডে ১৪ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ : সিঙ্গাপুর সরকার গতকাল বুধবার ২৭ বাংলাদেশিকে বহিষ্কারের তথ্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানালেও বহিষ্কৃত ওই বাংলাদেশিদের নিয়ে পুলিশের তৎপরতা ছিল গত নভেম্বর মাস থেকেই। সর্বশেষ গত ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে ঢাকার একটি আদালত চার দিনের রিমান্ড শেষে সিঙ্গাপুরফেরত ১৪ বাংলাদেশিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এর পর থেকে তাঁরা কারাগারে।

মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, আসামিরা সিঙ্গাপুরের মোস্তফা মার্কেটের কাছে অ্যাঙ্গোলিয়া নামের একটি মসজিদে একত্র হয়ে বাংলাদেশে জঙ্গি কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশে সদস্য ও অর্থ সংগ্রহের পাশাপাশি বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে আলোচনা করতেন। ওই মসজিদে প্রতি রবিবার সন্ধ্যায় একত্র হয়ে জিহাদি বক্তব্য, বয়ান ও জিহাদি ভিডিও প্রদর্শন করতেন তাঁরা। সিঙ্গাপুর পুলিশের কাছে তাঁদের এই জঙ্গি কার্যক্রমের বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর তাঁদের আটক করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তবে পুলিশ দাবি করেছে, ২১ ডিসেম্বর রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে তাঁদের আটক করা হয়। পরে তাঁদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সিঙ্গাপুরফেরত ওই ব্যক্তিরা হলেন আমিনুর (৩১), আবদুল আলীম (৩৩), শাহ আলম (২৮), গোলাম জিলানী (২৬), নুরুল আমিন (২৬), মাহমুদুল হাসান (৩০), জাফর ইকবাল (২৭), আকরাম হোসেন (২৭), আবদুল আলী (৪০), আশরাফ আলী (২৭), সাইফুল ইসলাম (৩৬), আলম মাহবুব (৩৪), ডলার পারভেজ (৩৫) ও মোহাম্মদ জসিম (৩৩)।


মন্তব্য