kalerkantho


আপাত সমঝোতা ভাঙন থেকে বাঁচল জাপা

মোশতাক আহমদ   

২১ জানুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০



জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জাপার সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশন এরশাদের মধ্যস্থতায় শেষ পর্যন্ত ভাঙনের পথ থেকে ফিরে এলো দল। এরশাদ সম্প্রতি তাঁর ভাই জি এম কাদেরকে জাপার কো-চেয়ারম্যান করার ঘোষণা দেওয়ায় কয়েক দিন ধরে দলটিতে একের পর এক নাটক চলতে থাকে।

একপর্যায়ে জাপার  বিক্ষুব্ধ এমপিরা রওশন এরশাদকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করলেও প্রকাশ্যে কোনো কথা বলেননি তিনি (রওশন)। পরে এরশাদের সঙ্গে কথা হয় তাঁর। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পার্টির প্রেসিডিয়াম সভায় নতুন কো-চেয়ারম্যান পদ অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হবে—এ বিষয়ে উভয় পক্ষে সমঝোতা হয়। এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে।    

জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য নাম না প্রকাশের শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এরশাদ সাহেব দলের চেয়ারম্যান হলেও এখন সবার দৃষ্টি সংসদীয় দলের প্রধান রওশন এরশাদের দিকে, যার ফলে এরশাদ সাহেব তাঁর ভাই জি এম কাদেরকে কোনো আলোচনা ছাড়াই পার্টির কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা করায় ক্ষুব্ধ হন শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। তাঁরা এ ঘটনার প্রতিবাদে রওশনকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। যদি রওশন এরশাদ এ ঘোষণায় একমত হতেন, তবে আজকে জাতীয় পার্টি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যেত। কিন্তু তাঁর (রওশন) দৃঢ় মনোভাবের কারণে জাপা ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পেল। ’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের আরেক প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে জাপার একটি অংশ অনেক দিন ধরে এরশাদ থেকে আলাদা করে জাপাকে দেখতে চেয়েছিল।

গত রবিবার এরশাদ যখন জি এম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন তখন থেকেই ওই অংশটি ঘোঁট পাকাতে থাকে। তারা রওশনের বাসায় সংসদীয় কমিটির ও প্রেসিডিয়ামের নেতাদের নিয়ে বৈঠক করে। মঙ্গলবার রংপুর থেকে ঢাকায় ফিরে এরশাদ যখন এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদারকে ফের দলের মহাসচিব করার ঘোষণা দেন তখন ওই অংশটির ক্ষোভ আরো বেড়ে যায়। ওই দিন বিকেলেই সংসদীয় কমিটির সভা ছিল সংসদে রওশনের অফিসে। সেখানে আলোচনা করে তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছিলেন, তাঁরা সংসদীয় কমিটি থেকে এরশাদের কোনো সিদ্ধান্ত মানবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পরে এক ঘণ্টার মধ্যে আবারও বক্তব্য ফিরিয়ে নিয়ে তিনি (তাজুল) বলেন, না, তাঁরা এখন দলের সব দায়িত্ব এরশাদ ও রওশনের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। দুজন মিলে যে সিদ্ধান্ত নেবেন তাতে আপত্তি নেই সংসদীয় কমিটির।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ এক ঘণ্টার মধ্যে তাঁর কথা ঘুরিয়ে ফেললেন কেন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে মঙ্গলবার জাতীয় পার্টির সংসদীয় কমিটির সভায় উপস্থিত ছিলেন এমন একজন সংসদ সদস্য কালের কণ্ঠকে বলেন, মঙ্গলবার সংসদীয় দলের সভার শুরুতেই অনেকেই এরশাদের নতুন ঘোষণা নিয়ে উত্তপ্ত বক্তব্য দিতে থাকেন। একটু পরেই রওশন ফ্লোর নিয়ে সবাইকে এরশাদের সিদ্ধান্তের বিষয়ে কথা না বলার অনুরোধ করলে দৃশ্যপট পাল্টে যায়।  

জাতীয় পার্টির একটি সূত্র জানায়, এরশাদ ঢাকায় ফিরেই প্রথমে স্ত্রী ও সংসদীয় দলের প্রধান রওশনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। নতুন দায়িত্ব পাওয়া কো-চেয়ারমান জি এম কাদের তাঁর মতের বাইরে কোনো কাজ করবেন না বলে তাঁকে আশ্বস্ত করেন। আর শেষ বয়সে তাঁকে (এরশাদ) কোনো প্রকার অসম্মান না করতেও তিনি রওশনের সাহায্য চান। আগামী প্রেসিডিয়াম সভায় সব সিদ্ধান্ত পাস করানো হবে—এমন মতামতের কথা জানালে রওশনও তাতে সায় দেন। এর পরই এরশাদ সংবাদ সম্মেলন ডাকেন। সেখানে তিনি মহাসচিব পদ থেকে জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে অব্যাহতি দিয়ে রুহুল আমিন হাওলাদারকে মহাসচিব করার ঘোষণা দেন।

দলীয় সূত্র জানায়, রওশনের সঙ্গে এরশাদের আগেই কথা হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে আপাত সমঝোতা হয়েছে—দলের অনেকে বিষয়টি জানতেন না।

জাপার এমপি আমির হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনে (গতকাল) যেখানে রওশন এরশাদের সংসদের কার্যালয়ে দলীয় নেতাদের ভিড় থাকার কথা ছিল, সেখানে মাগরিবের নামাজের পর তিনি কোনো নেতাকেই দেখতে পাননি।  

গতকাল বুধবার এরশাদ বনানীর কার্যালয়ে নতুন কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। এ সময় সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে এরশাদ বলেন, ‘দল থেকে আমাকে বহিষ্কার করার ক্ষমতা কারো নেই। আমি পার্টির চেয়ারম্যান। একমাত্র কাউন্সিলে যদি আমি বাদ হই, তবেই আমি পদ ছেড়ে দেব। আমি যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি। এর জন্য আলোচনার প্রয়োজন নেই। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আমার সে ক্ষমতা আমার আছে। তবে হ্যাঁ, আমি যদি চাই, আলোচনা হতে পারে। আমার সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যানের এখতিয়ারও কারো নেই। সংসদীয় দল জাতীয় পার্টির একটি অংশ। সংসদীয় দল পার্টির ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না। ’

জনগণ জাপাকে বৃহৎ দল মনে করে না উল্লেখ করে এরশাদ বলেন, ‘জনগণ দেখে আমরা সরকারে আছি। যখন আমরা ভোট চাইতে যাই তখন জনগণ বলে, আপনি তো সরকারের সঙ্গে আছেন। আপনাকে ভোট দেব কেন?’ 

এরশাদ বলেন, ‘আমি দলের কো-চেয়ারম্যানের ব্যাপারে রওশনের কথাটাও চিন্তা করেছি। দলের উত্তরসূরি হিসেবে তাঁকে নিয়েও ভেবেছি। কিন্তু তিনি বয়সের ভারে ন্যুব্জ। এ বয়সে উনি আর শ্রম দিতে পারবেন না। আর প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের স্বার্থে, পার্টিকে শক্তিশালী করার স্বার্থে হাওলাদারকে মহাসচিব করা হয়েছে। ’

এদিকে জাপার তৃণমূলের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, জি এম কাদেরকে নতুন কো-চেয়ারম্যান করায় তাঁরা খুশি। তাঁরা এরশাদের এ ঘোষণাকে সাধুবাদ জানান।

ডেমরা জাতীয় পার্টির নেতা ও সাবেক যুবনেতা আব্দুস সবুর আসুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জি এম কাদের পরীক্ষিত নেতা। আমাদের প্রত্যাশা ছিল তিনি যেন দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসেন। ’

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থানা জাতীয় পার্টির সভানেত্রী অনন্যা হোসেন মৌসুমী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা আসলে স্যারের (এরশাদের) পর কাউকে চাচ্ছিলাম যিনি দলের হাল ধরবেন। জি এম কাদের সেই আশা পূরণ করবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। ’

 


মন্তব্য