kalerkantho


চট্টগ্রামে বেসরকারি চিকিৎসাসেবা অচল

হঠাৎ কর্মবিরতি চিকিৎসকদের

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

২১ জানুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০



চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের দুই বিশেষজ্ঞসহ তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সেবা দেওয়া সব চিকিৎসক। পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই গতকাল বুধবার দুপুর ২টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দেন তাঁরা।

শুধু তাই নয়, চিকিৎসকরা তাঁদের ব্যক্তিগত চেম্বারেও রোগী দেখা বন্ধ করে দিয়েছেন।

চিকিৎসকদের এই আন্দোলন কর্মসূচিতে চট্টগ্রাম নগরের বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। আর আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মামলা প্রত্যাহার না হলে শনিবার থেকে সরকারি হাসপাতালেও চিকিৎসকদের কর্মবিরতি শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।

গতকাল সরকারি মেডিক্যালে জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ঘোষণা দিলেও আজ বৃহস্পতিবার থেকে পূর্ব নির্ধারিত (রুটিন) অস্ত্রোপচার (অপারেশন) কার্যক্রমও বন্ধ থাকবে। তবে জরুরি অস্ত্রোপচার চালু থাকবে বলে চিকিৎসক নেতারা জানান। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে নগরীতে চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ), চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুজিবুল হক খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা বাধ্য হয়ে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে অনির্দিষ্টকালের জন্য বেসরকারি পর্যায়ে কর্মবিরতি শুরু করেছি। আমাদের তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে তা মিথ্যা ও হয়রানিমূলক। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মামলা প্রত্যাহার না করলে আরো কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবো।

একই বিষয়ে বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী বলেন, ‘বৃহস্পতিবারের মধ্যে মামলা প্রত্যাহার না হলে আগামী শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে পরবর্তী সময়ে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এসব কর্মসূচির মধ্যে থাকবে সরকারি হাসপাতালগুলোতেও লাগাতার চিকিৎসকদের কর্মবিরতি। বেসরকারি পর্যায়ে আমরা কর্মবিরতি শুরু করলেও সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা চলছে। তবে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকরা দায়িত্ব পালন করলেও নির্ধারিত অস্ত্রোপচার কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। জরুরি অস্ত্রোপচার কার্যক্রম চলবে। ’

জানা গেছে, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আলাদাভাবে দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম মোহাম্মদ ফরিদ আলমের আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। আদালত নগরের পাঁচলাইশ মডেল থানাকে মামলা দুটি এজাহার হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ দেন।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, অবহেলার কারণে মেহেরুন নিসা নামের এক প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অধ্যাপক (চলতি দায়িত্ব) ডা. মো. মাহাবুব আলম ও তাঁর স্ত্রী অধ্যাপক (চলতি দায়িত্ব) ডা. শামীমা সিদ্দিকা রোজীর বিরুদ্ধে মামলা করেন ওই প্রসূতির বাবা খায়রুল বাশার। বাদী প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির ছোট ভাই। গত ১০ জানুয়ারি এই প্রসূতির মৃত্যু হয় বেসরকারি সার্জিস্কোপ হাসপাতালে।

একই আদালতে অন্য মামলাটি হয়েছে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. রানা চৌধুরীর বিরুদ্ধে। এই মামলার বাদী চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার জেবল হোসেন। তিনি মামলাটি করেছেন তাঁর ছেলে নুরু আবছারের (১৭) পেটে অস্ত্রোপচারের সময় ব্যান্ডেজ রেখে দেওয়ার অভিযোগে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার অধীনে নগর ও জেলার ১৪ উপজেলায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার চিকিৎসক রয়েছেন। এর মধ্যে দেড় হাজার চিকিৎসক সরকারি হাসপাতালগুলোয় কর্মরত রয়েছেন। নগরে চিকিৎসকের চেম্বার আছে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০টি। চেম্বারে প্রতিদিন গড়ে ২৫-৩০ হাজার রোগী দেখা হয়। এ ছাড়া নগরে অর্ধশতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে প্রায় দুই হাজার রোগী চিকিৎসাধীন থাকে। বেসরকারি এসব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসকরা রোগী দেখেন। দুই শতাধিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কয়েক হাজার রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় প্রতিদিন। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন পূর্ব নির্ধারিত (রুটিন) অর্ধশত রোগীর অস্ত্রোপচার হয়। কিন্তু গতকাল কর্মবিরতির ফলে এসব চিকিৎসাসেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।

চট্টগ্রাম নগর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে জেলার ফটিকছড়ি থেকে আসা আবদুল মুহিত নামে এক রোগী নগরের বেলভিউ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে মেডিসিন ও লিভার বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. বিশ্বজিত দত্তকে তাঁর চেম্বারে দেখানোর জন্য গতকাল সকালে নাম লেখান (টিকিট নেন)। বিকেল ৫টা থেকে ডা. বিশ্বজিত চেম্বারে রোগী দেখা শুরু করেন। আবদুল মুহিত এক নম্বর সিরিয়ালে ছিলেন। বিকেলে চিকিৎসক আসবেন এমন অপেক্ষা করছিলেন। তিনি (মুহিত) চেম্বারেও চলে গেছেন। বিকেল ৩টার দিকে জানতে পারেন কর্মবিরতির কারণে চিকিৎসক আসছেন না। আবদুল মুহিত হতাশ হয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এত দূর থেকে এসে চিকিৎসককে দেখাতে না পেরে এখন কি করব বুঝতে পারছি না। ’

একই চিকিৎসকের কাছে লিভারের সমস্যা নিয়ে কক্সবাজার থেকে আসা মোহাম্মদ শাহাদাত নামে আরেক রোগী বলেন, ‘সকালে ফোনে সিরিয়াল নিয়ে কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামে এসেছি। এখন শুনছি চিকিৎসক আসবেন না। কোথায় যাব চিকিৎসা নিতে। ’

এ ব্যাপারে ডা. বিশ্বজিত দত্ত বলেন, ‘সিরিয়াল নেওয়ার সময় যাদের নম্বর ছিল তাদের ফোনে জানানো হয়েছে কর্মবিরতির বিষয়টি। যাদের মোবাইল নম্বর ছিল না তাদের জানানো যায়নি। শুধু আমি নই, আমাদের কর্মবিরতির কারণে চিকিৎসকদের কেউ চেম্বার করবেন না। ’

জানা যায়, ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ১২ জন চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বার রয়েছে। বিকেল ৪টার দিকে সিএসসিআর হাসপাতালে দ্বিতীয় তলায় গেলে দেখা যায়, চিকিৎসকের সামনে ১৮-২০ জন রোগী রয়েছে। এ হাসপাতালে অভ্যর্থনা কক্ষের দায়িত্বরত এক নারী নাম প্রকাশ না করে বলেন, এখানে ৪২ জন চিকিৎসকের চেম্বার রয়েছে। দু-তিন দিন আগেও সিরিয়াল নিতে হয়। সবাই জানতে চাচ্ছে চিকিৎসক আসবেন কি না?

এ ছাড়া গতকাল বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত নগরের শেভরন, পপুলার, মেট্রোপলিটন, মেট্রো, মেডিক্যাল সেন্টার, ম্যাক্স, উডল্যান্ড, পিপলস, কেয়ার ল্যাব, বেসিক ল্যাব, প্রিমিয়ার হাসপাতাল, ট্রিটমেন্ট, ল্যাব ওয়ান, সেনসিভ, বেলভিউ-২, ন্যাশনাল হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, বিশেষজ্ঞ বিভিন্ন চিকিৎসকের জন্য রোগী ও তাঁদের স্বজনরা অপেক্ষা করছে। এর মধ্যে কেউ কেউ চিকিৎসক আসবে না জেনে চলে যাচ্ছে আবার অনেকে বসে আছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোয় সবচেয়ে বেশি চিকিৎসকদের চেম্বার।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল বিকেল ৩টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খোন্দকার শহিদুল গণির কার্যালয়ে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) নেতাসহ হাসপাতালের বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসকদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেন। প্রায় এক ঘণ্টা ওই বেঠক চলে।

এ বিষয়ে পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খোন্দকার শহিদুল গণি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় অনির্দিষ্টকালের চিকিৎসকদের কর্মবিরতি শুরু হওয়ায় আমাদের হাসপাতালে রোগীদের চাপ বাড়তে পারে। এ কারণে আমরা জরুরি বৈঠক করে কিভাবে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া যায় সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের (চিকিৎসক) দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যাঁরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন না তাঁদেরকে মোবাইল ফোনে খুদে বার্তা (এসএমএস) ও ফোনে জানানো হয়েছে। সন্ধ্যার পর আমাদের মনিটরিং ব্যবস্থা থাকবে। যাতে কোনো রোগী হাসপাতাল থেকে চিকিৎসাসেবায় বঞ্চিত না হয়। ’

এর আগে গতকাল দুপুর ১২টায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের কনফারেন্স রুমে বিএমএ চট্টগ্রাম শাখার উদ্যোগে এক জরুরি সাধারণ সভা হয়। সংগঠনের সভাপতি ডা. মুজিবুল হক খানের সভাপতিত্বে প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত ওই জরুরি সভায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ শিক্ষক সমিতি, সোসাইটি অব সার্জন, সোসাইটি অব গাইনি অ্যান্ড অবস্, সোসাইটি অব মেডিসিনসহ চট্টগ্রামের চিকিৎসকদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ওই সভায় তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে যে মামলা করার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানানো হয়। গতকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য চট্টগ্রামে প্রাইভেট প্র্যাকটিস, বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সকল প্রকার চিকিৎসাসেবা বন্ধ রাখার ব্যাপারে সভায় সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া গত ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রামে বেসরকারি সার্জিস্কোপ হাসপাতাল ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় যারা জড়িত তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে শাস্তি দেওয়ারও দাবি জানানো হয়েছে বিএমএ চট্টগ্রামের পক্ষ থেকে।

এ ছাড়া সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর এবং সাধারণ সম্পাদক সহযোগী অধ্যাপক ডা. বিশ্বজিত দত্ত এক বিবৃতিতে এই তিন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে গতকাল চিকিৎসকদের ঘোষিত আন্দোলন কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।


মন্তব্য