kalerkantho


সাক্ষাৎকার : জি এম কাদের

মন্ত্রিসভায় গিয়ে রাজনৈতিক চরিত্র হারিয়েছে জাপা

এনাম আবেদীন   

২১ জানুয়ারি, ২০১৬ ০০:০০



মন্ত্রিসভায় গিয়ে রাজনৈতিক চরিত্র হারিয়েছে জাপা

জাতীয় পার্টির (জাপা) সদ্য নিযুক্ত কো-চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের (জি এম কাদের) বলেছেন, ‘দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের প্রস্তাবেই আমাকে কো-চেয়ারম্যান করা হয়েছে। ’ সম্পর্কে বড় ভাবি রওশনের কথা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘রওশন এরশাদকে আমি মায়ের মতো শ্রদ্ধা করি।

তিনিই ব্যক্তিগতভাবে আমাকে বলেছেন, কাদের তুমি কো-চেয়ারম্যান হও, দলের জন্য ভালো হবে। কারণ নেতাকর্মীরা হতাশায় ভুগছে। তুমি হলে তাদের হতাশা কেটে যাবে। ওই পদে গেলে তিনি আমাকে দোয়া করবেন বলেও জানিয়েছেন। ’

গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর উত্তরার বাসায় কালের কণ্ঠকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জি এম কাদের এসব কথা বলেন। তাঁর মতে, সরকারে অংশ নিয়ে জাপা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মন্ত্রিসভায় অংশ নিয়ে দল রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, রাজনৈতিক দলের চরিত্র হারিয়েছে জাতীয় পার্টি। এতে কেবল কিছু নেতা বা লোকের লাভ হয়েছে।

জি এম কাদের বলেন, ‘জাতীয় পার্টির কিছু নেতা ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার জন্য পুরো দলকে ডোবাচ্ছেন।

এসব বিষয় দলের চেয়ারম্যানও (এইচ এম এরশাদ) জানেন। আর জানেন বলেই তিনি রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করছেন। আশা করি, এবার তিনি বদলাবেন না। কারণ এবার সিদ্ধান্ত বদল করলে দলের অস্তিত্ব নিয়ে টান পড়বে। ’ 

গত রবিবার রংপুরে ভাই জি এম কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান ও তাঁর উত্তরসূরি ঘোষণা করেন এরশাদ। এ ঘটনার সূত্র ধরে জাপায় টানাপড়েন শুরু হয় এবং রওশন এরশাদপন্থীরা পাল্টা বৈঠক করে তাঁকে (রওশন এরশাদ) দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার জিয়াউদ্দিন বাবলুকে সরিয়ে রুহুল আমিন হাওলাদারকে মহাসচিব পদে নিযুক্ত করেন এরশাদ।

দলের মধ্যে বড় ধরনের এই পরিবর্তনের হাওয়া জি এম কাদেরের বাসায় গিয়েও দেখা যায়। গত তিন দিনে নেতাকর্মীদের আনাগোনায় মুখরিত হয়ে ওঠে কাদেরের উত্তরার বাসা। দলের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী তাঁকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়।

এ সময় জি এম কাদের বলেন, ‘বিবেকের বিরুদ্ধে জাপার নেতাকর্মীরা রাজনীতি করছিল। আসলে আমরা সরকার সমর্থক কিংবা বিরোধী, ব্যাপারটি সে রকম নয়। মূলকথা, আমরা রাজনীতি করতে চাই। আর রাজনীতি করতে হলে সরকার কিংবা বিএনপি যারাই খারাপ কাজ করুক, সেগুলো জনগণের সামনে বলতে হবে। কিন্তু সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আবার বলব বিরোধী দলে আছি, এটি হয় না। এটি ডাবল স্ট্যান্ডার্ড। দেশের জনগণ এগুলো বোঝে। এ থেকে জাপাকে বেরিয়ে আসতে হবে। ’  

৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকেই এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি সরকার সমর্থক ও সরকারবিরোধী এই দুই ধারায় বিভক্ত। রওশন এরশাদের নেতৃত্বে দলের সংসদ সদস্যদের অধিকাংশ সরকার সমর্থক বলে পরিচিত। অন্যদিকে জি এম কাদেরসহ এরশাদের কথামতো যাঁরা নির্বাচনে অংশ নেননি এমন প্রায় সব নেতাকর্মী সরকারে না থেকে নিয়মতান্ত্রিক বিরোধী দল হিসেবে রাজনীতি করতে আগ্রহী। সে হিসেবে সরকারের সঙ্গে তাদের সখ্য কম। তাদের যুক্তি, সরকার সমর্থক হিসেবে ভূমিকা থাকলে একসময় বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টির অস্তিত্বই বিপন্ন হবে।

যত দূর জানা গেছে, এই ধারার নেতাদের চাপেই পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী জি এম কাদেরকে দলের কো-চেয়ারম্যান করেছেন এরশাদ। পাশাপাশি সরকার সমর্থক হিসেবে বিবেচিত দলের মহাসচিবও বদলে ফেলা হয়েছে।

জাপা ভাঙছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে জি এম কাদের বলেন, ‘রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে যতটুকু বুঝি, টানাপড়েন থাকলেও চূড়ান্তভাবে জাপা ভাঙছে না। কারণ এরশাদ মানেই জাপা। তিনি যেখানে থাকবেন, ভোটার ও সমর্থকরা সেদিকেই যাবেন। সুতরাং এরশাদকে বাদ দিয়ে যদি কেউ কিছু করতে চান তাঁরা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারবেন না। ’

রওশন এরশাদের প্রস্তাব সত্ত্বেও দলীয় ফোরামের বৈঠকে আলোচনার পর কো-চেয়ারম্যান করা হলে অসুবিধা কী ছিল জানতে চাইলে এরশাদের সহোদর জি এম কাদের বলেন, ‘আসলে এ পদটি দলের গঠনতন্ত্রে নেই। কিন্তু গঠনতন্ত্রে চেয়ারম্যানকে যে ক্ষমতা দেওয়া আছে, তাতে নির্বাহী আদেশে তিনি এ পদে নিয়োগ দিতে পারেন, যা পরে কাউন্সিলে অনুমোদন করলেই চলে। আর এ বিষয়টি রওশন এরশাদই বলেছেন। তিনি আমাকে এও বলেছেন যে কাদের, আমার আর চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। দলের স্বার্থে তুমি হাল ধরো। আমি দোয়া করি তুমি সফল হবে। ’ তাহলে পরে রওশন এরশাদ বিগড়ে গেলেন কেন জানতে চাইলে জি এম কাদের বলেন, ‘হয়তো স্বার্থান্বেষী কিছু মহল তাঁকে ভুল বুঝিয়ে থাকতে পারে। কারণ দলের অধিকাংশ সংসদ সদস্য ও নেতাই আমাকে ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছেন। অবশ্য অনেকে এও বলেছেন যে আমাকে কো-চেয়ারম্যান করা হয়েছে, এটি ভালো উদ্যোগ। তবে প্রেসিডিয়ামের বৈঠক ডেকে অনুমোদন নিলে ভালো হয়, এ পরামর্শও তাঁরা দিয়েছেন। ’

এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক মন্ত্রী জি এম কাদের বলেন, ‘দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারম্যান ছাড়া দলের প্রেসিডিয়াম বা অন্য কোনো বৈঠক ডাকা যায় না। চেয়ারম্যান সোমবারের বৈঠক ডাকেননি। ওই বৈঠকের বিষয়ে রওশন এরশাদের সমর্থন ছিল কি না এ নিয়ে আমার সংশয় রয়েছে। তা ছাড়া সংসদীয় দল কখনো মূল দলকে কোনো নির্দেশনা দিতে পারে না। জাতীয় পার্টি হলো মূল সংগঠন। সে পার্টির চেয়ারম্যান কখনো সংসদীয় দল নির্বাচিত করতে পারেন না। ’

জাপার চেয়ারম্যান তাঁর সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত বহাল থাকতে পারবেন কি না জানতে চাইলে জি এম কাদের বলেন, হয়তো পারবেন। কারণ তিনি (এরশাদ) এবার হয়তো চিন্তাভাবনা করেই এ রকম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

রওশনপন্থীরা নেপথ্যে সরকারের আনুকূল্য পাচ্ছেন কি না জানতে চাইলে কাদের বলেন, ‘নেপথ্যে সরকারের হাত রয়েছে, চোখে পড়ার মতো এমন তথ্য-প্রমাণ এখনো পাইনি। তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখছি। ’

অবশ্য সরকারে অংশ নিয়ে জাপা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করেন জি এম কাদের। তিনি বলেন, মন্ত্রিসভায় অংশ নিয়ে দল রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজনৈতিক দলের চরিত্র হারিয়েছে জাতীয় পার্টি। এতে কিছু নেতা বা লোকের লাভ হয়েছে।

আপনাকে কো-চেয়ারম্যান করায় জাতীয় পার্টিতে কোনো গুনগত পরিবর্তন আসবে কি না এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে জি এম কাদের বলেন, ‘তৃণমূলের প্রত্যাশা অনুযায়ী আমাকে এ পদ দেওয়া হয়েছে। আমি মনে করি, সংগঠন শক্তিশালী করার পাশাপাশি জাতীয় পার্টির রাজনীতিকে স্পষ্ট করা এ মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। কারণ এ দলকে নিয়ে জনগণের মধ্যে কিছুটা আস্থার সংকটও রয়েছে। তাই রাজনীতির মধ্য দিয়ে আগামী দিনে জনগণের আস্থাও অর্জন করতে হবে। এটাই আমার বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের খারাপ কাজের প্রতিবাদ বা সমালোচনার পাশাপাশি কর্মসূচিও দিতে হবে। এভাবেই জনগণের কাছে দলকে বিশ্বাসযোগ্য করার সুযোগ রয়েছে। আশা করছি, এ কাজগুলো সবাইকে সঙ্গে নিয়ে করতে সক্ষম হব। ’


মন্তব্য