kalerkantho


রাজশাহী-নাটোর

৫০ কিমিতে ওঠে দেড় কোটি টাকা

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



৫০ কিমিতে ওঠে দেড় কোটি টাকা

রাজশাহীর কাশিয়াডাঙ্গায় চালকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে রসিদ দিচ্ছেন এক পরিবহন শ্রমিক। ছবি : সালাহ উদ্দিন

রাজশাহী থেকে নাটোরের দূরত্ব মাত্র ৫০ কিলোমিটার। এই রাস্তা পার হতে প্রতিটি ট্রাককে ছয়টি পয়েন্টে ৩০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। এ হিসাবে প্রায় দুই হাজার ট্রাক থেকে দিনে অন্তত পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হয়। মাসে তোলা হয় দেড় কোটি টাকা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজশাহীর কাশিয়াডাঙ্গাতে চাঁদা নেওয়া হয় ১০০ টাকা, তালাইমারীতে ৫০ টাকা, পুঠিয়াতে ৫০ টাকা এবং নাটোরে ১০০ টাকা। ট্রাক টার্মিনাল এবং ট্রাক মালিক-শ্রমিক ইউনিয়ন এবং পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নামে এই টাকা নেওয়া হয়। এর বাইরে রাজশাহীর শিরোইলে বাফার সার গোডাউন থেকে ট্রাক বের হওয়ার সময় নেওয়া হয় ৫০ টাকা এবং নওদাপাড়ায় ৫০ টাকা।

পরিবহন সূত্র মতে, কাশিয়াডাঙ্গা ট্রাক টার্মিনালের নামে ৫০ টাকা এবং ট্রাক মালিক-শ্রমিক ইউনিয়নের নামে উত্তোলন হয় ৫০ টাকা। আবার ট্রাক টার্মিনালের নামে নওদাপাড়া, শিরোইলে বাফার সার গোডাউনেও চাঁদা তোলা হয়। অথচ নিয়ম অনুযায়ী শুধু রাজশাহী নগরীর সিটি বাইপাস রাস্তার পাশে নির্মিত টার্মিনালে ট্রাক ঢুকলেই সেখান থেকে চাঁদা নেওয়ার কথা। কিন্তু টার্মিনালের বাইরে রাস্তায় যে ট্রাকগুলো দাঁড়িয়ে থাকে বা সামনে দিয়ে চলে যায় সেগুলো থেকেও চাঁদা তোলা হয়। আবার ট্রাক মালিক-শ্রমিক ও পরিবহন শ্রমিকদের নামে ধাপে ধাপে চাঁদা নেওয়া হয়।

চাঁদা আদায়ের জন্য নিজ নিজ ইউনিয়ন এবং ট্রাক টার্মিনাল ইজারা গ্রহণকারী ঠিকাদার ও শ্রমিক নেতা রবিউল ইসলাম রবির পক্ষ থেকে রাস্তায় পাহারা বসানো হয়েছে। তাঁদের নিযুক্ত লোকরা লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে ট্রাক থামিয়ে চাঁদা নেয়। আর নাটোরে টাকা নেন জেলা ট্রাক মালিক-শ্রমিক ও পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছেড়ে আসা ট্রাকচালক আকবর আলী বলেন, ‘ট্রাক টার্মিনালের নামে ১৫০ টাকা নেয়; কিন্তু এই টাকার কোনো হিসাব থাকে না। মাঝে মাঝে রাজশাহীর কোনো শ্রমিক মারা গেলে তাদের পরিবারকে দেড়-দুই লাখ টাকা দেয় বলে শুনি। কিন্তু আমরা রাজশাহীর বাইরে থেকে যে চালকরা এসে চাঁদা দিই, তার কোনো হিসাব থাকে না। এমনকি রাজশাহীর শ্রমিকরাও কোনো হিসাব জানতে পারে না। সব টাকা চলে যায় নেতাদের পকেটে। নেতারা পকেট ভারী করে গড়ে তুলছেন বাড়ি-গাড়ি। কিন্তু চালকরা থেকে যাচ্ছে অবহেলিত।’

আরেক ট্রাকের শ্রমিক মাইনুল বলেন, ‘টাকা দিই আমরা। আর নেতারা বগল বাজিয়ে খরচ করেন ইচ্ছামতো। কোনো শ্রমিক মারা গেলে নেতাদের কাছে টাকার জন্য হন্যে হয়ে ঘুরতে হয়। কিন্তু প্রতিদিন যে লাখ লাখ টাকা চাঁদা তোলা হচ্ছে এর কোনো হিসাব থাকে না।’

নওদাপাড়ায় কথা হয় চালক শহিদুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি সারবোঝাই ট্রাক নিয়ে বাগমারায় যাচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি সার উত্তোলন করেছি শিরোইলে বাফার গোডাউন থেকে। সেখানে ট্রাক টার্মিনালের কোনো ছায়াই নেই। শিরোইল থেকে ট্রাক টার্মিনালের দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। কিন্তু বাফার গোডাউন থেকে বের হওয়ার সময় আমার কাছ থেকে টার্মিনালের নামে ৫০ টাকা নেওয়া হয়েছে। এটি অন্যায়।’

নগরীর তালাইমারীতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন লোক। ট্রাক আসা মাত্র গোলচত্বরের সামনে থামাচ্ছে। এরপর চালকরা ভেতর থেকে ৫০ টাকা করে বের করে দিচ্ছে। টাকা দিলেই শুধু ট্রাকগুলো ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে রাজশাহী ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ফরিদ হোসেন বলেন, ‘টার্মিনাল আছে নওদাপাড়ায়। সেখানে ট্রাক গেলে চাঁদা আদায় করার কথা। কিন্তু যেসব ট্রাক রাস্তা দিয়ে চলছে, সেগুলোর কিভাবে চাঁদা উত্তোলন হয়?’

ট্রাক টার্মিনালের লিজ গ্রহণকারী ও রাজশাহী মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের আহ্বায়ক কামাল হোসেন রবি বলেন, ‘বেশির ভাগ টাকা উত্তোলন হয় ট্রাক মালিক-শ্রমিকের নামে। শুধু ৫০ টাকা করে উত্তোলন হয় টার্মিনালের নামে।’ টার্মিনালের বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে চাঁদা উত্তোলন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি আমরা করতে পারি।’



মন্তব্য